ধর্ম ডেস্ক
০২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:০০ পিএম
মানুষের জীবন স্বল্পকালীন এবং নানা প্রতিকূলতায় ভরা। প্রিয়নবী (স.) উম্মতকে বারবার সতর্ক করেছেন যে, কিছু বিশেষ দুরবস্থা নেক আমল করার সুযোগ কেড়ে নেয়। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (স.) সাতটি প্রতিকূল অবস্থার কথা উল্লেখ করে সময় থাকতে আমলের তাগিদ দিয়েছেন। নেক আমলের এই স্বর্ণালি সময় কাজে লাগানো প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য।
রাসুলুল্লাহ (স.) ইরশাদ করেন- ‘সাতটি বিষয়ের আগে তোমরা দ্রুত নেক আমল করো:
১. এমন দারিদ্র্য যা তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে ভুলিয়ে দেবে
২. এমন ঐশ্বর্য যা তোমাদেরকে অহংকারী বানিয়ে দেবে
৩. এমন রোগ যা তোমাদেরকে জরাজীর্ণ করে দেবে
৪. এমন বার্ধক্য যা তোমাদেরকে দুর্বল করে দেবে
৫. এমন মৃত্যু যা হঠাৎ এসে পড়বে
৬. দাজ্জালের ফেতনা যা সবচেয়ে নিকৃষ্ট
৭. কেয়ামত যা সর্বাধিক ভয়াবহ ও তিক্ত।’
(জামে তিরমিজি: ২৩০৬; মুসতাদরাক হাকেম: ৭৯০৬)
আরও পড়ুন: আল্লাহর বিশেষ দয়া পেতে এই ১০ আমল আজই শুরু করুন!
১. দারিদ্র্য: আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখকারী
দারিদ্র্য শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি এমন এক অবস্থা যেখানে মানুষ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা ও ইবাদত ভুলে যায়। দারিদ্র্যের সময় মানুষ শুধু অর্থের জন্যই ব্যতিব্যস্ত থাকে না, বরং হৃদয় থেকে আল্লাহর ভয় ও স্মরণ দূর হয়ে যায়। নবীজি (স.) দারিদ্র্য থেকে আশ্রয় চেয়েছেন, ‘হে আল্লাহ, আমি কুফর, দারিদ্র্য ও কবরের আজাব থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই।’ (আবু দাউদ: ১৫৪৪)
২. ঐশ্বর্য: অহংকারের কারণ
সম্পদ আল্লাহর নেয়ামত, কিন্তু তা যখন অহংকার সৃষ্টি করে, তখন তা অভিশাপে পরিণত হয়। অহংকারী কারুনকে আল্লাহ তাআলা তার সুরম্য প্রাসাদ, বিরাট অট্টালিকা বিলীন করে দিয়েছিলেন ভূগর্ভে। কোরআনের ভাষায়- ‘পরিণামে আমি তাকে ও তার অট্টালিকা ভূগর্ভে ধসিয়ে দিলাম। অতঃপর সে এমন একটি দলও পেল না, যারা আল্লাহর বিপরীতে তার কোনো সাহায্য করতে পারে এবং নিজেও পারল না আত্মরক্ষা করতে।’ (সুরা কাসাস: ৮১)
৩. রোগ: ইবাদতের শক্তি হরণকারী
রোগ-শোক মানুষের ইবাদতের সামর্থ্য ও মনোযোগ কেড়ে নেয়। রোগ যখন তীব্র হয়, তখন নামাজ, রোজা, কোরআন তেলাওয়াত—সবকিছুই বাধাগ্রস্ত হয়।
আরও পড়ুন: রোগী দেখাসহ ৪ আমলের প্রতিদান জান্নাত
৪. বার্ধক্য: শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা
বৃদ্ধ বয়সে শারীরিক শক্তি কমে যায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়, নিয়মিত ইবাদত চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। রাসুল (স.) অতিরিক্ত বার্ধক্য থেকে আশ্রয় চাইতেন- ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় চাই অলসতা, অতিরিক্ত বার্ধক্য, গুনাহ আর ঝণ থেকে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯২৮)
৫. আকস্মিক মৃত্যু: তাওবার সুযোগহীনতা
মৃত্যু যেহেতু কোনো সময় জানা নেই, তাই প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মৃত্যু যেদিন আসবে, সেদিন কোনো প্রাণেরই অবকাশ দেওয়া হবে না।’ (সুরা মুমিনুন: ৯৯)। আকস্মিক মৃত্যু তাওবা, ইস্তেগফার ও ভালো কাজ করার সব সুযোগ বন্ধ করে দেয়।
৬. দাজ্জালের ফেতনা: ঈমানের চরম পরীক্ষা
দাজ্জালের ফেতনা হবে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ও সর্বনিকৃষ্ট ফেতনা। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘আদম সৃষ্টির দিন থেকে কেয়ামত পর্যন্ত দাজ্জালের চেয়ে বড় কোনো ফেতনা নেই।’ (সহিহ মুসলিম)। সে সময় ঈমান ধরে রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুন: দাজ্জালের ফিতনা থেকে বাঁচার দোয়া
৭. কেয়ামত: চূড়ান্ত সমাপ্তি
কিয়ামতের দিন সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন শুধু আমলনামাই কথা বলবে।
আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নেক আমলে দ্রুতগামী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন- ‘তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে দৌড়াও, যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিনের সমান।’ (সুরা আলে ইমরান: ১৩৩) ‘তোমরা কল্যাণকর কাজে প্রতিযোগিতা করো।’ (সুরা বাকারা: ১৪৮)
এই আয়াতগুলো নেক আমলে গতি ও প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরির শিক্ষা দেয়।
আজকের আমল আজই: রাসুল (স.) বলেছেন, ‘আদম সন্তানের যদি দুই উপত্যকাভর্তি সম্পদ থাকে, তবুও সে তৃতীয়টি চাইবে। আদম সন্তানের পেট মাটি ছাড়া আর কিছু দিয়ে পূর্ণ হয় না।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪৩৬) এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয়—দুনিয়ার লোভে পড়ে আখেরাতের প্রস্তুতি বিলম্বিত করা যাবে না।
আরও পড়ুন: তিন বদভ্যাস থেকে পানাহ চাওয়া নবীজির শিক্ষা
রাসুল (স.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় সাত শ্রেণির মানুষ স্থান পাবে... তাদের একজন হলো সেই যুবক যে তার যৌবন আল্লাহর ইবাদতে কাটিয়েছে।’ (সহিহ বুখারি: ৬৬০) তাই যৌবনই হলো নেক আমলের শ্রেষ্ঠ সময়।
রাসুল (স.) সতর্ক করেছেন, ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত: সুস্থতা ও অবসর।’ (সহিহ বুখারি: ৬৪১২)। সুস্থতা ও অবসর থাকতেই আমল করতে হবে।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান। যে সাতটি দুরবস্থার কথা হাদিসে বলা হয়েছে, তার কোনো একটিও এসে পড়লে নেক আমলের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো- আজই নেক আমল শুরু করা, কালকের জন্য অপেক্ষা না করা। দুনিয়ার মোহ ও শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে আখেরাতের প্রস্তুতি বিলম্বিত করলে পরিণামে শুধু অনুতাপই অবশিষ্ট থাকবে।