Dhaka Mail Logo

ইসলাম

ইসলাম গ্রহণের পর করণীয়

ধর্ম ডেস্ক

০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৫ পিএম

ইসলাম গ্রহণ মানুষের জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস এবং হজরত মুহাম্মদ (স.)-কে সর্বশেষ রাসুল হিসেবে মেনে নেওয়ার মাধ্যমে একজন মানুষ ইসলামে প্রবেশ করেন। এর মধ্য দিয়ে তার জীবনে শুরু হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নতুন যাত্রা। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে পূর্বের সব গুনাহ মুছে যায়।’ (সহিহ মুসলিম: ১২১)

ইসলাম গ্রহণের পর অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে- এখন কী করা উচিত? কোরআন ও সুন্নাহ এ বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। একজন মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি করণীয় নিচে তুলে ধরা হলো।

ঈমানকে দৃঢ় করা

ইসলাম গ্রহণের পর সবার আগে নিজের ঈমানকে দৃঢ় করতে হবে। আল্লাহ তাআলা, তাঁর ফেরেশতা, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ, আখেরাত এবং তাকদিরের প্রতি বিশ্বাসই একজন মুসলিমের ঈমানের ভিত্তি। তাই এসব বিষয়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন করে তা অন্তরে দৃঢ়ভাবে ধারণ করা জরুরি।

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা সর্বাত্মকভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা বাকারা: ২০৮)

পবিত্রতা অর্জন

ইসলাম গ্রহণের পর পবিত্রতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অনেক ফকিহ ও আলেমের মতে, এ সময় গোসল করা সুন্নত বা মোস্তাহাব। রাসুলুল্লাহ (স.) কায়স ইবনে আসেম (রা.)-কে ইসলাম গ্রহণের পর পানি ও বরই পাতা দিয়ে গোসল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৫)

এই গোসল শুধু পরিচ্ছন্নতার জন্য নয়, পবিত্র জীবনের পথে নতুন সূচনারও একটি সুন্দর নিদর্শন।

সালাত

ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক ইবাদত হলো সালাত। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করো।’ (সুরা বাকারা: ৪৩)

পাঁচ ওয়াক্ত সালাত একজন মুসলিমের জীবনে আল্লাহর আনুগত্য, শৃঙ্খলা ও আত্মশুদ্ধির ভিত্তি গড়ে তোলে। তাই ইসলাম গ্রহণের পর ধীরে ধীরে নামাজের নিয়ম, প্রয়োজনীয় সুরা ও দোয়া শিখে নিয়মিত সালাত আদায়ের চেষ্টা করা উচিত।

আরও পড়ুন: নামাজ নিয়ে অবহেলার সুযোগ নেই

মৌলিক ইসলামি জ্ঞান অর্জন

ইসলাম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪)

দ্বীন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জনের জন্য নির্ভরযোগ্য আলেম, ইসলামিক সেন্টার বা মসজিদের ইমামের তত্ত্বাবধানে শিক্ষা গ্রহণ করা উত্তম। বর্তমানে বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্যও প্রচারিত হয়। তাই ইসলাম সম্পর্কে কোনো বিষয় জানার ক্ষেত্রে কোরআন ও সহিহ সুন্নাহকেই মূল মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

অমুসলিম পরিবারের সঙ্গে সদ্ব্যবহার

ইসলাম গ্রহণ করলে অমুসলিম পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়—এমন ধারণা সঠিক নয়। ইসলাম বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে, তারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হলেও।

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘তোমার রব আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৩)

নতুন মুসলিমের উত্তম চরিত্র, ধৈর্য ও সুন্দর আচরণ অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের কাছেও ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরে এবং তাদের মনে ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে।

ধারাবাহিকতা ও ভারসাম্য বজায় রাখা

ইসলাম সহজ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। তাই ইসলাম গ্রহণের পর একদিনেই সবকিছু আয়ত্ত করার চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে ফরজ ইবাদতগুলো নিয়মিত করা এবং হারাম বিষয়গুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা উচিত।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সেই আমলই সবচেয়ে প্রিয়, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪৬৪)

ভালো সঙ্গ গ্রহণ

দ্বীনের পথে দৃঢ় থাকতে নেককার ও উত্তম চরিত্রের মুসলিমদের সান্নিধ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকের উচিত, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে তা লক্ষ্য করা।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩)

স্থানীয় মসজিদ, ইমাম এবং দ্বীনদার মুসলিমদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুললে ঈমান ও আমলের পথে অটল থাকা সহজ হয়।

আরও পড়ুন: বন্ধু নির্বাচনে যে ভুল আখেরাতে আফসোসের কারণ হবে

ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ভরসা

ইসলাম গ্রহণের পর পরিবার বা সমাজের পক্ষ থেকে নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের সঙ্গে দ্বীনের ওপর অটল থাকা উচিত।

মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা: ১৫৩)

প্রতিকূল সময়ে নিয়মিত দোয়া করা এবং আল্লাহর কাছে দ্বীনের ওপর অবিচল থাকার তাওফিক প্রার্থনা করা একজন মুসলিমের শক্তির অন্যতম উৎস।

অতীত নিয়ে হতাশ না হওয়া

ইসলাম গ্রহণের পর অতীতের ভুল বা গুনাহ নিয়ে হতাশ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করেন।’ (সুরা জুমার: ৫৩)

তাই অতীতের ভুল নিয়ে নিরাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা রেখে নেক আমলের মাধ্যমে নতুন জীবন গড়ে তোলাই একজন মুসলিমের করণীয়।

ইসলাম গ্রহণ আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে নতুন জীবনের সূচনা। ঈমান, সালাত, ইসলামি জ্ঞান ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে একজন মুসলিম ধীরে ধীরে দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হন। এই পথে ইস্তিকামাতই প্রকৃত সফলতা।

তথ্যসূত্র: সুরা আলাক: ১; সুরা বাকারা: ৪৩, ১৫৩, ২০৮; সুরা বনি ইসরাইল: ২৩; সুরা জুমার: ৫৩; সহিহ বুখারি: ৬৪৬৪; সহিহ মুসলিম: ১২১; সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৫, ৪৮৩৩; সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