ধর্ম ডেস্ক
১৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০৮ পিএম
হজ ও ওমরার অন্যতম মৌলিক বিধান হলো ইহরাম। ইহরাম গ্রহণের পর হাজি ও মুআতামিরদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু বিষয় পরিহার করা আবশ্যক (মাহজুরাতে ইহরাম)। এর মধ্যে শরীরের চুল ও হাত-পায়ের নখ কাটা সম্পর্কিত বিধান ফিকহি গ্রন্থসমূহে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আলোচিত হয়েছে।
হানাফি ফিকহসহ অধিকাংশ ফকিহর মতে, ইহরাম অবস্থায় প্রয়োজন ছাড়া নখ কাটা নিষিদ্ধ। এর মূল ভিত্তি হলো পবিত্র কোরআনের নির্দেশ (সুরা বাকারা: ১৯৬) এবং ইহরামের অবস্থায় বাহ্যিক পারিপাট্য ও শারীরিক পরিচর্যা থেকে বিরত থাকার নীতিগত ব্যাখ্যা। মূলত ইহরাম হলো আত্মত্যাগের এক বিশেষ অবস্থা, যেখানে পার্থিব সাজসজ্জার ঊর্ধ্বে আধ্যাত্মিক একাগ্রতাই মুখ্য।
যদি ইহরাম অবস্থায় নখ নিজে থেকে ভেঙে গিয়ে কষ্ট সৃষ্টি করে বা ঝুলে থাকে, তবে কেবল সেই কষ্ট দূর করার উদ্দেশ্যে তা ছেঁটে ফেলা বৈধ। এ বিষয়ে প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে- ‘ইহরাম অবস্থায় নখ ভেঙে গেলে তা কেটে ফেলা যাবে।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা: ১২৯০৩)
এটি ফিকহ শাস্ত্রের একটি প্রয়োজনভিত্তিক অনুমতি (রুখসত), যার জন্য সাধারণত কোনো কাফফারা বা জরিমানা প্রযোজ্য হয় না।
আরও পড়ুন: হজ ২০২৬: প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা
ফিকহি গ্রন্থসমূহে নখ কাটার ক্ষেত্রে ফিদয়া নির্ধারণে পরিমাণ ও পরিস্থিতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যাসমূহ নিম্নরূপ-
১. অধিক পরিমাণ নখ কাটলে (দম): হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে, যদি ইহরাম অবস্থায় একই মজলিশে বা একসাথে কোনো ব্যক্তি এক হাত বা এক পায়ের সব নখ (৫টি) অথবা চার হাত-পায়ের সব নখ (২০টি) কাটে, তবে তার ওপর একটি ‘দম’ অর্থাৎ একটি ছাগল বা দুম্বা কুরবানি করা ওয়াজিব। (আল-মাবসূত ৪/৭৭, বাদায়েউস সানায়ে: ২/৩২৯)
২. অল্প সংখ্যক নখ কাটলে (সদকা): যদি সীমিত সংখ্যক নখ (যেমন ১টি থেকে ৪টি পর্যন্ত) কাটা হয়, তবে হানাফি ফিকহের গ্রন্থসমূহে প্রতিটি নখের বিনিময়ে একজন মিসকিনকে ‘সদকায়ে ফিতর’ পরিমাণ খাদ্য বা তার সমমূল্য দান করার নির্দেশনা রয়েছে। (আল-মুহিতুল রাজাবি: ২/২৪৭: ফতোয়ায়ে খানিয়া: ১/২৮৯)
৩. ভুলবশত বা অসাবধানতাবশত নখ কাটা: ইহরাম অবস্থায় নখ ও চুল কাটার মতো বিষয়গুলোতে হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ মায়ালা অনুযায়ী, অনিচ্ছাকৃতভাবে বিধান লঙ্ঘিত হলেও ফিদিয়া বা দণ্ড প্রযোজ্য হয়। তবে ভুলবশত হওয়ার ক্ষেত্রে গুনাহ না হওয়ার কথা ফিকহি নীতির আলোকে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তি ইনশাআল্লাহ এ ক্ষেত্রে পরকালীন দায়মুক্ত থাকবেন, তবে ইহরামের বিশেষ অবস্থা ও বিধান লঙ্ঘিত হওয়ায় পার্থিব জরিমানা বা ফিদিয়া আদায় করতে হবে।
আরও পড়ুন: ইহরাম অবস্থায় উকুন মারাও কি নিষিদ্ধ? মারলে জরিমানা কী
ইহরামে প্রবেশের আগেই হাত-পায়ের নখ কেটে পরিচ্ছন্ন হওয়া সুন্নাহসম্মত। ইহরাম অবস্থায় অজু, গোসল বা দৈনন্দিন কাজকর্মের সময় অতিরিক্ত সতর্ক থাকা উচিত, যাতে অনিচ্ছাকৃতভাবে নখ না ছিঁড়ে যায়।
ইহরাম অবস্থায় নখ কাটা মূলত নিষিদ্ধ কাজের অন্তর্ভুক্ত হলেও এর প্রয়োগ, ব্যতিক্রম ও কাফফারার ক্ষেত্রে ফিকহি ব্যাখ্যায় যথেষ্ট বিস্তার রয়েছে। তাই হজের সফরে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হলে নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উত্তম।