ধর্ম ডেস্ক
০৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৩:৩৪ পিএম
মানবসভ্যতার গঠন, ধারাবাহিকতা ও পূর্ণতার জন্য নারী ও পুরুষ সৃষ্টি আল্লাহ তাআলার এক অনন্য বিধান। তাঁর অসীম কুদরত ও হেকমত (প্রজ্ঞা) অনুসারে মানুষকে তিনি নারী-পুরুষ দুই ভাগে বিভক্ত করেছেন। এই বিভাজন আল্লাহর অসীম জ্ঞান, পরিকল্পনা ও করুণার প্রকাশ। নারী ও পুরুষের এই পার্থক্যই তাদের পারস্পরিক পরিপূরকতা ও মানবজীবনের ভারসাম্য নিশ্চিত করে। এই প্রতিবেদনে কোরআন, হাদিস, ইসলামিক চিন্তাবিদদের ব্যাখ্যা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এই সত্য বিশ্লেষণ করা হলো।
ক. পরিপূরকতা ও প্রশান্তির সম্পর্ক: আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা রুম: ২১)
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে বলেন, এটি আল্লাহর কুদরতের এক স্পষ্ট প্রমাণ। একই সৃষ্টিগত উপাদান থেকে তিনি এমন সত্তা সৃষ্টি করেছেন, যারা একে অপরের জন্য প্রশান্তি, প্রেম ও সহানুভূতির উৎস।
খ. একই সৃষ্টিগত উপাদান থেকে উৎপত্তি: আল্লাহ তাআলা বলেন- يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا ‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি (আদম) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার সঙ্গিনী (হাওয়া) সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা নিসা: ১)
তাফসিরে জালালাইনের ব্যাখায় বলা হয়েছে, নারী ও পুরুষ মূলত একই সৃষ্টিগত উৎস থেকে এসেছে, যা তাদের মর্যাদা ও অধিকার উভয়ের সমতার প্রমাণ।
আরও পড়ুন: কোরআনের বর্ণনায় নারীর ১০ বৈশিষ্ট্য
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَهُوَ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ فَمُسْتَقَرٌّ وَمُسْتَوْدَعٌ ‘আর তিনিই তোমাদেরকে একই ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর রয়েছে দীর্ঘ ও স্বল্পকালীন বাসস্থান।’ (সুরা আনআম :৯৮)
এভাবেই নারী ও পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। একজন ছাড়া অন্যজনের অস্তিত্ব অর্থহীন।
যদি পৃথিবীতে শুধু পুরুষ বা শুধু নারী হতো, তবে মানবসভ্যতার অস্তিত্বই সংকটে পড়ত। প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে মানবজাতির ধারাবাহিকতা বিলুপ্ত হতো। পারিবারিক কাঠামো, স্নেহ-মমতা ও সামাজিক ভারসাম্য সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যেত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- وَمِن كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ‘আমি সবকিছুকেই জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।’ (সুরা জারিয়াত: ৪৯)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেন- إِنَّمَا النِّسَاءُ شَقَائِقُ الرِّجَالِ ‘নারীরা হলো পুরুষদের সহোদর অংশ বা অর্ধাঙ্গ।’ (সুনান আবু দাউদ: ২৩৬)
এই হাদিসে স্পষ্ট করা হয়েছে যে নারী ও পুরুষ উভয়ই মানবতার অপরিহার্য অঙ্গ; একজন অন্যজনের পরিপূরক।
আরও পড়ুন: 'নারী স্বামীর পাঁজরের হাড় দিয়ে তৈরি' হাদিসের মর্মার্থ
আল্লাহ তাআলা বলেন- وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنثَىٰ ‘পুরুষ নারীসম নয়।’ (সুরা আলে ইমরান: ৩৬)
এই পার্থক্য কোনো বৈষম্য নয়; বরং এটি দায়িত্ব, স্বভাব ও সৃষ্টিগত বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা। ইসলাম নারী ও পুরুষ উভয়ের মর্যাদা নিশ্চিত করেছে তাদের নিজ নিজ স্বকীয় ভূমিকার মাধ্যমে।
রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন- ‘নারী জাতিকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে উপরের হাড়টি বেশি বাঁকা। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তাহলে তা ভেঙ্গে যাবে আর যদি ছেড়ে দাও, তাহলে সব সময় তা বাঁকাই থাকবে। কাজেই নারীদেরকে উত্তম নসিহত করতে থাক।’ (সহিহ বুখারি: ৩৩৩১)
এই হাদিস নারী-পুরুষের স্বভাবগত পার্থক্য স্বীকার করে পারস্পরিক সহনশীলতা ও সৌজন্যের নির্দেশ দেয়।
অন্যত্র নবী (স.) বলেন- ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি: ৩৮৯৫)
অতএব, ইসলাম পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে পারস্পরিক ভালো আচরণকেই সম্পর্কের মূলনীতি হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
আরও পড়ুন: নারীদের প্রতি নবীজির সম্মান: আজও প্রেরণার আলো
আল্লাহ তাআলা বলেন- هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ ‘তারা তোমাদের পোশাক, আর তোমরাও তাদের পোশাক।’ (সুরা বাকারা: ১৮৭)
‘পোশাক’ শব্দটি এখানে প্রতীকীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে- যা আচ্ছাদন, রক্ষা, শোভা ও পারস্পরিক নির্ভরতার প্রতীক। নারী-পুরুষের এই সম্পর্কই মানবসমাজে নৈতিক ভারসাম্য ও স্থিতি নিশ্চিত করে।
গাজ্জালি (রহ.) তাঁর ইহইয়া উলুমুদ্দীন-এর ‘আদাব আন-নিকাহ’ অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন- ‘বিবাহ হলো এক পবিত্র চুক্তি, যেখানে উভয় পক্ষ পরস্পরের অধিকার রক্ষা করে এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলে। নারী-পুরুষের ভিন্নতা আসলে হেকমতের অংশ, যার মাধ্যমে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন ভারসাম্য পায়।’
ড. ইউসুফ আল-কারজাভি তাঁর ‘আর-রিজালু ওয়াল মারআহ’ গ্রন্থে বলেন- ‘ইসলাম নারী ও পুরুষকে সমান মর্যাদা দিয়েছে, যদিও তাদের দায়িত্ব ও বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতা রেখেছে। এই ভিন্নতা সমাজ ও পরিবারে ন্যায্যতা ও স্থিতি আনার জন্য।’
আধুনিক বিজ্ঞান নারী ও পুরুষের মধ্যে জৈবিক, হরমোনগত ও স্নায়বিক পার্থক্য নিশ্চিত করেছে, যা তাদের ভূমিকা ও দায়িত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
জীববিজ্ঞান: নারী ও পুরুষের ক্রোমোজোম (XX ও XY), প্রজনন ব্যবস্থা ও শারীরিক গঠন ভিন্ন হলেও এই ভিন্নতাই প্রজনন ও জীবনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। একলিঙ্গ সমাজে জিনগত বৈচিত্র্যের অভাব প্রজাতির বিলুপ্তি ডেকে আনত।
মনোবিজ্ঞান: গবেষণায় দেখা যায়, নারী সাধারণত আবেগনির্ভর ও সামাজিক সংযোগে দক্ষ, আর পুরুষ বিশ্লেষণধর্মী ও লক্ষ্যনিষ্ঠ। এই বৈচিত্র্য পারিবারিক জীবনে ভারসাম্য আনে।
সমাজতত্ত্ব: নারী ও পুরুষ উভয়েই সামাজিক কাঠামোর অপরিহার্য স্তম্ভ; একজন অন্যজনের অনুপস্থিতিতে মানবসমাজ স্থিতিশীল হতে পারে না।
আরও পড়ুন: নারীর পবিত্রতা ও সাজসজ্জা সংক্রান্ত মাসয়ালা
নারী ও পুরুষের সৃষ্টি, পার্থক্য ও পরিপূরকতা আল্লাহ তাআলার অসীম কুদরত ও হেকমতের জীবন্ত নিদর্শন। এ বিভাজন কোনো বৈষম্য নয়; বরং এটি পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রেম ও দয়ার ভিত্তিতে মানবজীবনের পূর্ণতা অর্জনের মাধ্যম। কোরআন, হাদিস, ইসলামিক চিন্তাবিদদের ব্যাখ্যা ও আধুনিক বিজ্ঞান- সবই একবাক্যে সাক্ষ্য দেয় যে নারী ও পুরুষের সৃষ্টিগত ভিন্নতা আসলে নিখুঁত ভারসাম্য ও আল্লাহর প্রজ্ঞার প্রতিফলন। একলিঙ্গ সমাজের ধ্বংসাত্মক পরিণতি চিন্তা করেই আমরা আল্লাহর এই হেকমতপূর্ণ ব্যবস্থার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারি।
অতএব, যে সমাজ নারী-পুরুষ উভয়ের মর্যাদা ও পরিপূরকতা রক্ষা করে, সেই সমাজই প্রকৃত ইসলামি ও মানবিক সমাজ। চিন্তাশীলদের উচিত- এই ভারসাম্যের মধ্যেই আল্লাহর মহান সৃষ্টিশক্তির প্রতিফলন অনুধাবন করা।