ধর্ম ডেস্ক
১৪ অক্টোবর ২০২৫, ০৪:৩৩ পিএম
কেয়ামতের ছোট আলামতগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘সময় সংকোচন’, যা আজ বিজ্ঞান, সমাজ ও ঈমান—তিন ক্ষেত্রেই স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। সময় যেন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে—এই অনুভূতি এখন সবার। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি কোনো সাধারণ পরিবর্তন নয়, বরং কেয়ামতের নিকটবর্তী হওয়ার একটি নিশ্চিত ইঙ্গিত।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কেয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হবে, ভূমিকম্প বৃদ্ধি পাবে, সময় সংকুচিত হবে, ফিতনা ছড়িয়ে পড়বে, হত্যাযজ্ঞ বৃদ্ধি পাবে এবং সম্পদ উপচে পড়বে।’ (সহিহ বুখারি: ১০৩৬)
আরেক বর্ণনায় এসেছে— ‘সময় দ্রুত অতিক্রম না করা পর্যন্ত কেয়ামত আসবে না; বছর হবে মাসের মতো, মাস হবে সপ্তাহের মতো, সপ্তাহ হবে দিনের মতো, আর দিন হবে ঘন্টার মতো।’ (মুসনাদে আহমাদ, তিরমিজি; সহিহুল জামে: ৭২৯৯)
আলেমগণ এই হাদিসের তিনটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন—
১. সময় থেকে বরকত উঠে যাওয়া: ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, ‘আমাদের যুগেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।’
২️. ইমাম মাহদির যুগে সুখ ও শান্তির কারণে সময় সংক্ষিপ্ত মনে হবে।
৩️. কেয়ামতের পূর্বে বাস্তব অর্থেই সময় দ্রুত অতিক্রম করবে এবং তখন নবীজির ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণরূপে প্রতিফলিত হবে।
আরও পড়ুন: কেয়ামতের যেসব আলামত পৃথিবীতে বিদ্যমান
নাসার গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর আবর্তন গতি সামান্য পরিবর্তিত হচ্ছে, ফলে দিন–রাতের দৈর্ঘ্যে পার্থক্য আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি শতাব্দীতে দিনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১.৮ মিলিসেকেন্ড হ্রাস পাচ্ছে।
ইবনে কাসির (রহ.) তাঁর তাফসিরে বলেন, ‘সময়ের সংকোচন বলতে দিন-রাত দ্রুত অতিক্রম হওয়া এবং মানুষের আয়ু হ্রাস পাওয়া বোঝায়।’ ইমাম কুরতুবি (রহ.) মন্তব্য করেন, ‘এটি কেয়ামতের ক্ষুদ্র আলামতগুলোর একটি, যা ধীরে ধীরে প্রকাশ পাবে এবং মানুষ সময়ের দ্রুত গতির অভিজ্ঞতা লাভ করবে।’
সময়ের সংকোচনের প্রভাব আজ সমাজ জীবনে স্পষ্ট। অধিকাংশ মুসলমান মনে করেন ইবাদতের জন্য যথেষ্ট সময় পান না। মানুষ প্রতিদিন বড় একটি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করেন। ব্যস্ততার কারণে অধিকাংশ মুসল্লি নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন না। এ বাস্তবতা আমাদের ঈমানি ও সামাজিক জীবনে সময় ব্যবস্থাপনার সংকটকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
আরও পড়ুন: কেয়ামতের আগে যেসব বিষয়ে মানুষের ব্যস্ততা বাড়বে
ফজরের পর পুরো দিনের পরিকল্পনা, জোহরের আগে কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন, আছরের পর আত্মসমালোচনা এবং মাগরিবের আগে আত্মজবাবদিহিতা—এই চারধাপ পদ্ধতি একজন মুমিনকে সময়ের সঠিক ব্যবহার ও আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে পরিচালিত করে।
আরও পড়ুন: 'দাসী তার মনিবকে জন্ম দেবে' হাদিসের অর্থ কী
হজরত ওমর (রা.) বলতেন, ‘সকাল হওয়ার জন্য অপেক্ষা করো না, বরং সকালের জন্য প্রস্তুতি নাও।’ হজরত আলী (রা.) বলতেন, ‘গতকাল চলে গেছে, আগামীকাল আসেনি—আজকের দিনটিই তোমার হাতে।’ সাহাবাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি সময়ের মূল্যবোধ শেখায় এবং প্রতিটি মুহূর্তকে আমলমুখী করার শিক্ষা দেয়।
আরও পড়ুন: দাজ্জালের সঙ্গে সাক্ষাতের যে ঘটনা বর্ণনা করেছেন তামিম দারি (রা.)
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের গড় আয়ু যদি ৭২ বছর হয়, এর মধ্যে ঘুমে ব্যয় হয় ২৪ বছর, কর্মজীবনে ১৫ বছর, কিন্তু ইবাদতে মাত্র ১.৫ বছর, আর বাকি ৩১.৫ বছর নানান কর্মকাণ্ডে নষ্ট হয়। এই তথ্য আমাদের শেখায়—সময়ই জীবনের মূল সম্পদ।
দৈনিক রুটিন (নামাজকেন্দ্রিক)
মনিটরিং: প্রতিদিন চেকলিস্ট, প্রতি শুক্রবার আত্মমূল্যায়ন, প্রতি মাসে বিস্তারিত পর্যালোচনা।
শেষ কথা, সময় সংকোচন কেবল বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা নয়, এটি ঈমানদারদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক সতর্কবার্তা। আমাদের করণীয় হলো সময়ের প্রকৃত মূল্য বোঝা, অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা, অনর্থক কাজ বর্জন করা ও আখিরাতমুখী জীবন গড়ে তোলা। মনে রাখবেন, সময় একবার হারিয়ে গেলে তা আর ফিরে আসে না। প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদত ও সৎকর্মে কাজে লাগিয়েই দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা সম্ভব।