images

ইসলাম

সুলাইমান (আ.)-এর হেকমতপূর্ণ বিচার: ইতিহাসের দুই অমর দৃষ্টান্ত

ধর্ম ডেস্ক

২৩ অক্টোবর ২০২৫, ০২:১১ পিএম

আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী-রাসুলদের মাধ্যমে মানবজাতিকে ন্যায়ের পথে, প্রজ্ঞার আলোয় ও সত্যের দিশায় পরিচালিত করেছেন। তাদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই শিক্ষা ও চিন্তার অফুরান উৎস। নবী সোলাইমান (আ.) ছিলেন এমনই এক ব্যক্তিত্ব, যিনি নবুয়ত, রাজত্ব, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা—সবকিছুই একসাথে লাভ করেছিলেন। পিতা দাউদ (আ.)-এর রাজত্বের উত্তরাধিকারী হয়েও তিনি বহু ক্ষেত্রে নিজের অসাধারণ হেকমত বা বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশলে উৎকর্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

কোরআনে বর্ণিত বকরিপাল ও ক্ষেতমালিকের বিরোধ

পবিত্র কোরআনে সোলাইমান (আ.)-এর বিচক্ষণতার একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘স্মরণ করুন দাউদ ও সুলাইমানকে, যখন তাঁরা বিচার করছিল শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে; তাতে রাতে প্ৰবেশ করেছিল কোনো সম্প্রদায়ের মেষ; আর আমি তাদের বিচার পর্যবেক্ষণ করছিলাম। অতঃপর আমি এ বিষয়ের ফয়সালা সুলাইমানকে বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। আর আমি তাদের প্রত্যেককেই দিয়েছিলাম প্রজ্ঞা ও জ্ঞান।’ (সুরা আম্বিয়া: ৭৮-৭৯)

ঘটনাটি ছিল এরকম: এক ব্যক্তির বকরির পাল অপর এক ব্যক্তির ক্ষেত নষ্ট করে দেয়। তাফসিরে এসেছে, ছাগলপালের মূল্য ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের মূল্যের সমান ছিল। দাউদ (আ.) রায় দিলেন—যেন ক্ষেতমালিক ক্ষতিপূরণস্বরূপ বকরিগুলো পায়। বাদি ও বিবাদি উভয়ই দাউদ (আ.)-এর আদালত থেকে বের হয়ে এলে (দরজায় দাউদপুত্র) সুলাইমান (আ.)-এর সাক্ষাত হয়। তিনি মোকদ্দমার রায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা তা শুনিয়ে দেয়। তরুণ সুলাইমান (আ.) বলেন, আমি রায় দিলে তা ভিন্নরূপ হত এবং উভয়পক্ষের জন্য উপকারী হত। তারপর তিনি পিতা দাউদের কাছে উপস্থিত হয়ে তাঁকে বললেন যে, আপনি ছাগপাল ক্ষতিগ্রস্থ শস্যক্ষেত্রের মালিককে দিয়ে দেন। সে এগুলোর দুধ, পশম ইত্যাদি দ্বারা উপকার লাভ করুক এবং শস্যক্ষেত্রটি কিছুদিনের জন্য দিয়ে দিন ছাগলপালের মালিককে। সে তাতে চাষাবাদ করে শস্য উৎপন্ন করবে। যখন শস্যক্ষেত্র পূর্বের অবস্থায় পৌঁছে যাবে তখন শস্যক্ষেত্র ও ছাগপাল যার যার মালিককে হস্তান্তর করুন। দাউদ (আ.) এই রায় পছন্দ করে বললেন, বেশ এখন এই রায়ই কার্যকর হবে। অতঃপর তিনি উভয়পক্ষকে ডেকে দ্বিতীয় রায় কার্যকর করলেন। (কুরতুবি; ইবন কাসির; ফাতহুল কাদির)

এই প্রস্তাব ছিল অধিক ন্যায়সঙ্গত ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। এখানেই প্রকাশ পায় সুলাইমান (আ.)-এর হেকমত ও ন্যায়বোধ।

আরও পড়ুন: আরও পড়ুন: সুলাইমান (আ.)-এর কি জাদুর আংটি ছিল?

