ধর্ম ডেস্ক
১৮ জুন ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম
মানুষের শরীরের ছোট একটি অঙ্গ জিহ্বা। কিন্তু এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। একটি ভালো কথা মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাতের পথে এগিয়ে দিতে পারে, আবার একটি অসতর্ক বাক্য তাকে গুনাহ ও ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ কারণেই ইসলাম কথাবার্তার ক্ষেত্রে সংযম ও সতর্কতার শিক্ষা দিয়েছে। বিশেষত অপ্রয়োজনীয় ও অর্থহীন কথা থেকে বিরত থাকার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে। কারণ অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ধীরে ধীরে হৃদয়ের কোমলতা নষ্ট করে দেয়। আর হৃদয় কঠিন হয়ে গেলে আল্লাহভীতি, আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহিতার অনুভূতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহর জিকির ছাড়া বেশি কথা বলো না। কারণ আল্লাহর জিকির ছাড়া বেশি কথা বলা হৃদয়কে কঠিন করে দেয়। আর আল্লাহ থেকে সবচেয়ে দূরের মানুষ হলো কঠিন হৃদয়ের মানুষ।’ (জামে তিরমিজি: ২৪১১)
এই হাদিসে অপ্রয়োজনীয় কথার অন্যতম বড় ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। মানুষের হৃদয় যখন কঠিন হয়ে যায়, তখন কোরআনের উপদেশ, মৃত্যুর স্মরণ কিংবা মৃত্যুর পরের চিন্তা তার ওপর আগের মতো প্রভাব ফেলে না। ফলে আল্লাহর ভয়, আত্মসমালোচনা এবং আখেরাতের জবাবদিহিতার অনুভূতি ক্রমেই ম্লান হতে থাকে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা সফল মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে... যারা অনর্থক কথাকর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে।’ (সুরা মুমিনুন: ১-৩)
তাফসিরবিদদের মতে, ‘লাগও’ বা অনর্থক কথার মধ্যে এমন সব কথা অন্তর্ভুক্ত, যা দুনিয়া বা আখেরাতের কোনো উপকারে আসে না। একজন মুমিন নিজের সময় ও জিহ্বাকে এসব থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে।
আরও পড়ুন: মুমিন আসলে কারা, কোরআন কী বলছে
ইসলাম মানুষকে নীরব থাকতে বলেনি; বরং কল্যাণকর কথা বলতে উৎসাহিত করেছে। তবে অপ্রয়োজনীয় কথার ক্ষেত্রে নীরবতাকেই উত্তম বলে নির্দেশ দিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন উত্তম কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ৬০১৮; সহিহ মুসলিম: ৪৭)
এই হাদিসের আলোকে আলেমরা বলেন, কোনো কথা বলার আগে একজন মুমিনের চিন্তা করা উচিত- এতে কল্যাণ আছে কি না। যদি না থাকে, তাহলে নীরব থাকাই নিরাপদ।
মানুষ অনেক সময় মনে করে, সামান্য একটি কথা বললে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। অথচ হাদিসে এ ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘বান্দা কখনো আল্লাহর সন্তুষ্টির এমন কথা বলে, যার গুরুত্ব সে উপলব্ধি করে না; অথচ আল্লাহ এর মাধ্যমে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আবার কখনো আল্লাহর অসন্তুষ্টির এমন কথা বলে ফেলে, যার পরিণতি সে জানে না; অথচ সে কারণে সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হয়।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪৭৮)
অতএব বেশি কথা বলতে গিয়ে মানুষ কখন মিথ্যা, গিবত, অপবাদ, উপহাস বা কটূক্তিতে জড়িয়ে পড়ে, তা অনেক সময় সে নিজেও বুঝতে পারে না।
আরও পড়ুন: নিজের ধ্বংসের জন্য লাগামহীন একটি কথাই যথেষ্ট
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।’ (সুরা কাফ: ১৮)
এই আয়াত স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের কোনো কথাই অগোচরে থাকে না। প্রতিটি শব্দের হিসাব একদিন দিতে হবে।
সাহাবি মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (স.) একবার বলেছিলেন, ‘মানুষকে শুধুমাত্র জিহবার উপার্জনের কারণেই অধঃমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (জামে তিরমিজি: ২৬১৬)
এই হাদিস প্রমাণ করে, জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা আখেরাতের মুক্তির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
সাহাবিদের জীবনেও জিহ্বা সংযমের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেখা যায়। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর একটি প্রসিদ্ধ উক্তি হলো, ‘যার কথা বেশি, তার ভুলও বেশি। যার ভুল বেশি, তার লজ্জা কমে যায়। যার লজ্জা কমে যায়, তার তাকওয়া কমে যায়। আর যার তাকওয়া কমে যায়, তার অন্তর মরে যায়।’ যদিও এটি হাদিস নয়, তবে একজন খোলাফায়ে রাশেদিনের এই উপদেশ বাচালতা ও তাকওয়ার সম্পর্ককে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরে।
আরও পড়ুন: অনর্থক তর্কে ধ্বংস, সংযমে জান্নাত
সালাফে সালেহিন জিহ্বার হেফাজতকে তাকওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করতেন। তারা প্রয়োজন ছাড়া কথা বলতেন না এবং প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের আগে চিন্তা করতেন, তা আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ হবে নাকি অসন্তুষ্টির।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আড্ডা ও অনলাইন আলোচনায় মানুষ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কথা বলছে। ফলে গিবত, বিদ্রূপ, অপবাদ ও অনর্থক বিতর্কেও জড়িয়ে পড়ছে বেশি। একজন মুমিনের জন্য তাই আগের চেয়ে আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
অপ্রয়োজনীয় কথা প্রথমে ক্ষতিকর মনে না হলেও ধীরে ধীরে তা হৃদয়ের কোমলতা নষ্ট করে দেয়। হৃদয় কঠিন হয়ে গেলে আল্লাহর ভয়, ইবাদতের স্বাদ, কোরআনের প্রভাব এবং গুনাহ থেকে বাঁচার অনুভূতি কমে যায়। তাই একজন মুমিনের উচিত জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, কল্যাণকর কথা বলা এবং অনর্থক কথাবার্তা থেকে দূরে থাকা। কেননা, জিহ্বার সংযমই তাকওয়া রক্ষা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।