ধর্ম ডেস্ক
০৭ মে ২০২৬, ০১:১৪ পিএম
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সমাজে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, টয়লেটে সুগন্ধি, আতর বা এয়ার ফ্রেশনার রাখলে জ্বিনের অনিষ্ট বা আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। গ্রামাঞ্চল থেকে শহর পর্যন্ত এই বিশ্বাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে। এই প্রতিবেদনে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে— ১. টয়লেটে জ্বিনের উপস্থিতি কি হাদিসে স্বীকৃত? ২. সুগন্ধি রাখলে জ্বিন থেকে রক্ষার কোনো দলিল আছে কি? ৩. ইসলামে জ্বিন থেকে সুরক্ষার প্রকৃত পদ্ধতি কী?
ইসলাম জ্বিনের অস্তিত্বকে সুস্পষ্টভাবে স্বীকার করে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- ‘আমি জ্বিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা জারিয়াত: ৫৬)
টয়লেট ও অপবিত্র স্থানে দুষ্ট জ্বিন বা শয়তানের আনাগোনার বিষয়টি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘নিশ্চয়ই এই টয়লেটগুলোতে (জ্বিন ও শয়তানের) উপস্থিতি থাকে। তাই তোমাদের কেউ টয়লেটে প্রবেশ করতে চাইলে সে যেন বলে- বিসমিল্লাহ।’ (সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে ইবনে মাজাহ)
অর্থাৎ, টয়লেটে শয়তানি উপস্থিতির বিষয়টি হাদিস দ্বারা সমর্থিত; তবে এর প্রতিকার হিসেবে নবীজি (স.) নির্দিষ্ট দোয়া ও জিকিরের কথা বলেছেন, সুগন্ধির কথা নয়।
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) টয়লেটে প্রবেশের পূর্বে এই দোয়া পড়তেন- اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ (আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবায়িস) অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি পুরুষ ও মহিলা শয়তানের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।’ (সহিহ বুখারি: ১৪২; সহিহ মুসলিম: ৩৭৫)
এই হাদিসটি বুখারি ও মুসলিম উভয় সর্বোচ্চ বিশুদ্ধ হাদিসগ্রন্থে সংকলিত। টয়লেটে সুরক্ষার জন্য নবীজি (স.) এই দোয়াটিই শিক্ষা দিয়েছেন। এর বাইরে কোনো বস্তু বা উপকরণের কথা হাদিসে নেই।
আরও পড়ুন: টয়লেটে প্রবেশ ও বের হওয়ার দোয়া
সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করা ইসলামে সুন্নত। নবীজি (স.) নিজে সুগন্ধি পছন্দ করতেন। তবে তাঁর এই পছন্দ ছিল পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবোধ ও সাধারণ জীবনযাপনের অংশ হিসেবে- জ্বিন থেকে সুরক্ষার জন্য নয়। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক।’ (সহিহ মুসলিম: ২২৩) এই পবিত্রতার শিক্ষা থেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ বজায় রাখা কাম্য। কিন্তু পরিষ্কার পরিবেশ রাখা আর ‘সুগন্ধিতে জ্বিন তাড়ানো’- এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
১. প্রচলিত ধারণার দুটি রূপ: সমাজে দুটি পরস্পরবিরোধী ধারণা প্রচলিত আছে- ক. কেউ বলেন, সুগন্ধি জ্বিনকে আকৃষ্ট করে, তাই সুগন্ধি ব্যবহার বিপজ্জনক। খ. কেউ বলেন, সুগন্ধি জ্বিনকে দূরে রাখে, তাই টয়লেটে সুগন্ধি রাখা উপকারী। উভয় দাবিই সহিহ হাদিসে প্রমাণিত নয়।
২. হাদিসশাস্ত্রের রায়: সিহাহ সিত্তাহর ছয়টি গ্রন্থ সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে তিরমিজি, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ি এবং সুনানে ইবনে মাজাহ- এর কোনোটিতেই এই বিষয়ে কোনো সহিহ বা হাসান হাদিস নেই। মুহাদ্দিসগণের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সনদে কোনো সহিহ বা হাসান হাদিস সাব্যস্ত হয়নি।
