ধর্ম ডেস্ক
১৩ মে ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
কোরবানি ইসলামের একটি মহান নিদর্শন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু জবাই করার মাধ্যমে মুমিনরা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ঐতিহাসিক ত্যাগের স্মৃতি ধারণ করেন। তবে ইবাদত কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো তা শরিয়তসম্মত পদ্ধতিতে আদায় করা।
কোরবানিকে ঘিরে একটি প্রশ্ন প্রায়ই শোনা যায়- গরু বা মহিষের কোরবানিতে একটি ভাগে কি দুই বা তিনজন মিলে শরিক হওয়া জায়েজ? অনেক সময় পরিবারের কয়েকজন সদস্য বা ভাইয়েরা মিলে অর্থ সংগ্রহ করে কোরবানির একটি শেয়ার বা ‘ভাগ’ নিয়ে থাকেন। ইসলামি শরিয়ত ও ফিকহ শাস্ত্রের আলোকে এর সঠিক বিধান কী, তা জেনে নেওয়া জরুরি।
ইসলামি শরিয়তের বিধান অনুযায়ী ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা একজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যায়। আর গরু, মহিষ ও উটের মতো বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন ব্যক্তি শরিক হতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে অলঙ্ঘনীয় শর্ত হলো- প্রত্যেক শরিকের অংশ যেন কমপক্ষে পূর্ণ এক-সপ্তমাংশ (১/৭) হয় এবং প্রতিটি ভাগ কেবল একজন ব্যক্তির পক্ষ থেকেই হতে হবে।
হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন- ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে হুদায়বিয়ার বছরে কোরবানি করেছি। একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরুও সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করেছি।’ (সহিহ মুসলিম: ৩০৫৫)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে বড় পশুর ক্ষেত্রে সাতজন পর্যন্ত শরিক হওয়ার সুযোগ রয়েছে, তবে প্রত্যেকের অংশ স্বতন্ত্র ও পূর্ণ হওয়া আবশ্যক।
আরও পড়ুন: শরিকে কোরবানি করলে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখবেন
কোরবানি একটি সুনির্দিষ্ট সীমার ইবাদত। শরিয়ত বড় পশুর এক-সপ্তমাংশকে একজন ব্যক্তির জন্য ন্যূনতম একক হিসেবে নির্ধারণ করেছে। যদি দুই বা তিনজন ব্যক্তি মিলে একটি ভাগ গ্রহণ করেন, তবে প্রত্যেকের অংশ এক-সপ্তমাংশের চেয়ে কমে যায়। ফকিহগণের অভিমত হলো, কোনো একজন শরিকের অংশ যদি এক-সপ্তমাংশের কম হয়, তাহলে ওই পশুর কোনো শরিকেরই কোরবানি সহিহ হবে না। কারণ, কোরবানির প্রতিটি অংশে স্বতন্ত্র মালিকানা থাকা শরিয়তের শর্ত।
নির্ভরযোগ্য হানাফি ফিকহ গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়ে বলা হয়েছে- ‘গরু বা উটের প্রতিটি ভাগে একাধিক ব্যক্তির শরিক হওয়া বৈধ নয়। যদি কোনো শরিকের অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হয়, তবে কোনো শরিকেরই কোরবানি সহিহ হবে না।’ (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৮,২০৬,২০৭; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/৩০৪,৩০৫)
হাম্বলি মাজহাবের বিশিষ্ট ফকিহ ইবনে কুদামা (রহ.)-এর মতেও এক পশুতে সাতজনের বেশি শরিক হলে কোরবানি সহিহ হয় না। (আল-মুগনি: ১৩/৩৯০)
আরও পড়ুন: অল্প খরচে নিখুঁত কোরবানির ইসলামি পরামর্শ
পারিবারিক বা আর্থিক কারণে কয়েকজন মিলে আলাদা ভাগ নিতে না পারলে শরিয়তসম্মত একটি সুন্দর সমাধান রয়েছে।
ধরা যাক, তিন ভাই মিলে একটি ভাগের টাকা সংগ্রহ করেছেন। সেক্ষেত্রে সরাসরি যৌথভাবে শরিক না হয়ে সেই টাকা যেকোনো একজনকে ‘হেবা’ বা উপহার হিসেবে দিয়ে দিতে পারেন। এরপর ওই ব্যক্তি নিজের নামে পূর্ণ এক ভাগে শরিক হবেন। এতে অন্তত একজনের কোরবানি সহিহভাবে আদায় হবে এবং বাকিরাও সওয়াবের অংশীদার হবেন। কোরবানির পর তারা সবাই মিলে গোশত ভাগ করে নিতে পারবেন। (সূত্র: খুলাসাতুল ফতোয়া: ৪/৩১৫; বাদায়েউস সানায়ে: ৪/২০৬)
মোটকথা, কোরবানির প্রতিটি ভাগ (১/৭ অংশ) কেবল একজন ব্যক্তির নামেই হতে হবে। একাধিক ব্যক্তি মিলে এক ভাগের মালিক হলে কারও কোরবানিই আদায় হবে না। তবে সওয়াবের আশায় অন্যকে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা যাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক মাসআলা অনুযায়ী এবং বিশুদ্ধ নিয়তে কোরবানি আদায়ের তাওফিক দান করুন। আমিন।