ধর্ম ডেস্ক
১৪ জুন ২০২৬, ০১:৪৭ পিএম
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللَّهِ إِلَّا وَهُمْ مُشْرِكُونَ ‘তাদের অধিকাংশ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে, কিন্তু সাথে শিরকও করে।’ (সুরা ইউসুফ: ১০৬)
আয়াতটি পড়লে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- আল্লাহকে বিশ্বাস করার পরও কীভাবে কেউ মুশরিক হতে পারে? এখানে আসলে কাদের কথা বলা হয়েছে এবং কী ধরনের শিরকের কথা বোঝানো হয়েছে? তাফসিরের কিতাবগুলোতে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।
সুরা ইউসুফে আল্লাহ তাআলা মক্কার মুশরিকদের উদ্দেশে বিভিন্ন নিদর্শন তুলে ধরেছেন। তারা আসমান-জমিনের স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহকে স্বীকার করত, বিপদে আল্লাহকে ডাকত এবং বিশ্বাস করত যে আল্লাহই রিজিকদাতা। অথচ একই সঙ্গে তারা মূর্তি ও দেবদেবীকে আল্লাহর শরিক বানাত এবং মনে করত এই মাধ্যমগুলো তাদের আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেবে। আল্লাহ তাআলা তাদের সেই মনোভাব তুলে ধরে বলেন, ‘তারা বলে- আমরা কেবল এজন্যই তাদের ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।’ (সুরা যুমার: ৩)
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন, ‘আপনি যদি তাদের জিজ্ঞেস করেন- আসমান ও জমিন কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে- আল্লাহ।’ (সুরা লোকমান: ২৫) তারপরও তারা ইবাদতে অন্যকে শরিক করত। এই স্ববিরোধিতাকেই আল্লাহ এই আয়াতে তুলে ধরেছেন।
বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘তুমি যদি তাদের জিজ্ঞেস করো, আকাশ-জমিন কে সৃষ্টি করেছে? তারা বলবে, আল্লাহ। কিন্তু তারপরও তারা আল্লাহর সঙ্গে অন্যদের ইবাদত করে।’ (তাফসিরে তাবারি)
আরও পড়ুন: বিদআত দেখলে সাহাবি-তাবেয়িরা যা করতেন
বিখ্যাত তাবেঈ মুজাহিদ ইবনে জাবর (রহ.) বলেন, ‘তাদের ঈমান ছিল এই যে, আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং রিজিক দেন। কিন্তু তারা তাঁর সঙ্গে অন্যদের শরিক করত।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)
এটি ছিল রবুবিয়্যাত অর্থাৎ আল্লাহকে পালনকর্তা হিসেবে স্বীকার করা সত্ত্বেও উলুহিয়্যাত তথা ইবাদতে শিরিক করার উদাহরণ।
কিছু মুফাসসির বলেন, এ আয়াতের মধ্যে এমন লোকেরাও অন্তর্ভুক্ত, যারা বিপদের সময় একমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে; কিন্তু বিপদ কেটে গেলে আবার অন্যের ওপর নির্ভরতা ও শিরকি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। (তাফসিরে তাবারি)
মক্কার মুশরিকরা হজের সময় তালবিয়া পাঠ করত এভাবে- ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লা শারিকা লাকা, ইল্লা শারিকান হুয়া লাকা’- অর্থাৎ তারা আল্লাহর একত্ব স্বীকার করতে করতেই শিরিক মিশিয়ে দিত। রাসুলুল্লাহ (স.) তাদের ‘লা শারিকা লাকা’ পর্যন্ত বলতে শুনে বলতেন, ‘যথেষ্ট, এতটুকুই বলো’- কারণ এর পরের অংশ ছিল সরাসরি শিরক। (সহিহ মুসলিম: ১১৮৫) ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, এভাবেই তারা ঈমানের সঙ্গে শিরক মিশিয়ে ফেলেছিল।
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) স্পষ্ট বলেন, যেসব মুসলিম ঈমান সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রকার শিরকে লিপ্ত রয়েছে, তারাও এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। (তাফসিরে ইবনে কাসির)
আরও পড়ুন: না বুঝে শিরক করলে আল্লাহ শাস্তি দেবেন?
আলেমরা শিরককে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছেন-
বড় শিরক (শিরকে আকবর): আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে গায়েবি সাহায্য চাওয়া, দোয়া করা, মানত করা বা আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে পশু জবাই করা। জীবিত মানুষের কাছে স্বাভাবিক সহযোগিতা চাওয়া এর অন্তর্ভুক্ত নয়।
ছোট শিরক (শিরকে আসগর): রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে যে বিষয়টির সবচেয়ে বেশি আশঙ্কা করি তা হলো ছোট শিরক।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, তা হলো রিয়া- লোক দেখানো ইবাদত।’ (মুসনাদে আহমাদ: ৫/৪২৯)
কথার মধ্যে শিরকের উপাদান: আল্লাহ ছাড়া অন্যের নামে কসম করাকেও হাদিসে শিরক বলা হয়েছে। (সহিহ ইবনে হিব্বান: ১০/১৯৯, হাদিস নং ৪৩৫৮) এ ছাড়া ‘আল্লাহ এবং অমুকের কারণে বেঁচে গেছি’- এ ধরনের বাক্য সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়েছে। (মুসনাদে আহমদ)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে শুধু আল্লাহকে স্রষ্টা হিসেবে বিশ্বাস করাই যথেষ্ট নয়; ইবাদত, দোয়া, ভরসা, ভয় ও আশা সবকিছুতে আল্লাহকে একক মানতে হবে। তাওহিদের দাবি হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে একমাত্র উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করা।
সুরা ইউসুফের ১০৬ নম্বর আয়াতে মূলত মক্কার মুশরিকদের কথা বলা হয়েছে, যারা আল্লাহকে স্রষ্টা ও রিজিকদাতা হিসেবে মানত, কিন্তু ইবাদতে তাঁর সঙ্গে অন্যদের শরিক করত। তবে ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)-সহ বহু মুফাসসির স্পষ্ট করেছেন যে এই আয়াতের শিক্ষা সব যুগের জন্য প্রযোজ্য। তাই প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব হলো নিজের আকিদা, ইবাদত, কথা ও আমলকে শিরকমুক্ত রাখা এবং তাওহিদের বিশুদ্ধ শিক্ষা আঁকড়ে ধরা।