ধর্ম ডেস্ক
২৫ মার্চ ২০২৬, ০৪:৩০ পিএম
নামাজ মহান রবের সঙ্গে বান্দার নিভৃত সংলাপ। এই ইবাদতে পবিত্রতা, একাগ্রতা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা মুমিনের জন্য অপরিহার্য। তবে অনেক সময় শারীরিক কারণে নামাজের মধ্যে মুখে থুতু বা কফ জমে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এমন অবস্থায় করণীয় কী- তা নিয়ে মুসল্লিদের মধ্যে প্রায়ই দ্বিধা দেখা দেয়। হাদিস ও ফিকহি মূলনীতির আলোকে এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন দিকনির্দেশনা রয়েছে।
নামাজে থুতু ফেলার আদব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (স.) সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছেন। তিনি কেবলার দিকে বা সামনে এবং ডান দিকে থুতু ফেলতে নিষেধ করেছেন।
১. সামনের দিকে নয়: হজরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, নবী (স.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন সে তার প্রতিপালকের সাথে নিভৃতে কথা বলে। অথবা (বলেছেন) তখন তার প্রতিপালক, কেবলা ও তার মাঝখানে থাকেন। কাজেই সে যেন কেবলার দিকে থুতু না ফেলে।’ (সহিহ বুখারি: ৪০৫)
২. ডান দিকে নয়: ডান দিকে ফেরেশতারা থাকেন বলে এ দিকেও থুতু ফেলতে নিষেধ করা হয়েছে। (সহিহ বুখারি: ৪১৬)
আরও পড়ুন: হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বললে কি নামাজ ভেঙে যাবে?
যদি থুতু ফেলার একান্ত প্রয়োজন হয়, তবে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নির্দেশিত পদ্ধতি হলো-
বামে বা পায়ের নিচে: থুতু বাম দিকে অথবা বাম পায়ের নিচে ফেলে তা দাবিয়ে দেওয়া বা মুছে ফেলা। (সহিহ বুখারি: ৪০৫; আবু দাউদ:৪৭৮)
পোশাকের ব্যবহার: সবচেয়ে আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন সমাধানটি রাসুল (স.) নিজেই দেখিয়ে দিয়েছেন। তিনি তাঁর চাদরের এক কোণ ধরে তাতে থুতু ফেলে এক অংশের ওপর অপর অংশ ভাঁজ করে দিলেন এবং বললেন- ‘অথবা এমন করবে’। (সহিহ বুখারি: ৪০৫)

হাদিসে বাম দিকে বা বাম পায়ের নিচে থুতু ফেলার যে অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা ছিল তৎকালীন মাটির মেঝের মসজিদের ক্ষেত্রে। বর্তমানে মসজিদের মেঝেতে টাইলস বা কার্পেট থাকায় সেখানে থুতু ফেলা গুনাহের কাজ। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, নবী (স.) বলেছেন, মসজিদে থুথু ফেলা গুনাহের কাজ, আর তার কাফফারা হচ্ছে তা মুছে ফেলা। (বুখারি: ৪১৫) তাই বর্তমান সময়ে মুসল্লির করণীয় হলো- সাথে টিস্যু বা রুমাল রাখা। থুতু আসলে টিস্যুতে মুছে তা পকেটে রেখে দেওয়া। এতে মসজিদের পবিত্রতা ও নামাজের একাগ্রতা উভয়ই রক্ষা পায়।

আরও পড়ুন: ভূমিকম্পের সময় নামাজ ভেঙে দেওয়া যাবে?
অনেকে মনে করেন মুখে বেশি থুতু জমলে কয়েক কদম হেঁটে গিয়ে জানালা দিয়ে ফেলা যাবে। ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি ভুল ধারণা।
আমলে কাসির (অধিক নড়াচড়া): নামাজের জায়গা ছেড়ে জানালা পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া ‘আমলে কাসির’ হিসেবে গণ্য হয়। ফকিহদের মতে, নামাজের কিবলা থেকে সটকে পড়া এবং অবস্থান পরিবর্তন করে হাঁটাচলা করলে নামাজ ভেঙে যাবে। (ফতোয়ায়ে শামি: ১/৬২৪)
অসহনীয় অস্বস্তির ক্ষেত্রে: যদি থুতু বা কফ এত বেশি হয় যে নামাজ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয় এবং সাথে রুমালও না থাকে, তবে এমতাবস্থায় নামাজ ছেড়ে দিয়ে বাইরে গিয়ে পরিষ্কার হয়ে পুনরায় নতুন করে নামাজ শুরু করতে হবে।
আরও পড়ুন: নামাজ আল্লাহর কাছে গৃহীত হওয়ার জন্য ৫ বিষয় খেয়াল রাখবেন
নামাজের মধ্যে স্বাভাবিক লালা গিলে ফেললে নামাজের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে এ বিষয়ে ফকিহগণ কিছু সূক্ষ্ম নির্দেশনা দিয়েছেন-
১. স্বাভাবিক থুতু গিলে ফেলা জায়েজ।
২. নামাজের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মুখে থুতু জমা করা এবং পরে তা একবারে গিলে ফেলা ‘মাকরুহে তানজিহি’ বা অপছন্দনীয়। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১১০)
৩. থুতুর সাথে দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা কোনো খাবারের কণা (ছোলা পরিমাণ বা তার বড়) গিলে ফেললে নামাজ ভেঙে যাবে। (মারাকিল ফালাহ: ১২১)
৪. দাঁত বা মাড়ি থেকে রক্ত বের হলে এবং সেই রক্ত থুতুর সমান বা বেশি হলে তা গিলে ফেললে নামাজ ও অজু উভয়ই ভেঙে যাবে। (ফতোয়ায়ে শামি: ১/১৪৬)
মোটকথা, নামাজে মুখে থুতু আসা একটি স্বাভাবিক শরীরবৃত্তীয় বিষয়, তবে এর সমাধান হতে হবে শরিয়তের আদব রক্ষা করে। সামনের কিবলা এবং ডান দিকের ফেরেশতাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে বাম দিকে বা টিস্যু/কাপড়ে থুতু মুছে নেওয়াই সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি। তবে যদি অস্বস্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং থুতু ফেলার জন্য নির্দিষ্ট স্থান ছেড়ে বেশি দূরে যেতে হয়, তবে সেখানে গিয়ে মুখ পরিষ্কার করে পুনরায় নামাজ শুরু করতে হবে। কারণ নামাজের স্থান ত্যাগ করা এবং অতিরিক্ত নড়াচড়ার কারণে আগের নামাজটি ভেঙে যায়। ইসলামের পরিচ্ছন্নতাবোধ ও ইবাদতের গাম্ভীর্য রক্ষা করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।
সূত্র: বুখারি: ৪০৫, ৪১৫, ৪১৬; আবু দাউদ: ৪৭৮; ফতোয়ায়ে শামি: ১/৬২৪, ১৪৬, ৪৪৭; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ১/১১০; মারাকিল ফালাহ: ১২১