ধর্ম ডেস্ক
০২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:২৬ পিএম
আমাদের সমাজে টানা বিপদ আপদ বা সামাজিক অস্থিতিশীলতাকে ‘খারাপ সময়’ বলা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি আল্লাহর ফয়সালা, প্রজ্ঞা ও তাকদিরকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সমতুল্য। এমন মনোভাব ঈমান দুর্বল করে, ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার গুণ ক্ষুণ্ণ করে এবং দায়িত্ব এড়ানোর মানসিকতা তৈরি করে।
ইসলাম-পূর্ব আরবরা ‘দাহর’কে সক্রিয় শক্তি মনে করত এবং দুর্ঘটনা বা কষ্টের দায় সময়ের ওপর চাপিয়ে দিত। ইসলামে এসবের ভিত্তি নেই। ইবনে কাসির (রহ.) উল্লেখ করেন, এটি জাহেলি যুগের কুসংস্কার। ইসলাম শেখায়- সময় আল্লাহর সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণাধীন একটি ব্যবস্থা, যা মানুষের দায়িত্ব ও যুক্তিনির্ভর জীবনদৃষ্টিকে প্রতিষ্ঠা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, আমাদের জন্য আল্লাহ যা লিখেছেন তা ছাড়া আমাদের অন্য কিছু ঘটবে না।’ (সুরা তাওবা: ৫১)
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর তোমাদের প্রতি যে মসিবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা শুরা: ৩০) এ আয়াত দেখায়- সময় বা ভাগ্য নয়, মানুষের নিজের কর্ম ও আল্লাহর প্রজ্ঞা জীবনের ঘটনা নির্ধারণ করে। তাফসিরে কুরতুবিতে এ বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: মানুষ খারাপ হয়ে গেছে, সমাজ ধ্বংস হয়ে গেছে—এমন কথা বললে নিজের যে ক্ষতি
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ বলেন- ‘আদম সন্তান সময়কে গালি দিয়ে আমাকে কষ্ট দেয়। অথচ আমিই সময়। আমার হাতেই ক্ষমতা; রাত ও দিন আমিই পরিবর্তন করি।’ (সহিহ বুখারি: ৪৮২৬)
ইমাম নববি (রহ.) ব্যাখ্যা করেন, সময় নিজে কোনো শক্তি নয়; এটি আল্লাহর হুকুমে পরিচালিত। তাই সময়কে গালি দেওয়া মানে আল্লাহর প্রতি অসম্মান।
ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, আল্লাহ দিন ও রাতের দৈর্ঘ্য পরিবর্তন করেন, শীত-গ্রীষ্মের আবর্তন ঘটান। পৃথিবীর সময় কাঠামো—দিন, রাত, মাস, নক্ষত্রপুঞ্জ—সবই তাঁর নিয়ন্ত্রণে। পরকালের সময়ও আলাদা এবং আল্লাহ চাইলে এ ব্যবস্থাও পরিবর্তন করতে পারেন। (তাফসির সুরা ইবরাহিম: ৪৮)
ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) ফাতহুল বারিতে লিখেছেন, সময়কে গালি দেওয়া হারাম। ‘আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যা’ এটিকে মহাপাপের অন্তর্ভুক্ত করেছে। কারণ সময় আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর হুকুমে পরিচালিত, তাই দোষারোপ সরাসরি স্রষ্টার প্রতি অসম্মান।
আরও পড়ুন: হাদিসে মন্দ লোক চেনার সহজ সূত্র
ইসলামের ছয়টি মৌলিক বিশ্বাসের একটি হলো তাকদিরে পূর্ণ বিশ্বাস। রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন, ‘তাকদিরের ভালো-মন্দে বিশ্বাস ঈমানের অংশ।’ (সহিহ মুসলিম)
সময়কে দোষারোপ মানে আল্লাহর প্রজ্ঞা ও জীবন ব্যবস্থার প্রতি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা। মুমিনের কর্তব্য হলো- ধৈর্য, সন্তুষ্টি ও তাওবার মাধ্যমে মনোভাব সঠিক রাখা।
‘অভিশপ্ত ২০২০’ বা ‘করোনাকালীন খারাপ সময়’ বলা মূলত আগের আরবদের ‘দাহরকে গালি’ দেওয়ার পুনরাবৃত্তি। ইসলামের নির্দেশ- বলুন, ‘এটা আল্লাহর পরীক্ষা’, ‘আমরা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট’ অথবা ‘আমাদের ভুলের জন্য আমরা তাওবা করছি।’ এ ভাষাগত পরিবর্তন বিশ্বাস ও মনোভাবের প্রতিফলন।
ইসলাম বিপদে ধৈর্য ও সুখে কৃতজ্ঞতা চর্চার আহ্বান জানায়। ‘নিশ্চয়ই আমি ধৈর্যশীলদের অগণিত প্রতিদান দেব।’ (সুরা জুমার: ১০) ‘মুমিনের সকল অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর।’ (সহিহ মুসলিম) এই সমন্বয় মুমিনের ঈমান দৃঢ় করে, মানসিক শান্তি দেয় এবং সমাজে সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ব্যক্তি গড়ে তোলে।
অতএব, সময়কে দোষারোপ করা যাবে না। ইসলাম শেখায় আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা, ধৈর্য ধারণ করা, নিজের ভুল স্বীকার করা এবং সময়কে আল্লাহর ইবাদত ও মানুষের সেবায় কাজে লাগানো। এটি সঠিক আকিদা, সুস্থ মানসিকতা এবং দায়িত্বশীল সমাজ গঠনের পথ।