Dhaka Mail Logo

ইসলাম

কারা শহীদের মর্যাদা পান? যা বলে কোরআন-হাদিস

ধর্ম ডেস্ক

০৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৯ পিএম

শাহাদাত একজন মুমিনের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানের মৃত্যু। আল্লাহর পথে প্রাণ বিসর্জনকারীদের জন্য কোরআন ও হাদিসে বিশেষ মর্যাদা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে শহীদ বলতে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তিকেই বোঝায় না। কোরআন-হাদিসে এমন আরও কিছু অবস্থার কথা উল্লেখ আছে, যেখানে মৃত্যুবরণকারী শহীদের মর্যাদা লাভ করেন।

শহীদ বলতে কী বোঝায়?

আরবি ‘শহীদ’ শব্দের অর্থ সাক্ষী। ইসলামি পরিভাষায়, যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁকে শহীদ বলা হয়। তবে এই মর্যাদা লাভের জন্য বিশুদ্ধ ঈমান ও খাঁটি নিয়ত অপরিহার্য। পার্থিব স্বার্থ, খ্যাতি বা লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে প্রাণ দিলে তা শাহাদাত হিসেবে গণ্য হবে না।

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত মনে করো না। বরং তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে জীবিত এবং রিজিকপ্রাপ্ত।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৬৯)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদের মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা তা উপলব্ধি করতে পারো না।’ (সুরা বাকারা: ১৫৪)

মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শহীদরা বরজখের জীবনে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নেয়ামত লাভ করেন। সেই জীবনের প্রকৃতি ও বাস্তবতা মানুষের ইন্দ্রিয় দিয়ে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন: শহীদের মৃত্যুযন্ত্রণা হয় কি?

ফিকহশাস্ত্রে শহীদের প্রকারভেদ

ফিকহশাস্ত্রে শহীদ প্রধানত দুই ধরনের-

১. শহীদে হাকিকি: যিনি আল্লাহর পথে লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হন। তাঁকে গোসল দেওয়া হয় না। রক্তমাখা পোশাকেই জানাজাশেষে দাফন করা হয়।

২. শহীদে হুকমি: যাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন রোগ, দুর্ঘটনা বা বিশেষ কারণে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের স্বাভাবিক নিয়মে গোসল, জানাজা ও দাফন করা হয়। তবে আখেরাতে তাঁরা শহীদের সওয়াব লাভ করবেন।

কারা শহীদের সওয়াব লাভ করবেন?

রাসুলুল্লাহ (স.) যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে মৃত্যুবরণকারী কিছু মুমিনের জন্যও শহীদের সওয়াবের সুসংবাদ দিয়েছেন। সহিহ হাদিস অনুযায়ী তাঁদের মধ্যে রয়েছেন-

  • মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী
  • পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী
  • পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী
  • আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারী
  • ভবন বা দেয়াল চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী
  • প্রসবকালীন মৃত্যুবরণকারী নারী

(সহিহ মুসলিম: ১৯১৪,১৯১৫; সুনানে আবু দাউদ: ৩১১১)

এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ, জীবন, পরিবার কিংবা দ্বীন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে-ও শহীদ।’ (সুনানে তিরমিজি: ১৪২১)

হাদিসে উল্লেখিত এসব ব্যক্তি শহীদে হুকমি হিসেবে আখেরাতে শহীদের সওয়াব লাভ করবেন।

আরও পড়ুন: শহীদদের জন্য যে দোয়া পড়বেন

শহীদের বিশেষ মর্যাদা

হাদিসে শহীদের জন্য বিশেষ সম্মান ও পুরস্কারের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, জান্নাতে প্রবেশের পর কেউ আর দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে না। তবে শহীদ ব্যতিক্রম। শাহাদাতের মর্যাদা দেখে সে বারবার দুনিয়ায় ফিরে এসে আল্লাহর পথে শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করবে। (সহিহ বুখারি: ২৮১৭)

আরেক হাদিসে এসেছে, শহীদের রক্তের প্রথম ফোঁটা ঝরার সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের ঋণ ছাড়া তাঁর সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। তাঁকে জান্নাতে তাঁর মর্যাদা দেখানো হয়, কবরের আজাব থেকে নিরাপত্তা দেওয়া হয় এবং কেয়ামতের দিনের মহাভীতি থেকেও রক্ষা করা হবে। তাঁর মাথায় পরানো হবে সম্মানের মুকুট। (সুনানে তিরমিজি: ১৬৬৩)

ঋণের দায় ও মানুষের হক

শহীদের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ হলেও মানুষের হক বা ঋণের ব্যাপারে ইসলাম অত্যন্ত কঠোর। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া ব্যক্তির সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, তবে ঋণ ব্যতীত।’ (সহিহ মুসলিম: ১৮৮৫)

অর্থাৎ শহীদের মর্যাদা লাভ করলেও মানুষের পাওনা বা ঋণের দায় থেকে মুক্তি মেলে না। তাই কারও হক নষ্ট করা বা ঋণ পরিশোধে অবহেলা করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

শহীদ কে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর

কাউকে নিশ্চিতভাবে শহীদ ঘোষণা করা বা তাঁর জান্নাত নিশ্চিত বলে দাবি করা মানুষের কাজ নয়। কার নিয়ত কতটা বিশুদ্ধ ছিল এবং কে প্রকৃত শহীদের মর্যাদা লাভ করবেন, তার চূড়ান্ত ফয়সালা একমাত্র আল্লাহ তাআলাই করবেন। তবে কোরআন ও সহিহ হাদিসে যাঁদের জন্য শহীদের সুসংবাদ এসেছে, তাঁদের ব্যাপারে একজন মুমিন সুপ্রত্যাশা পোষণ করতে পারেন।

একজন মুমিনের কর্তব্য হলো বিশুদ্ধ ঈমান, খাঁটি নিয়ত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানানো। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে শাহাদাত কামনা করে, আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দান করেন, যদিও সে নিজের বিছানায় স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে। (সহিহ মুসলিম: ১৯০৯)

তথ্যসূত্র: সুরা বাকারা: ১৫৪; সুরা আলে ইমরান: ১৬৯; সহিহ বুখারি: ২৮১৭; সহিহ মুসলিম: ১৮৮৫, ১৯০৯, ১৯১৫; সুনানে তিরমিজি: ১৪২১, ১৬৬৩; সুনানে আবু দাউদ: ৩১১১