images

ইসলাম

সন্তানকে কেন নীল নদে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন মুসা (আ.)-এর মা?

ধর্ম ডেস্ক

১০ মে ২০২৬, ০২:৪০ পিএম

একজন মায়ের কাছে তাঁর সন্তান পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ। সন্তানের সামান্য কষ্টেও মায়ের বুক ভেঙে যায়। অথচ ইতিহাসে এমন এক মায়ের গল্প আছে, যিনি আল্লাহর নির্দেশে নিজের নবজাতককে কাঠের সিন্দুকে রেখে নীল নদে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি মুসা (আ.)-এর মা; ঈমান, ধৈর্য ও তাওয়াক্কুলের এক অতুলনীয় প্রতীক।

ফেরাউনের নিষ্ঠুর ফরমান

মিসরের অত্যাচারী শাসক ফেরাউন তার গণকদের মুখে শুনেছিল- বনি ইসরাইলের ঘরে এমন এক পুত্র জন্ম নেবে, যার হাতে তার রাজত্বের পতন হবে। সেই আশঙ্কায় সে নির্মম আদেশ জারি করল- বনি ইসরাইলের ঘরে জন্ম নেওয়া প্রতিটি পুত্রসন্তানকে হত্যা করতে হবে।
পুরো মিসরে তখন আতঙ্কের ছায়া। প্রতিটি মায়ের বুকে একটাই ভয়- কখন জল্লাদরা এসে কোলের শিশুকে কেড়ে নেবে। ঠিক এই ভয়াবহ প্রেক্ষাপটেই জন্ম হলো মুসা (আ.)-এর।

আল্লাহর পক্ষ থেকে অলৌকিক নির্দেশ

সন্তানের জন্মের পর মুসা (আ.)-এর মা গভীর দুশ্চিন্তায় পড়লেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা তাঁর অন্তরে ইলহাম পাঠালেন। কোরআনুল কারিমে এসেছে-

وَأَوْحَيْنَآ إِلَىٰٓ أُمِّ مُوسَىٰٓ أَنْ أَرْضِعِيهِ‌ۖ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِى ٱلْيَمِّ وَلَا تَخَافِى وَلَا تَحْزَنِىٓ‌ۖ إِنَّا رَآدُّوهُ إِلَيْكِ وَجَاعِلُوهُ مِنَ ٱلْمُرْسَلِينَ 
‘আমি মুসার মাকে নির্দেশ দিলাম: তুমি তাকে দুধ পান করাও। অতঃপর যখন তার ব্যাপারে ভয় পাবে, তখন তাকে নদীতে ভাসিয়ে দাও। ভয় পেও না, দুঃখ করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে রাসুলদের একজন করব।’ (সুরা কাসাস: ৭)

আরও পড়ুন: যে স্থানে যেভাবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঈসা (আ.)

নীল নদে ভাসিয়ে দেওয়ার সেই রাত

রাতের অন্ধকারে মা শিশুপুত্রকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর কাঠের একটি সিন্দুকে শুইয়ে দিলেন। আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রেখে সিন্দুকের মুখ বন্ধ করে নীল নদের বুকে ছেড়ে দিলেন।
স্রোত সেই সিন্দুক বহন করে নিয়ে চলল। মায়ের চোখ আবছা হয়ে এল। একটু একটু করে সিন্দুক দূরে মিলিয়ে গেল। সেই মুহূর্তের যন্ত্রণা কোরআন এভাবে বর্ণনা করেছে-

وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَىٰ فَـٰرِغًا‌ۖ إِن كَادَتْ لَتُبْدِى بِهِۦ لَوْلَآ أَن رَّبَطْنَا عَلَىٰ قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ 
‘মুসার মায়ের হৃদয় শূন্য হয়ে পড়েছিল। সে তো বিষয়টি প্রকাশ করেই ফেলত, যদি আমি তার হৃদয়কে দৃঢ় না রাখতাম- যাতে সে ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত থাকে।’ (সুরা কাসাস: ১০)

এ যেন মাতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। নিজের অনুভূতির বিরুদ্ধে লড়াই করে শুধু আল্লাহর ওয়াদার উপর ভরসা রাখা।

