ধর্ম ডেস্ক
০৫ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম
নরওয়ের মতো দেশে, যেখানে বছরের কোনো কোনো সময়ে দিন ২০ ঘণ্টারও বেশি দীর্ঘ হয় কিংবা কোথাও সূর্য প্রায় অস্তই যায় না, সেখানে মুসলমানরা রোজা রাখেন কীভাবে? অনেকের কাছে বিষয়টি রহস্যময় মনে হলেও ইসলামি শরিয়তে এর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। কোরআন-সুন্নাহ এবং ফকিহদের গবেষণার আলোকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরেই এ বিষয়ে আলোচনা চলে আসছে।
নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও আইসল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে দিন-রাতের দৈর্ঘ্য অস্বাভাবিক হয়ে যায়। বিশেষ করে নরওয়ের ট্রমসো ও হ্যামারফেস্ট-এর মতো আর্কটিক সার্কেলের ভেতরের শহরগুলোতে কখনো সূর্য দীর্ঘ সময় অস্ত যায় না, আবার শীতকালে দীর্ঘ সময় সূর্যের দেখা মেলে না।
কোনো কোনো মৌসুমে এমনও হয়, ইফতারের কিছুক্ষণ পরই ফজরের সময় হয়ে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবে নামাজ ও রোজার সময় নির্ধারণে জটিলতা দেখা দেয়।
এ ধরনের অঞ্চলের মুসলমানদের জন্য নামাজ ও রোজার বিধান রহিত হয়ে যায় না। হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ রয়েছে, অস্বাভাবিক দিন-রাতের অঞ্চলেও ইবাদতের বিধান বহাল থাকবে; তবে তা আদায়ের পদ্ধতিতে কিছু ব্যাখ্যা রয়েছে।
এর ভিত্তি পাওয়া যায় রাসুলুল্লাহ (স.)-এর একটি সহিহ হাদিসে। দাজ্জালের সময় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দাজ্জাল পৃথিবীতে ৪০ দিন অবস্থান করবে। প্রথম দিন হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয় দিন এক মাসের সমান, তৃতীয় দিন এক সপ্তাহের সমান এবং বাকি দিনগুলো হবে সাধারণ দিনের মতো।’ তখন সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করেন, এত দীর্ঘ দিনে কি এক দিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই যথেষ্ট হবে?
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘না; বরং সময় হিসাব করে নামাজ আদায় করবে।’ (সহিহ মুসলিম: ২৯৩৭; সুনানে আবু দাউদ: ৪৩২১)
এই হাদিস থেকেই ফকিহরা অস্বাভাবিক দিন-রাতের ক্ষেত্রে সময় নির্ধারণের নীতিমালা গ্রহণ করেছেন।
আরও পড়ুন: আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মুসলমানরা কেমন আছেন
যদি সূর্য প্রতিদিন ওঠে ও অস্ত যায়, যদিও দিনের দৈর্ঘ্য অনেক বেশি হয়, তাহলে স্থানীয় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় অনুযায়ীই রোজা পালন করতে হবে।
তবে দিন অস্বাভাবিক দীর্ঘ হয়ে যাওয়ার কারণে রোজা রাখা যদি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, তাহলে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ অনুযায়ী ওই সময় রোজা ভেঙে পরে স্বাভাবিক সময়ে কাজা করার অবকাশ রয়েছে।
যদি টানা কয়েক দিন সূর্য অস্ত না যায়, তাহলে ২৪ ঘণ্টাকে ভিত্তি ধরে সময় ভাগ করে নামাজ ও রোজা আদায় করার কথা ফকিহরা উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে আনুমানিক রাত নির্ধারণ করে সাহরি, রোজা, ইফতার এবং মাগরিব, এশা ও তারাবির নামাজ আদায় করা হবে।
আরও পড়ুন: দীর্ঘ সময় রোজা রাখতে হয় যেসব দেশে
কখনো কখনো সূর্য অস্ত গেলেও ইফতার ও সাহরির জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতিতে আলেমরা কয়েকটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রথমত, ২৪ ঘণ্টাকে ভিত্তি ধরে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় নির্ধারণ করা এবং প্রয়োজনীয় সময় রেখে সাহরি ও ইফতার সম্পন্ন করা।
দ্বিতীয়ত, যে মৌসুমে স্বাভাবিক সময় পাওয়া যায়, সেই মৌসুমের শেষ দিনের সময়সূচিকে মানদণ্ড হিসেবে অনুসরণ করা।
তৃতীয়ত, নিকটবর্তী এমন কোনো দেশের সময় অনুসরণ করা, যেখানে সূর্য নিয়মিত উদয় ও অস্ত যায়। এ মতের সমর্থনে রাবেতাতুল আলমিল ইসলামী সুপারিশ করেছে যে, প্রয়োজন হলে ৪৫° অক্ষাংশের কোনো এলাকার সময়সূচিকে মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে।
ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা পৃথিবীর সব অঞ্চল ও সব পরিস্থিতির মানুষের জন্য প্রযোজ্য। তাই দিন-রাতের অস্বাভাবিকতার মতো বিরল পরিস্থিতির জন্যও শরিয়তে বাস্তবসম্মত নির্দেশনা রয়েছে।
নরওয়ের মুসলমানদের রোজা তাই কোনো রহস্য নয়; আসলে এটি ইসলামের সহজতা, প্রজ্ঞা ও সার্বজনীনতার একটি বাস্তব উদাহরণ।
তথ্যসূত্র: সহিহ মুসলিম; সুনানে আবু দাউদ; হাশিয়াতুত তাহতাবি; রদ্দুল মুহতার; ফাতহুল কাদির; ফতোয়ায়ে হক্কানিয়া; আহসানুল ফতোওয়া; ইমদাদুল ফতোয়া; তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম।