ধর্ম ডেস্ক
২৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৪ পিএম
জান্নাত মুমিনদের চিরস্থায়ী আবাস, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর নেককার বান্দাদের জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। জান্নাতের জীবন, সেখানকার নেয়ামত ও মানুষের অবস্থা নিয়ে মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগে। জান্নাতে কি মৃত্যু থাকবে? মানুষ কি সেখানে ক্লান্ত হবে? কিংবা জান্নাতবাসীদের কি দুনিয়ার মতো ঘুমের প্রয়োজন হবে? কোরআন ও হাদিসে এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়।
পৃথিবীর জীবনে ঘুম আল্লাহর একটি বিশেষ নেয়ামত। সারাদিনের কর্মব্যস্ততায় মানুষের শরীর ও মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ঘুম সেই ক্লান্তি দূর করে শরীরকে নতুন শক্তি ও সতেজতা ফিরিয়ে দেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি বিশ্রামের মাধ্যম।’ (সুরা নাবা: ৯)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘আর তিনিই তোমাদের জন্য রাতকে করেছেন আবরণ, ঘুমকে করেছেন বিশ্রাম এবং দিনকে করেছেন জেগে থাকার সময়।’ (সুরা ফুরকান: ৪৭)
অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে মানুষের স্বাভাবিক প্রয়োজনের অংশ হিসেবেই ঘুম নির্ধারিত হয়েছে।
জান্নাতবাসীদের ঘুম সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘ঘুম হলো মৃত্যুর ভাই। আর জান্নাতবাসীরা কখনো মৃত্যুবরণ করবে না।’ (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান; আলবানি, সিলসিলা সহিহা: ১০৮৭)
আরও পড়ুন: স্বামী-স্ত্রী কে কোন পাশে ঘুমানো সুন্নত?
আলেমরা বলেন, এই হাদিসে ঘুমকে মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, কারণ ঘুমের সময় মানুষের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ও অনুভূতিতে সাময়িক পরিবর্তন আসে। ঘুম মানুষের পার্থিব প্রয়োজনের একটি অংশ। মানুষ ক্লান্ত হয়, বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করে, তাই ঘুম তার জন্য অপরিহার্য।
কিন্তু জান্নাতের জীবন হবে দুনিয়ার জীবনের মতো নয়। সেখানে মানুষের কোনো ক্লান্তি, দুর্বলতা ও অবসাদ থাকবে না। তাই জান্নাতবাসীদের দুনিয়ার মতো ঘুমের প্রয়োজন হবে না।
কোরআনেও আল্লাহ ঘুমকে মানুষের প্রাণের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তাদের মৃত্যুর সময় এবং যারা মরেনি তাদের নিদ্রার সময়। অতঃপর যাদের মৃত্যুর সিদ্ধান্ত হয়েছে তাদের রেখে দেন এবং অন্যদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফিরিয়ে দেন। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য।’ (সুরা জুমার: ৪২)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ঘুম মানুষের জন্য এমন একটি অবস্থা, যার সঙ্গে মৃত্যুর কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। তবে জান্নাতের জীবন হবে চিরস্থায়ী ও পূর্ণতার জীবন।
আরও পড়ুন: এশার পর ঘুম: নববী রুটিনের হেকমত
দুনিয়াতে মানুষ ঘুমের মাধ্যমে ক্লান্তি দূর করে। কিন্তু জান্নাতের জীবন হবে সব ধরনের অবসাদ ও দুর্বলতামুক্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সেখানে তাদের কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং সেখান থেকে তারা কখনো বহিষ্কৃতও হবে না।’ (সুরা হিজর: ৪৮)
আরও বলেন, ‘যিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদের এই স্থায়ী আবাসে স্থান দিয়েছেন, সেখানে আমাদের কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করবে না এবং কোনো অবসাদও হবে না।’ (সুরা ফাতির: ৩৫)
অর্থাৎ জান্নাতবাসীদের জীবন হবে এমন এক জীবন, যেখানে বিশ্রামের জন্য দুনিয়ার মতো ঘুমের প্রয়োজন থাকবে না।
হাদিসে জান্নাতবাসীদের শরীরের বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথাও উল্লেখ হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জান্নাতের অধিবাসীরা সেখানে খাবার খাবে এবং পান করবে। কিন্তু তারা পায়খানা করবে না, নাক ঝাড়বে না এবং প্রস্রাবও করবে না। তবে তাদের সেই খাবার হজম হয়ে মিশকের (কস্তুরীর) মতো সুগন্ধযুক্ত ঢেঁকুর বা ঘামের মাধ্যমে বের হয়ে যাবে। তাদেরকে তাসবিহ ও আল্লাহর প্রশংসা করার প্রেরণা দেওয়া হবে, যেমন স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়ার প্রেরণা দেওয়া হয়।’ (সহিহ মুসলিম: ২৮৩৫)
এ থেকে বোঝা যায়, জান্নাতের মানুষের জীবন দুনিয়ার মানুষের মতো সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার মধ্যে আবদ্ধ হবে না। সেখানে রোগ, বার্ধক্য, ক্লান্তি ও শারীরিক কষ্টের কোনো স্থান থাকবে না।
আরও পড়ুন: ঘুমের আগে ছোট্ট যে আমলে জান্নাতের সুসংবাদ
দুনিয়ার জীবনে ঘুম না আসা মানুষের জন্য কষ্টের কারণ হতে পারে। কিন্তু জান্নাতের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
জান্নাত হলো শান্তি, প্রশান্তি ও অফুরন্ত নেয়ামতের আবাস। সেখানে মানুষের মনে কোনো দুশ্চিন্তা, ক্লান্তি বা অস্বস্তি থাকবে না। তাই ঘুমের প্রয়োজন না থাকা কোনো কষ্ট নয়, এটি জান্নাতের পূর্ণতা ও বিশেষ নেয়ামতের অংশ।
অতএব, কোরআন ও হাদিসের আলোকে বোঝা যায়, জান্নাতবাসীদের দুনিয়ার মতো ঘুমের প্রয়োজন হবে না। তারা আল্লাহর অনুগ্রহে চিরস্থায়ী শান্তি ও নেয়ামতের মধ্যে অবস্থান করবে। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করাই একজন মুমিনের প্রধান দায়িত্ব। কারণ জান্নাতের সেই চিরস্থায়ী জীবন লাভই ঈমানদারের সবচেয়ে বড় সফলতা।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন, সহিহ মুসলিম, শুআবুল ঈমান (বায়হাকি), সিলসিলা সহিহা, তাফসির ইবনে কাসির