বোনের নজরদারি ও আল্লাহর পরিকল্পনা

সিন্দুক ভাসিয়ে দেওয়ার পর মা নিশ্চিন্তে ঘরে বসে থাকেননি। তিনি মুসা (আ.)-এর বড় বোনকে বললেন, সিন্দুকের পিছু নিতে; দূর থেকে দেখতে, শিশুটি কোথায় যায়।
বোন নদীর তীর ধরে হেঁটে হেঁটে দূর থেকে দেখলেন- স্রোত সিন্দুকটিকে বহন করে নিয়ে গেছে সরাসরি ফেরাউনের প্রাসাদের ঘাটে। প্রাসাদের লোকেরা সিন্দুক তুলে এনে শিশুটিকে দেখল। ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া শিশুটির প্রতি মায়া অনুভব করলেন এবং স্বামীকে তাকে হত্যা করতে অনুরোধ করলেন।
শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত হলো। কিন্তু এখন তাকে দুধ পান করাতে হবে। প্রাসাদ থেকে একের পর এক ধাত্রী আনা হলো- কিন্তু শিশু মুসা (আ.) কারো দুধ পান করলেন না। আসলে এটি কোনো কাকতাল ছিল না। কোরআন জানাচ্ছে-

وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ مِن قَبْلُ
‘আমি আগে থেকেই তার জন্য সব ধাত্রীর দুধ হারাম করে দিয়েছিলাম।’ (সুরা কাসাস: ১২)

আরও পড়ুন: ইবরাহিম (আ.)-এর স্ত্রী সারার চমকপ্রদ ঘটনা

আল্লাহ এটি নির্ধারণ করে রেখেছিলেন যাতে শিশুটি তার মায়ের কাছেই ফিরে যায়। প্রাসাদের লোকেরা যখন উদ্বিগ্ন, তখন সুযোগ বুঝে বোন এগিয়ে এলেন। নিজের পরিচয় গোপন রেখে, একজন অপরিচিত পথচারীর মতো স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন-

هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ أَهْلِ بَيْتٍ يَكْفُلُونَهُ لَكُمْ وَهُمْ لَهُ نَاصِحُونَ
‘আমি কি তোমাদের এমন একটি পরিবারের সন্ধান দেব, যারা তোমাদের হয়ে এই শিশুকে লালন-পালন করবে এবং তার মঙ্গলকামী হবে?’ (সুরা কাসাস: ১২)

প্রতিশ্রুতি পূরণ: মায়ের কোলে ফিরে আসা

প্রাসাদের লোকেরা রাজি হলো। বোন ছুটে গেল মায়ের কাছে। এবার সেই মা প্রকাশ্যে, নিশ্চিন্তে নিজের সন্তানকে কোলে তুলে নিলেন। ফেরাউনের প্রাসাদে বসেই দুধ পান করালেন। আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি রাখলেন।
فَرَدَدْنَـٰهُ إِلَىٰٓ أُمِّهِۦ كَىْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ وَلِتَعْلَمَ أَنَّ وَعْدَ ٱللَّهِ حَقٌّ ‘অতঃপর আমি তাকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চোখ শীতল হয়, সে দুঃখিত না হয় এবং যাতে সে জানতে পারে যে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য।’ (সুরা কাসাস: ১৩)

শিক্ষা

এই ঘটনা আমাদের তিনটি গভীর সত্য শেখায়।
প্রথমত, তাওয়াক্কুলের অর্থ। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে প্রিয় কিছু ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত তাওয়াক্কুল। নদীতে সিন্দুক ছেড়ে দেওয়া মানে সন্তানকে পরিত্যাগ করা ছিল না; ছিল আল্লাহর হাতে তুলে দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর পরিকল্পনার শ্রেষ্ঠত্ব। ফেরাউনের ঘরেই তার ধ্বংসের কারণ লালিত হলো। মানুষ যা ভয় পায়, আল্লাহ সেটিকেই মাঝে মাঝে কল্যাণের উপায় করে দেন।
তৃতীয়ত, নামহীন মায়ের অমর মর্যাদা। কোরআন তাঁর নাম সংরক্ষণ করেনি, অথচ তাঁর ঈমান ও সাহসের গল্প কেয়ামত পর্যন্ত পঠিত হবে।

মুসা (আ.)-এর মায়ের এই গল্প প্রতিটি বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য এক জীবন্ত বার্তা। যখন চারদিক থেকে পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখলে তিনি এমন পথ খুলে দেন, যা কল্পনাও করা যায় না।