ধর্ম ডেস্ক
১৬ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১৮ পিএম
গুনাহ হয়ে গেলে আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। অনেকে পাঠ করেন- ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’। আবার গুনাহ ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাকে বলা হয় তাওবা। দুটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও তাওবা ও ইস্তেগফার এক নয়। সহজভাবে বললে, ইস্তেগফার হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। আর তাওবা হলো গুনাহ ছেড়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
ইস্তেগফার অর্থ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। বান্দা নিজের গুনাহ ও ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে মাফ চায়। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা ইস্তেগফারের সংক্ষিপ্ত রূপ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল।’ (সুরা নূহ: ১০)
রাসুল (স.) নিজেও নিয়মিত ইস্তেগফার করতেন। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি দিনে সত্তরেরও বেশি বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই এবং তাঁর কাছে তাওবা করি।’ (সহিহ বুখারি: ৬৩০৭)
এ ছাড়া তিনি ফরজ নামাজের পর তিনবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলতেন। (সহিহ মুসলিম: ৫৯১)
তাওবা অর্থ ফিরে আসা। গুনাহের পথ ছেড়ে আল্লাহর আনুগত্যের দিকে ফিরে আসাই তাওবার মূল কথা।
তাওবার মধ্যে তিনটি বিষয় থাকা জরুরি। অতীতের গুনাহের জন্য অনুশোচনা করা, বর্তমানে সেই গুনাহ ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে আর সেই গুনাহ না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
অর্থাৎ অতীতের গুনাহের জন্য অনুশোচনা, বর্তমানের গুনাহ পরিত্যাগ এবং ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার অঙ্গীকার তাওবার গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো।’ (সুরা তাহরিম: ৮) রাসুল (স.) প্রতিদিন তাওবা করতেন। তিনি বলেছেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো। কারণ আমি নিজেও দৈনিক শতবার তাওবা করি।’ (সহিহ মুসলিম: ২৭০২)
আরও পড়ুন: যেভাবে তাওবা করলে কবুল হয়
সব ক্ষেত্রে নয়। মুখে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা ইস্তেগফার। তবে সত্যিকারের তাওবার জন্য গুনাহ থেকে ফিরে আসার আন্তরিক সিদ্ধান্ত থাকতে হবে।
কেউ গুনাহ করে ক্ষমা চাইলেন, কিন্তু সেই গুনাহ ছাড়ার কোনো ইচ্ছা রাখলেন না। এমন অবস্থাকে পূর্ণ তাওবা বলা যায় না।
তাই গুনাহ হয়ে গেলে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি গুনাহ থেকে সরে আসতে হবে। ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে।
কোনো গুনাহ যদি আল্লাহর হকের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে আন্তরিক তাওবা ও সংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আর গুনাহের সঙ্গে মানুষের অধিকার জড়িত থাকলে বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।
কারও টাকা আত্মসাৎ করা, ঋণ পরিশোধ না করা, সম্পদ নষ্ট করা বা অন্য কোনো অধিকার নষ্ট করলে শুধু মুখে ইস্তেগফার করাই যথেষ্ট নয়। সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
তবে গিবত বা এমন কোনো বিষয়ে ক্ষমা চাওয়া নিয়ে আলেমদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। এতে নতুন ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে সরাসরি জানানো সবসময় সমাধান নয়। এমন ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য দোয়া করা এবং তার সুনাম ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তওবা করো।’ (সুরা তাহরিম: ৮)
‘তাওবাতুন নাসুহা’ বা খাঁটি তাওবার অর্থ হলো আন্তরিকভাবে গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং নিজেকে সংশোধন করা। তাই তাওবা শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়ার বিষয় নয়। যে গুনাহের জন্য তাওবা করা হয়েছে, তা ছেড়ে দেওয়ার বাস্তব চেষ্টা থাকতে হবে।
আরও পড়ুন: গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত তাওবা করা জান্নাতিদের গুণ
মানুষ ভুল করতে পারে। গুনাহ হয়ে গেলে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়। দ্রুত তাঁর কাছে ফিরে আসতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এরপরও কি তারা তওবা-ইস্তেগফার করবে না? অথচ আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা মায়েদা: ৭৪)
রাসুল (স.) বলেছেন, ‘তওবা করার দ্বারা একজন গুনাহগার ওই ব্যক্তির মতো পরিশুদ্ধ হয়ে যায়, যে ব্যক্তি কোনো গুনাহই করেনি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫০)
তাই গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে দ্রুত তাওবা করাই মুমিনের কাজ।
তাওবার পর কেউ দুর্বলতার কারণে আবার একই গুনাহে জড়িয়ে পড়তে পারে। এমন অবস্থায় আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। আবার তাওবা করতে হবে এবং গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
সহিহ হাদিসে এসেছে, বান্দা গুনাহ করার পর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন। এরপর আবার গুনাহ করে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ আবারও তাকে ক্ষমা করেন। (সহিহ বুখারি: ৭৫০৭)
এর অর্থ গুনাহ করার সুযোগ নেওয়া নয়। এর শিক্ষা হলো, ভুল হয়ে গেলে আল্লাহর রহমত থেকে হতাশ না হয়ে বারবার তাঁর দিকে ফিরে আসতে হবে।
আরও পড়ুন: ৭টি ছোট ইস্তেগফার: কোরআন-হাদিসে ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ দোয়াগুলো
হাদিসে ‘সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার’ নামে একটি বিশেষ দোয়া বর্ণিত হয়েছে। রাসুল (স.) সেটিকে ইস্তেগফারের শ্রেষ্ঠ দোয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (সহিহ বুখারি: ৬৩০৬)
দোয়াটিতে আল্লাহর রবুবিয়ত স্বীকার, তাঁর নেয়ামতের স্বীকৃতি, নিজের গুনাহের স্বীকারোক্তি এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা রয়েছে।
তাই অর্থ বুঝে এই দোয়াটি শেখা ও নিয়মিত পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে।
ইস্তেগফার শুধু গুনাহ মাফের জন্য নয়। কোরআনে হজরত নূহ (আ.)-এর বক্তব্যে ইস্তেগফারের সঙ্গে বৃষ্টি, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির বৃদ্ধির কথা এসেছে। (সুরা নূহ: ১০-১২)
আর একটি হাদিসে নিয়মিত ইস্তেগফারের মাধ্যমে সংকট থেকে উত্তরণের পথ এবং কল্পনাতীত রিজিক লাভের কথা বর্ণিত হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ)
তাই ইস্তেগফারকে মুমিনের নিয়মিত আমল বানানো উচিত।
তাওবা মানুষকে গুনাহের পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। ইস্তেগফার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে শেখায়। তাই গুনাহ হয়ে গেলে দুটিই করা উচিত। গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হতে হবে, তা ছেড়ে দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করতে হবে। একই সঙ্গে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।
গুনাহ হলে ‘পরে তাওবা করব’ এমন চিন্তা ঠিক নয়। মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না। তাই সময় থাকতেই আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের খাঁটি তাওবা করার তাওফিক দিন। বেশি বেশি ইস্তেগফার করার এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।