কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসলেই মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর মনে একটি প্রশ্ন দেখা দেয়- বর্তমান বাজারের উচ্চমূল্যে সঠিক কোরবানি কীভাবে দেবেন? অনেকের ধারণা, বড় বা দামি পশু না কিনলে হয়ত কোরবানির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে। কিন্তু ইসলামের মূল শিক্ষা ও বিধান অনুযায়ী, সঠিক জ্ঞান থাকলে অল্প খরচেও শরিয়তসম্মত কোরবানি দেওয়া সম্ভব।
কোরবানি দাতার বাজেট ও পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইসলামি সমাধান ও দালিলিক দিকনির্দেশনা নিচে তুলে ধরা হলো-
কোরবানির মূলনীতি: পশুর আকার নয়, লক্ষ্য তাকওয়া
কোরবানি মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্যের পরীক্ষা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘আল্লাহর কাছে কোরবানির গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ: ৩৭)
এই আয়াতটি স্পষ্ট করে দেয় যে, কোরবানির মূল বিষয় পশুর আকার বা অতিরিক্ত মূল্য নয়, বরং দাতার নিয়ত ও আল্লাহভীতি।
কোরবানির পশুর বয়স ও শর্তাবলি
ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ আল-হিদায়া ও ফতোয়া আলমগিরি’র আলোকে পশুর বয়স ও অংশীদারিত্বের নিয়মগুলো নিম্নরূপ-
১. গরু ও মহিষ: কমপক্ষে ২ বছর বয়স হতে হবে। এতে সর্বোচ্চ সাত জন শরিক হতে পারবেন।
২. ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা: কমপক্ষে ১ বছর বয়স হতে হবে। এটি একজনের পক্ষ থেকে আদায় করতে হয়।
৩. উট: কমপক্ষে ৫ বছর বয়স হতে হবে। এতেও সাত জন শরিক হওয়া বৈধ।
(তথ্যসূত্র: আবু দাউদ: ২৭৯৭, তিরমিজি: ১৪৯৮)
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: কীভাবে কোরবানি করলে কবুল হয়
বিশেষ বিধান: দুম্বা ও ভেড়া যদি এতই স্বাস্থ্যবান হয় যে ৬ মাস বয়সেই দেখতে ১ বছর বয়সীর মতো মনে হয়, তাহলে তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ। তবে, ছাগল কমপক্ষে ১ বছর হওয়া জরুরি। (কাজিখান: ৩/৩৪৮; বাদায়ে: ৪/২০৫-২০৬)
অল্প খরচে কোরবানি করার শরিয়তসম্মত পদ্ধতি
বাজেট সাশ্রয়ে ইসলামি শরিয়ত আমাদের কার্যকর বিকল্প দিয়েছে-
অংশীদারিত্ব বা ভাগে কোরবানি: ‘একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যাবে।’ (সহিহ মুসলিম: ১৩১৮; আবু দাউদ: ২৮০৮)। একটি বড় গরু বা মহিষে সাতজন মিলে কোরবানি দিলে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত খরচ অনেকাংশে কমে আসে।
একটি ছাগল বা ভেড়া কোরবানি: একটি ছাগল বা ভেড়া একা কোরবানি দেওয়াও পূর্ণাঙ্গ কোরবানি হিসেবে গণ্য। রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে সাদা-কালো রঙের দুটি দুম্বা কোরবানি করেছেন। (সহিহ বুখারি: ৫৫৬৫) অনেক সময় শরিকে বড় পশু কোরবানির চেয়ে ছাগল কোরবানি সাশ্রয়ী হয়।
আরও পড়ুন: কোরবানির গোশত বণ্টনে যে ভুল করা যাবে না
সঠিক পশু নির্বাচনে সতর্কতা (হাদিসের আলোকে)
সাশ্রয়ী দামে পশু কিনতে গিয়ে ত্রুটিযুক্ত পশু নির্বাচন করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (স.) ৪ ধরনের পশু কোরবানি করতে নিষেধ করেছেন-
১. যার চোখের অন্ধত্ব স্পষ্ট।
২. যে পশুটি মারাত্মক অসুস্থ।
৩. যে পশুটি ল্যাংড়া (যা ভালো করে হাঁটতে পারে না)।
৪. এমন জীর্ণ-শীর্ণ পশু যার হাড়ে মজ্জা নেই।
(তথ্যসূত্র: আবু দাউদ: ২৮০২, তিরমিজি: ১৪৯৭, ইবনে মাজাহ: ৩১৪৪)
ব্যবহারিক কিছু পরামর্শ
বাজারমূল্য ও পশুর সুস্থতা বিবেচনায় কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে-
- উৎপাদনস্থল থেকে সংগ্রহ: শহরের প্রধান বাজারের তুলনায় মফস্বল বা গ্রামের হাট অথবা সরাসরি খামার থেকে পশু কিনলে মধ্যস্বত্বভোগীদের কমিশন বাঁচে, যা দামে সাশ্রয় ঘটায়।
- আগেভাগে ক্রয়: হাটের শেষ মুহূর্তের অনিশ্চয়তা এড়াতে কয়েক দিন আগে পশু কিনলে তুলনামূলক স্থিতিশীল দামে পশু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- ভেড়া বা দুম্বা নির্বাচন: আমাদের দেশে অনেক সময় ছাগলের তুলনায় একই ওজনের ভেড়া বা দুম্বা কিছুটা কম মূল্যে পাওয়া যায়, যা কোরবানি করার জন্য একটি কার্যকর উপায়।
কোরবানি একটি ইবাদত, কোনো লৌকিক প্রদর্শনী বা প্রতিযোগিতা নয়। ইসলামি শরিয়ত একে এতটাই সহজ করে দিয়েছে যে, সাধারণ মানুষও অল্প খরচে সুন্নাহ মেনে কোরবানি দিতে পারেন। অপচয় বর্জন করে সাধ্যের মধ্যে সুস্থ ও ত্রুটিমুক্ত পশু নির্বাচন করাই মুমিনের প্রকৃত কাজ।




