Dhaka Mail Logo

ইসলাম

আত্মীয় জালেম হলে কেমন ব্যবহার করা উচিত

ধর্ম ডেস্ক

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৪:৫৭ পিএম

ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা জরুরি ইবাদত। তবে বাস্তব জীবনে এমন পরিস্থিতি আসতে পারে যখন কোনো আত্মীয় জালেম বা অন্যায়কারী হয়, তখন একদিকে সম্পর্ক রক্ষা করা জরুরি, অন্যদিকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করাও কর্তব্য। ইসলাম এ ক্ষেত্রে এক ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রজ্ঞাময় দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে, যার মূলনীতি হলো- ‘সর্বোত্তম আচরণ করা’। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব? নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন না করা

আত্মীয় জালেম হলেও সম্পর্ক ছিন্ন করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘আর যারা আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে আর যে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা বাকারা: ২৭) 
অর্থাৎ, আত্মীয়ের অন্যায় আচরণের কারণে সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন করা যাবে না।

মন্দের বিপরীতে ভালো আচরণ করা

মন্দের বিপরীতে ভালো আচরণ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো উত্কৃষ্ট দ্বারা; ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা হা-মিম-সাজদা: ৩৪)

আরও পড়ুন: অপ্রীতিকর আচরণ যেভাবে মোকাবেলা করতেন নবীজি

ন্যায়ের আদেশ ও অন্যায়ের নিষেধ করা

অন্যায়কারীর মুখ বন্ধ করে চুপ থাকাও ইসলামের শিক্ষা নয়। তবে উপদেশ দিতে হবে প্রজ্ঞা ও সুন্দর কথার মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকুক যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে ডাকে, সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। তারাই সফলকাম।’ (সুরা আলে ইমরান: ১০৪)

আরও ইরশাদ হয়েছে- ‘আপনার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন উত্তমভাবে।’ (সুরা নাহল: ১২৫)
তাই আত্মীয় জালেম হলেও, মৃদুভাবে উপদেশ দেওয়া কর্তব্য।

সুন্দর আচরণ বজায় রাখা

যদি উপদেশ কার্যকর না হয়, তবুও খারাপ ব্যবহার করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘ক্ষমা করুন, সৎকাজের নির্দেশ দিন এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আরাফ: ১৯৯)

অর্থাৎ কিছুটা এড়িয়ে চলবেন, তবুও সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

হাদিসে এ বিষয়ে শিক্ষণীয় একটি ঘটনা রয়েছে। সেটি হলো এক বৃদ্ধা মহিলা প্রতিদিন রাসূলুল্লাহ (স.)-কে কষ্ট দিতেন। একদিন তিনি অসুস্থ হলে নবীজি (স.) তার খোঁজ নিতে যান। তাঁর উত্তম আচরণ মহিলাকে মুগ্ধ করে এবং পরবর্তীতে তিনি ইসলামের প্রতি অনুরাগী হন।
এ থেকেই শিক্ষা পাওয়া যায়- অন্যায়ের জবাব অন্যায় নয়; বরং দয়া, সহমর্মিতা ও উত্তম আচরণই প্রকৃত সমাধান।

আরও পড়ুন: হাদিসে মন্দ লোক চেনার সহজ সূত্র

সীমা নির্ধারণ ও নিজেকে রক্ষা করা

ইসলাম অন্যায়কারীর সামনে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকার শিক্ষা দেয় না। নিজের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষারও নির্দেশ দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা রাদ: ১১)

এর অর্থ হলো- আত্মীয়ের জুলুম যদি ক্ষতি ডেকে আনে, তবে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যায়, যেমন—

  • দূরত্ব বজায় রাখা,
  • তাদের অন্যায় কাজে সহযোগিতা না করা,
  • প্রয়োজনে শরিয়াহসম্মত উপায়ে ন্যায়বিচার চাওয়া।

বাস্তব কর্মকৌশল

  • দোয়া করুন: আল্লাহর কাছে তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করুন।
  • সীমিত যোগাযোগ রাখুন: প্রয়োজনে কেবল মৌলিক দায়িত্বের সম্পর্ক বজায় রাখুন।
  • ধৈর্য ধরুন: সবর (ধৈর্য) হলো মুমিনের সর্বশ্রেষ্ঠ অস্ত্র।
  • ন্যায়পরায়ণ হোন: তাদের অন্যায় কখনোই আপনার অন্যায়ের অজুহাত হতে পারবে না।

অতএব, আত্মীয় জালেম হলে ইসলামের দিকনির্দেশনা হলো- সম্পর্ক ছিন্ন না করে অন্তত ন্যূনতম সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। অন্যায়কে সমর্থন না করে প্রজ্ঞাপূর্ণ উপদেশ দিয়ে তা প্রতিহত করতে হবে। খারাপ ব্যবহার করা যাবে না; উত্তম আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। অসহায় না হয়ে নিজের অধিকার ও নিরাপত্তাও রক্ষা করতে হবে। চূড়ান্ত লক্ষ্য প্রতিশোধ নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা এবং অন্যায়কারীর সংশোধন।