ধর্ম ডেস্ক
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম
একটি অসত্য বার্তা আজ মুহূর্তেই লাখো মানুষের মনে ভয়, ঘৃণা বা বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দিতে পারে, যার পরিণতি কখনো কখনো রক্তপাত কিংবা ভয়াবহ সামাজিক বিশৃঙ্খলা পর্যন্ত গড়ায়। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে তথ্যপ্রবাহ যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি গুজব ও মিথ্যার সয়লাব প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। স্বার্থ হাসিলের নেশায় একদল মানুষ সমাজে ভুল ও আংশিক সত্য সংবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। গুজবের এই ভয়াবহতা থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে কঠোর আইনের পাশাপাশি ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা একান্ত প্রয়োজন।
গুজবের আরবি প্রতিশব্দ হলো ‘ইশায়াতুন’, যার অর্থ রটনা বা ভিত্তিহীন তথ্য ছড়ানো। শরিয়তের পরিভাষায়, কোনো বিষয়ে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করাই হলো অপপ্রচার। বর্তমানে এটি প্রতিপক্ষকে দমনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কেবল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে হেয় করে না, বরং পুরো জাতির স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। সামাজিক বিজ্ঞানের ভাষায় গুজব হলো এমন এক বিবৃতি, যার সত্যতা নিশ্চিত করা কঠিন।
আরও পড়ুন: হিংসা: আমল ধ্বংসকারী এক নীরব ঘাতক
ইসলাম প্রতিটি সংবাদ প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখবে, পাছে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধন করো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হও।’ (সুরা হুজরাত: ৬) এই আয়াতটি তথ্য যাচাইয়ের একটি কালজয়ী মূলনীতি। এছাড়া সুরা বনি ইসরাঈলে ‘যে বিষয়ে জ্ঞান নেই তার পেছনে না ছুটতে’ বলা হয়েছে; কারণ কেয়ামতের দিন চোখ, কান ও অন্তরের প্রতিটি কাজ সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। (আয়াত: ৩৬)
অপপ্রচার মূলত মিথ্যারই একটি শাখা। রাসুলুল্লাহ (স.) কোনো কথা শোনামাত্রই তা প্রচার করার প্রবণতাকে মিথ্যাচারের শামিল বলে ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই না করে) তাই বলে বেড়ায়।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯২) ইসলামের শিক্ষা হলো- প্রয়োজন ব্যতীত কথা না বলা। মহানবী (স.) বলেছেন, ‘যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়।’ (তিরমিজি: ২৫০১) হাদিসবিশারদদের মতে, যাচাই ছাড়া কথা বলার অভ্যাস মানুষকে অবধারিতভাবে মিথ্যায় লিপ্ত করে।
আরও পড়ুন: গিবতের কাফফারা কী
সমাজে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাকে পবিত্র কোরআনে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা নিসার ৮৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কিছু মানুষ নিরাপত্তা বা ভয়ের সংবাদ পাওয়ামাত্রই তা প্রচার করে বেড়ায়, যা শয়তানের অনুসরণের শামিল। ইসলামি নির্দেশনা হলো- এমন স্পর্শকাতর সংবাদ পাওয়ামাত্রই তা সাধারণের মাঝে না ছড়িয়ে রাসুল (স.) বা দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দৃষ্টিগোচর করা, যাতে তারা প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান করতে পারেন। এতে করে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে সমাজ রক্ষা পায়।
অপপ্রচার কেবল ব্যক্তিগত মানহানি নয়, এটি একটি বড় সামাজিক অপরাধ। মিথ্যা সংবাদ মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে কারো দোষ প্রচার করা ‘গিবত’ বা পরনিন্দার অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার মতো জঘন্য কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি অপবাদ আরোপ করে, সে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা নিসা: ১১২)
আরও পড়ুন: অন্যের দোষ গোপন করার পুরস্কার
১. তৎক্ষণাৎ বিশ্বাস না করা: যেকোনো স্পর্শকাতর তথ্য শোনামাত্রই তা ধ্রুব সত্য বলে গ্রহণ না করা।
২. উৎস নিশ্চিত হওয়া: সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো কিছু শেয়ার করার আগে নির্ভরযোগ্য সংবাদ মাধ্যম বা মূল সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া।
৩. দায়িত্বশীলদের জানানো: সমাজে কোনো আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে তা নিজে প্রচার না করে দ্রুত যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবগত করা।
৪. সচেতনতা তৈরি: পরিবার ও পরিচিত মহলে গুজবের ধর্মীয় ও সামাজিক কুফল নিয়ে আলোচনা করা।
সোশ্যাল মিডিয়া নির্ভর এই সময়ে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা কেবল নাগরিক দায়িত্বই নয়, বরং একটি বড় ইবাদত। গুজব বা অপপ্রচারের অংশীদার না হয়ে সত্যের পথে অটল থাকাই ঈমানের দাবি। ব্যক্তিগত সচেতনতা এবং সত্য যাচাইয়ের এই চর্চাই পারে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখতে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে মিথ্যা ও অপপ্রচারের ফিতনা থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।