images

ইসলাম

বিধবা ও এতিমের দায়িত্ব নেওয়া কি জিহাদের সমান? যা বলছে সহিহ বুখারি

ধর্ম ডেস্ক

১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম

সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত ও প্রান্তিক দুটি শ্রেণি হলো বিধবা নারী ও অসহায় এতিম শিশু। পরিবার হারানোর বেদনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক উপেক্ষা অনেক সময় তাদের জীবনকে বিষাদময় করে তোলে। ইসলাম এই অসহায় মানুষদের কষ্টকে শুধু মানবিক সহানুভূতির বিষয় হিসেবে দেখেনি; বরং তাদের দায়িত্ব গ্রহণকে ঈমানের পরিপূর্ণতা ও সর্বোচ্চ ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করেছে।

যে সেবায় জিহাদের মর্যাদা

সাধারণত ইবাদত বলতে আমরা নামাজ, রোজা বা হজের মতো বিষয়গুলোকেই বড় করে দেখি। কিন্তু সহিহ বুখারির একটি হাদিস ইবাদত সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে আমূল বদলে দেয়। যেখানে সমাজের অবহেলিত মানুষের সেবাকে সরাসরি জিহাদের সমতুল্য ঘোষণা করা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকিনের খাদ্য ও প্রয়োজন পূরণে চেষ্টা করে, সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো; অথবা সে ওই ব্যক্তির মতো, যে দিনে রোজা রাখে এবং রাতে নামাজে দণ্ডায়মান থাকে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৩৫৩, ৬০০৬)

এই ঘোষণার মাধ্যমে নবী কারিম (স.) স্পষ্ট করেছেন- সমাজের দুর্বল মানুষদের দায়িত্ব নেওয়া নিছক দয়ার কাজ নয়; বরং তা জিহাদ ও অবিরাম ইবাদতের সমতুল্য এক মহান আমল।

আরও পড়ুন: অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো মহান ইবাদত

বিধবা নারীর মর্যাদা ও অধিকার

ইসলাম বিধবা নারীদের জন্য সম্মানজনক জীবনযাপনের পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়েছে। মহানবী (স.) নিজেই একাধিক বিধবা নারীকে বিয়ে করে সমাজে তাদের প্রতি অবহেলার সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (স.) কোনো বিধবা বা অভাবীর সঙ্গে পথ চললে তাদের প্রয়োজন পূরণ না করা পর্যন্ত সঙ্গ ছাড়তেন না। (সুনানে নাসায়ি: ১৪২৫)

ইসলাম বিধবা নারীদের ইদ্দত শেষে পুনরায় বিয়ের পূর্ণ অধিকার দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘কোনো মাকে তার সন্তানের জন্য এবং কোনো পিতাকে তার সন্তানের জন্য কষ্ট দেওয়া যাবে না।’ (সুরা বাকারা: ২৩৩)

অর্থাৎ, সন্তান লালন-পালনের দোহাই দিয়ে বিধবা নারীকে তার স্বাভাবিক জীবন ও ভবিষ্যৎ থেকে বঞ্চিত করা ইসলামসম্মত নয়। তবে কোনো নারী যদি কেবল এতিম সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পুনরায় বিয়ে না করে কষ্ট সয়ে জীবন কাটান, তার জন্য রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। নবীজি (স.) বলেছেন, জান্নাতে এমন নারী তাঁর অতি নিকটবর্তী হবেন। (আবু দাউদ: ৫২৪৯)

আরও পড়ুন: অসহায় মানুষ দেখে কষ্ট হয়? আপনার জন্য কোরআন-হাদিসের ঘোষণা

এতিমের দায়িত্ব: জান্নাতের সহজ পথ

জান্নাত লাভের অন্যতম সহজ মাধ্যম হিসেবে ইসলাম এতিমের লালন-পালনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে জান্নাতিদের গুণ বর্ণনা করে বলা হয়েছে- ‘তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অভাবী, এতিম ও বন্দিকে আহার করায়।’ (সুরা দাহর: ৮–৯)

রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেছেন- ‘মুসলিমদের মধ্যে সর্বোত্তম ঘর সেই ঘর, যেখানে একজন এতিম থাকে এবং তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা হয়।’ (ইবনে মাজাহ: ৩৬৭৯) অন্য হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি কোনো এতিমকে নিজের খাবারে অংশীদার করে তাকে পরিতৃপ্ত করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবধারিত করে দেন। (মুসনাদে আহমদ: ১৮২৫২)

অসহায়দের অসিলায় বরকত ও রিজিক

বাহ্যিকভাবে দুর্বল মনে হলেও এতিম ও বিধবাদের মতো দুর্বলদের ওসিলাতেই সমাজে আল্লাহর রহমত ও বরকত নেমে আসে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের দুর্বলদের কারণেই (আল্লাহর পক্ষ থেকে) সাহায্য ও রিজিকপ্রাপ্ত হও।’ (আবু দাউদ: ২৫৯৪)। এমনকি হৃদয়ের কঠোরতা দূর করার মহৌষধ হিসেবেও নবীজি (স.) এতিমের মাথায় হাত বুলানো এবং দরিদ্রকে আহার করানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

আরও পড়ুন: কোরআনে প্রশস্ত অন্তরের মানুষের প্রশংসা

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়- প্রকৃত ইবাদত শুধু জায়নামাজে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ক্ষুধার্তের মুখে খাবার তুলে দেওয়া এবং অসহায়কে নিরাপত্তা দেওয়ার মধ্য দিয়েই ঈমানের বাস্তব রূপ প্রকাশ পায়। যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বিধবা ও এতিমদের উপেক্ষা করে শুধু নিজের আরাম-আয়েশে মগ্ন থাকে, রাসুলুল্লাহ (স.) তাদের পূর্ণাঙ্গ মুমিন হিসেবে স্বীকৃতি দেননি।

তাই ব্যক্তি ও সমাজ—সবারই নৈতিক দায়িত্ব হলো এই প্রান্তিক মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো। কারণ তাদের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জিহাদ ও সারারাত ইবাদতের ন্যায় মহান সওয়াব।