ধর্ম ডেস্ক
১৯ জুন ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
জুমার দিনের অন্যতম প্রিয় আমল সুরা কাহাফ তেলাওয়াত। অনেকেরই প্রশ্ন- ব্যস্ততা বা ভুলে যাওয়ার কারণে দিনের বেলা পড়া না হলে রাতে পড়লে কি একই ফজিলত মিলবে? উত্তর দেওয়ার আগে দেখে নেওয়া দরকার, এ বিষয়ের দলিলগুলো আসলে কতটা স্পষ্ট।
হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে, তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময় নূরে আলোকিত থাকবে’- এই মর্মের একাধিক বর্ণনা মুস্তাদরাকে হাকেম ও বায়হাকিতে এসেছে।
ইমাম হাকিম ও পরবর্তীতে শাইখ আলবানি (রহ.) এই হাদিসকে সহিহ বলেছেন। তবে এখানে সততার সঙ্গে উল্লেখ করা দরকার- এই গ্রেডিং সর্বসম্মত নয়।
ইমাম জাহাবি (রহ.) এই হাদিসের একজন রাবি নুয়াইম ইবনে হাম্মাদ সম্পর্কে আপত্তি তুলেছেন। আর ইমাম নাসায়ি ও ইমাম বায়হাকি (রহ.) উভয়েই মত দিয়েছেন যে, এই হাদিসের অধিক নির্ভরযোগ্য রূপটি আসলে সাহাবি আবু সাঈদ (রা.)-এর নিজস্ব উক্তি (মওকুফ), সরাসরি নবীজি (স.)-এর বাণী (মারফু) নয়।
শাইখ ইবনে বাজ (রহ.)-এর মূল্যায়ন হলো, এ বিষয়ের পৃথক পৃথক বর্ণনাগুলো দুর্বল হলেও একে অপরকে শক্তিশালী করে, তাই সামগ্রিকভাবে এই আমলটি মোস্তাহাব (উত্তম) হিসেবে গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ এটি অবশ্যই একটি আমলযোগ্য ও উৎসাহিত সুন্নাহ-চর্চা, তবে এর সনদ নিয়ে আলেমদের মাঝে বাস্তব মতভেদ রয়েছে, যা অনেক লেখায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় না।
আরও পড়ুন: সুরা কাহাফের প্রথম ১০ আয়াত, উচ্চারণ ও অর্থসহ
এখানেই মূল মতভেদ। একদল আলেমের মতে, ইসলামি গণনায় দিন-রাত একসাথে বিবেচিত হওয়ায় ‘জুমার দিন’ বলতে বৃহস্পতিবার মাগরিব থেকে শুক্রবার মাগরিব পর্যন্ত পুরো সময় বোঝানো হয়। এই মতে বৃহস্পতিবার রাতও এর অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহ.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শরিয়তের কিছু প্রসঙ্গে ‘দিন’ বলতে ফজর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময় বোঝানো হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ফজিলতের নির্ধারিত সময় হলো শুক্রবার ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত।
শাইখ ইবনে বাজ (রহ.)-এর ফতোয়াতেও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, বৃহস্পতিবার রাতে পড়ার পক্ষে নির্দিষ্ট শক্ত দলিল তাঁর জানামতে নেই।
তবে উভয় মতেই একটি বিষয়ে কোনো ভিন্নতা নেই যে, শুক্রবার সূর্যাস্তের (মাগরিব) পর এই ফজিলতের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়। এরপরের রাত সাধারণভাবে শনিবারের অন্তর্ভুক্ত ধরা হয়, যা জুমার দিনের অংশ হিসেবে গণ্য নয়।
আরও পড়ুন: জুমার দিন দরুদ ও সুরা কাহাফ পড়তে বলা হয়েছে যে কারণে
দুটি ভিন্ন পরিস্থিতি আলাদাভাবে বোঝা দরকার।
বৃহস্পতিবার রাতে পড়া (জুমার আগের রাত): এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। প্রশস্ত সংজ্ঞা গ্রহণকারীদের মতে এটি জুমার দিনের অন্তর্ভুক্ত, তাই ফজিলত পাওয়ার আশা করা যায়। তবে ইবনে বাজ ও ইবনে উসাইমিন (রহ.)-এর সতর্ক অবস্থান অনুযায়ী, এতে নিশ্চিতভাবে ফজিলত নির্ধারণ করা যায় না। তাই সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা হলো শুক্রবার ফজরের পর থেকে পড়া।
শুক্রবার মাগরিবের পর পড়া: এই সময়ে সুরা কাহাফ পড়লে কোরআন তেলাওয়াতের সাধারণ সওয়াব অবশ্যই পাওয়া যাবে, কিন্তু জুমার দিনের নির্দিষ্ট ফজিলত আর প্রযোজ্য হবে না।
আরও পড়ুন: জুমার দিন সকাল-সন্ধ্যা যেসব সুরা পাঠের গুরুত্ব বেশি
সুরা কাহাফ তেলাওয়াত ফরজ বা ওয়াজিব নয়; এটি একটি মোস্তাহাব আমল। তাই মিস হলে কোনো গুনাহ নেই। ব্যস্ততা থাকলে উত্তম অভ্যাস হলো শুক্রবার ফজরের পরই পড়ে নেওয়া, যাতে ভুলে যাওয়ার সুযোগ না থাকে। আর যদি মিস হয়ে যায়, তাহলে পরবর্তীতে যেকোনো সময় কোরআন হিসেবে তেলাওয়াত করা যাবে; এতে সাধারণ সওয়াব অবশ্যই রয়েছে, যদিও নির্দিষ্ট জুমার ফজিলত আর পাওয়া যাবে না।
মোটকথা, সুরা কাহাফের ফজিলত সংক্রান্ত হাদিসগুলোর সনদ নিয়ে আলেমদের মাঝে মতভেদ থাকলেও এটি একটি উৎসাহিত ও আমলযোগ্য সুন্নাহ। সময়সীমা নিয়েও ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে- কেউ বৃহস্পতিবার রাত থেকে ধরেন, কেউ শুক্রবার ফজর থেকে। তবে সবাই একমত যে, শুক্রবার সূর্যাস্তের পর এই ফজিলতের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে যায়। তাই সবচেয়ে নিরাপদ ও বিতর্কমুক্ত পথ হলো শুক্রবার ফজরের পর থেকে মাগরিবের আগে সুরা কাহাফ তেলাওয়াত করা।
তথ্যসূত্র: মুস্তাদরাকে হাকেম, বায়হাকি, সহিহ আল-জামি (আলবানি), শাইখ ইবনে বাজ ও শাইখ ইবনে উসাইমিনের ফতোয়া সংকলন।