৩. যে যুক্তিতে ধারণাটি ছড়িয়েছে: কিছু আলেম উল্লেখ করেছেন যে শয়তান ও দুষ্ট জ্বিন অপবিত্র ও দুর্গন্ধযুক্ত স্থান পছন্দ করে। এই তথ্য থেকে অনেকে যুক্তি দেন যে পরিষ্কার ও সুগন্ধময় পরিবেশ তাদের অপছন্দের হবে। এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক অনুমান মাত্র; কোনো নিশ্চিত শরয়ি দলিল নয়। ইসলামে আকিদা ও আমল অনুমানের ভিত্তিতে নয়, দলিলের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
আরও পড়ুন: যে কাঠের ঘ্রাণে জিন পালায়
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাঁর ‘মাজমু আল ফাতাওয়া’ গ্রন্থে বলেছেন যে শরয়ি বিধানের বাইরে কোনো বস্তু বা পদ্ধতির মাধ্যমে জ্বিন-শয়তান থেকে সুরক্ষা চাওয়া বৈধ নয়। একমাত্র আল্লাহর কাছে দোয়া ও শরয়ি আমলের মাধ্যমেই সুরক্ষা সম্ভব।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) তাঁর ‘জাদুল মাআদ’ গ্রন্থে বিস্তারিত বলেছেন যে জ্বিনের প্রভাব থেকে মুক্তির পথ হলো শরয়ি রুকইয়া- কোরআনের আয়াত ও সহিহ দোয়ার মাধ্যমে চিকিৎসা।
সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (আল-লাজনাতুদ দায়িমাহ) স্পষ্টভাবে মত দিয়েছে যে হাদিসবিহীন কোনো বিশ্বাস বা রীতি যেমন বিশেষ বস্তু রেখে জ্বিন থেকে সুরক্ষার চেষ্টা- ইসলামে ভিত্তিহীন।
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু প্রবর্তন করল যা তার অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি: ২৬৯৭)
অতএব, যদি কেউ সুগন্ধিকে শরিয়ত নির্ধারিত আধ্যাত্মিক সুরক্ষার মাধ্যম মনে করেন এবং ‘সুগন্ধি রাখলে জ্বিন থেকে রক্ষা পাব’ এই বিশ্বাস পোষণ করেন, তাহলে সেই বিশ্বাসের পক্ষে কোনো সহিহ দলিল নেই। বস্তু হিসেবে সুগন্ধি রাখা ভিন্ন কথা; কিন্তু এর সাথে আধ্যাত্মিক কার্যকারিতার বিশ্বাস যুক্ত করা দলিলবিহীন।
ইসলামে জ্বিন ও শয়তান থেকে সুরক্ষার জন্য নিম্নোক্ত আমলগুলো কোরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত-
১. টয়লেটে প্রবেশের আগে মাসনুন দোয়া পড়া (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
২. টয়লেট থেকে বের হওয়ার পর সংক্ষিপ্ত দোয়া ‘গুফরানাকা’ পড়া (সুনানে আবু দাউদ: ৩০)
৩. আয়াতুল কুরসি তেলাওয়াত করা- ঘুমের আগে পড়লে সকাল পর্যন্ত শয়তান থেকে সুরক্ষা (সহিহ বুখারি: ২৩১১)
৪. সুরা ফালাক ও সুরা নাস (মুআওয়াযাতাইন) পড়া
৫. ঘরে সুরা বাকারা তেলাওয়াত করা- ‘শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম)
৬. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা এবং তাকওয়াভিত্তিক জীবনযাপন করা
| বিষয় | ইসলামের অবস্থান |
| টয়লেটে জ্বিন/শয়তানের উপস্থিতি | হাদিস দ্বারা সমর্থিত (সুনানে আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ) |
| টয়লেটে প্রবেশের দোয়া | সহিহ সুন্নাহ (বুখারি ও মুসলিম) |
| টয়লেট পরিষ্কার রাখা | ইসলামে উৎসাহিত- পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক |
| সুগন্ধি ব্যবহার করা | বৈধ ও সুন্নত, তবে ভিন্ন প্রসঙ্গে |
| সুগন্ধিতে জ্বিন তাড়ানো যায় | সহিহ কোনো দলিল নেই; ভিত্তিহীন বিশ্বাস |
| সুগন্ধিতে জ্বিন আকৃষ্ট হয় | সহিহ কোনো দলিল নেই; অপ্রমাণিত |
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: টয়লেটে সুগন্ধি রাখা হারাম নয় এবং পরিচ্ছন্নতার জন্য উপকারী হতে পারে। কিন্তু ‘এতে জ্বিনের কবল থেকে রক্ষা পাওয়া যায়’- এটি এমন একটি প্রচলিত ধারণা, যার পক্ষে সহিহ দলিল পাওয়া যায় না। ইসলামে জ্বিন ও শয়তান থেকে সুরক্ষার স্বীকৃত উপায় হলো আল্লাহর কাছে দোয়া, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির এবং সহিহ সুন্নতের আমল।