ধর্ম ডেস্ক
০৮ মার্চ ২০২৬, ০৯:৫১ পিএম
মানুষের জীবন কখনো এক রেখায় চলে না। সুখ-দুঃখ, জয়-পরাজয়, সমৃদ্ধি ও সংকট এই চড়াই-উতরাই নিয়েই আমাদের পথচলা। জীবনের কঠিন সময়ে মানুষ যখন দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং সব আশা হারিয়ে ফেলে, ঠিক তখনই পবিত্র কোরআন আমাদের হৃদয়ে এক প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়। মহান আল্লাহ সরাসরি ঘোষণা করেছেন যে, মানুষের এই দুঃখ বা কষ্ট চিরস্থায়ী নয়; বরং আঁধার রাতের শেষেই লুকিয়ে আছে ভোরের নতুন সূর্য।
অনেক সময় বিপদে পড়লে আমরা একে আল্লাহর আজাব মনে করে ভেঙে পড়ি। কিন্তু কোরআন আমাদের ভিন্ন কথা বলছে। সুরা বাকারার ১৫৫-১৫৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন- ‘আমি তোমাদের অবশ্যই পরীক্ষা করব—কিছু ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদের। যারা তাদের ওপর বিপদ এলে বলে, ‘আমরা তো আল্লাহরই, আর আমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তনকারী’।’
অর্থাৎ, বিপদ আসার আগেই আল্লাহ পরীক্ষার কথা জানিয়ে আমাদের প্রস্তুত করেছেন। এই দুনিয়া মূলত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করারই স্থান। তাই এখানে ব্যর্থতা বা অভাবকে ‘অপ্রত্যাশিত’ কিছু মনে না করাই হলো ঈমানের দাবি।
আরও পড়ুন: আল্লাহর অনুগত বান্দার মর্যাদা পেতে প্রতিদিন কতটুকু কোরআন পড়বেন?
সুরা ইনশিরাহ-এর ৫ ও ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ এক অনন্য ধ্রুব সত্য প্রকাশ করেছেন- ‘নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই স্বস্তি রয়েছে।’
আয়াতের মূল আরবি শব্দ ‘মা’আল’ নির্দেশ করে যে, কষ্ট আসার সাথেসাথেই আল্লাহ স্বস্তি ও মুক্তির পথও নির্ধারণ করে রেখেছেন। অন্ধকার যেমন ভোরের আগমনী বার্তা দেয়, ঠিক তেমনি প্রতিটি গভীর সংকট মুমিনের জীবনে নতুন কোনো নেয়ামত বা উচ্চতর মর্যাদার পথ খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
বিপদ আসা মানেই যে আল্লাহ বিমুখ হয়েছেন তা নয়; বরং আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদেরই বেশি পরীক্ষা করেন। আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘বিপদ যত তীব্র হবে, প্রতিদানও তদনুরূপ বিরাট হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতিকে ভালোবাসলে তাদের পরীক্ষা করেন। যারা তাতে সন্তুষ্ট থাকে, তাদের জন্য আছে আল্লাহর সন্তুষ্টি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪০৩১)
আরও পড়ুন: বেশি গুনাহে হতাশ? কোরআনের এই আয়াতগুলো পড়ুন
যারা মুমিন, তাঁদের আসলে হারানোর কিছু নেই। শত্রু বা পরিস্থিতি তাঁদের আঘাত দিয়ে দুর্বল করতে চাইলেও মহান আল্লাহ ওই কষ্টের বিনিময়ে তাঁদের মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যেকোনো মুসলমানের গায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হয় কিংবা তার চেয়েও ছোট কোনো আঘাত লাগে, তার বিনিময়ে আল্লাহ তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং একটি গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ মুসলিম: ৬৪৫৫)
বিপদের বিনিময়ে আখেরাতে যে পুরস্কার রাখা হয়েছে, তা কল্পনা করলে দুনিয়ার দুঃখ তুচ্ছ মনে হবে। জাবির (রা.)-এর বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কেয়ামত দিবসে বিপদে পতিত মানুষদের যখন প্রতিদান দেওয়া হবে, তখন পৃথিবীর বিপদমুক্ত মানুষরা আক্ষেপ করে বলবে- হায়! দুনিয়াতে যদি কাঁচি দিয়ে আমাদের শরীরের চামড়া কেটে টুকরো করা হতো!’ (সুনানে তিরমিজি: ২৪০২)
আপনি যদি আজ কোনো প্রতিকূল সময় পার করেন, তবে মনে রাখবেন—এটিই আপনার জীবনের শেষ স্টেশন নয়। কোরআনের অমোঘ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, আপনার বর্তমান কষ্টের পিঠেই সওয়ার হয়ে আসছে স্বস্তির দিন। ধৈর্য, বিশ্বাস এবং আল্লাহর রহমতের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখলে সেই সুখের দিন আপনার দরজায় কড়া নাড়বেই ইনশাআল্লাহ। প্রতিটি কষ্ট মুমিনের জন্য সফলতার নতুন দ্বার খুলে দেয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিপদে ধৈর্য ধারণ করার এবং তাঁর রহমতের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।