হাদিসে বর্ণিত দুই নারীর সন্তানের দাবি

হাদিস শরিফে সুলাইমান (আ.)-এর আরও এক অসাধারণ বিচারবুদ্ধির উদাহরণ পাওয়া যায়। ঘটনাটির বিবরণ হলো— এক শিশুকে নিজের সন্তান দাবি করে দুই মহিলার মধ্যে ঝগড়া চলছিল। দুজনেই দাবি করছিল যে, শিশুটি তার। বিচার গেল দাউদ (আ.)-এর কাছে। দাউদ (আ.) ঘটনার সবকিছু জেনে-বুঝে বয়স্ক নারীর পক্ষে রায় দিলেন। কিন্তু এই রায়ে সন্তুষ্ট না হয়ে তারা বিষয়টি সোলাইমান (আ.)-কে বললেন। সোলাইমান (আ.) যদিও জানলেন যে দাউদ (আ.) বিষয়টির নিষ্পত্তি করেছেন, তবুও তিনি তাদের কথা শুনলেন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অগ্রসর হলেন। এক সুন্দর কৌশল অবলম্বন করলেন তিনি। উপস্থিত লোকদের বললেন একটি ছুরি আনতে। অতঃপর বাচ্চাটিকে দুই টুকরো করে দু’জনকে একেক টুকরা দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তখনই কনিষ্ঠ নারী চিৎকার করে উঠল- ‘টুকরো করতে হবে না, বাচ্চাটি আমার না, উনাকে দিয়ে দিন।’ তখনই সোলাইমান (আ.) বুঝে নিলেন যে, বাচ্চাটি আসলে কনিষ্ঠ মহিলারই। কেননা একজন প্রকৃত মা কখনও চাইবেন না যে, বাচ্চা মরে যাক। সন্তানকে প্রয়োজনে দূরে ঠেলে দেবেন, তবুও মরতে দেবেন না। অতঃপর কনিষ্ঠ নারীটির পক্ষে রায় দিয়ে তার কোলে সোলাইমান (আ.) সন্তানটিকে তুলে দিলেন। (বুখারি: ৬৭৬৯) 

আরও পড়ুন: যে দোয়া পড়ে প্রতাপশালী বাদশাহ হয়েছিলেন সোলাইমান (আ.)

শিক্ষা ও মূল্যবান বার্তা

এসব ঘটনা থেকে আমরা যে অমূল্য শিক্ষা লাভ করি:

১. প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা বয়সনির্ভর নয়: আল্লাহ যাকে খুশি তাকে ন্যায়বিচারের ক্ষমতা ও প্রজ্ঞা দেন। 

২. ন্যায়বিচারের পূর্বশর্ত হলো প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি: শুধু আইনি জ্ঞান নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মানসিক অন্তর্দৃষ্টিও বিচারকের জন্য অপরিহার্য।

৩. মাতৃস্নেহের কোনো তুলনা নেই: প্রকৃত মা সন্তানের জীবন বাচাঁতে প্রয়োজনে দূরে ঠেলে দিতে পারেন—এটাই মায়ের মমতা।

৪. ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সাহস ও কৌশল প্রয়োজন: সুলাইমান (আ.) ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচলিত সিদ্ধান্তেও পরিবর্তন আনতে দ্বিধা করেননি।

৫. নবীদের জীবন মানবতার জন্য পথনির্দেশ: সুলাইমান (আ.)-এর বিচারের ঘটনা শিক্ষা দেয়- বুদ্ধি, ধৈর্য ও প্রজ্ঞাই সত্য প্রতিষ্ঠার শক্তি।

শেষ কথা, সুলাইমান (আ.)-এর জীবন মানবজাতির জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ। তাঁর প্রতিটি বিচার প্রমাণ করে যে, ন্যায়বিচার শুধু জ্ঞাননির্ভর নয়; বরং হৃদয়ের নম্রতা, প্রজ্ঞা ও আল্লাহভীতিই এর প্রকৃত ভিত্তি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকেও ন্যায়বিচারে সুবুদ্ধি, নরম হৃদয় ও সত্যের পক্ষে সাহস দান করুন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যাকে হেকমত (প্রজ্ঞা) দান করা হয়েছে, তাকে তো বিপুল কল্যাণ দান করা হয়েছে।’ (সুরা বাকারা: ২৬৯) আমরা যেন জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তে ন্যায়, হেকমত ও আল্লাহভীতির অনুসারী হতে পারি—এই প্রার্থনাই হোক আমাদের জীবনের মূলমন্ত্র। আমিন।