ধর্ম ডেস্ক
৩০ জুলাই ২০২৫, ০৬:৩৪ পিএম
প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর মধ্যে ভূমিকম্প সবচেয়ে ভয়াবহ। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে ভূমিকম্প শুধু প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা। নবীজি (স.) ভূমিকম্প সম্পর্কে যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, তা আজ বাস্তব রূপ নিচ্ছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি ভয় দেখানোর জন্যই (তাদের কাছে আজাবের) নিদর্শনগুলো পাঠাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৫৯)
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন- ‘কেয়ামত ততক্ষণ পর্যন্ত হবে না, যে পর্যন্ত না ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, অধিক পরিমাণে ভূমিকম্প হবে, সময় সংকুচিত হয়ে আসবে, ফিতনা প্রকাশ পাবে, খুনখারাবি বৃদ্ধি পাবে এবং তোমাদের ধন-সম্পদ এত বৃদ্ধি পাবে যে তা উপচে পড়বে।’ (বুখারি: ১০৩৬)
ইসলামের দৃষ্টিতে ভূমিকম্প শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি আল্লাহর নাফরমানিরও ফল। নিম্নে কয়েকটি প্রধান গুনাহ উল্লেখ করা হলো, যা ভূমিকম্পের কারণ হিসেবে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
১. বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকার প্রচলন
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘যখন আমার উম্মতের মধ্যে গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের প্রকাশ ঘটবে এবং মদপানের সয়লাব হবে, তখন আল্লাহ তাদের উপর ভূমিকম্প প্রেরণ করবেন।’ (তিরমিজি: ২২১২; আলবানি সহিহাহ: ২২০৩)
আরও পড়ুন: শেষ জামানায় চেহারা বিকৃতি নিয়ে হাদিসে যা আছে
২. মাদক সেবন
নবীজি (স.) বলেছেন, ‘যখন কোনো জাতি প্রকাশ্যে মদপান শুরু করবে, আল্লাহ তাদের উপর ভূমিকম্প প্রেরণ করবেন।’ (ইবনে মাজাহ: ৪০৪০; বায়হাকি, শুআবুল ঈমান: ৫৪৬৭)
৩. আমানতের খেয়ানত
নবীজি (স.) বলেছেন, ‘যখন আমানত নষ্ট হয়ে যাবে তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করবে। বলা হলো- হে আল্লাহর রাসুল! আমানত কিভাবে নষ্ট হয়ে যাবে? তিনি বললেন, যখন কোনো অযোগ্য ব্যক্তির উপর দায়িত্ব ন্যস্ত করা হবে, তখনই কেয়ামতের অপেক্ষা করবে। (বুখারি: ৬৪৯৬)
৪. পিতামাতার অবাধ্যতা
নবীজি (স.) বলেছেন, ‘যখন সন্তানেরা পিতামাতার অবাধ্য হবে, তখন আল্লাহ তাদের উপর ভূমিকম্প প্রেরণ করবেন।’ (মুসনাদে আহমদ: ৭০৪৪; আলবানি সহিহাহ: ২৮৭৫)
৫. অন্যায়ভাবে সম্পদ ভোগ
রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যখন সম্পদকে শুধু ধনীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হবে, আমানতকে মাল মনে করা হবে এবং জাকাতকে জরিমানা হিসেবে দেখা হবে, তখন ভূমিকম্প আসবে।’ (তিরমিজি: ১৪৪৭)
এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, ভূমিকম্প শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা। আমাদের উচিত এসব গুনাহ থেকে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
আরও পড়ুন: মানুষের হক খাওয়ার ৫ ভয়াবহ শাস্তি
আল্লাহ তায়ালা বলেছেন— ‘হে মানব সকল, তোমরা ভয় করো তোমাদের রবকে। নিশ্চয়ই কেয়ামত দিবসের ভূকম্পন হবে এক মারাত্মক ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, স্তন্যপায়ী মা তার দুগ্ধপোষ্য সন্তানের কথা ভুলে যাবে আর সব গর্ভবতীর গর্ভপাত হয়ে যাবে। দৃশ্যত মানুষকে মাতালের মতো দেখাবে, আসলে তারা নেশাগ্রস্ত নয়। বস্তুত আল্লাহর শাস্তি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।’ (সুরা হজ: ১-২)
আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘পৃথিবী যখন প্রবল কম্পনে প্রকম্পিত হবে, আর জমিন তার বোঝা বের করে দেবে।’ (সুরা জিলজাল: ১-২) সেদিনের ভয়াবহতা সম্পর্কে সুরা হজে বর্ণিত হয়েছে- ‘স্তন্যদানকারী মা তার শিশুকে ভুলে যাবে, গর্ভবতী নারীর গর্ভপাত হবে।’ (সুরা হজ: ২)
কেয়ামতের আগে আজাব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলার ঘোষণা—‘জনপদের অধিবাসীরা কি এতই নির্ভয় হয়ে গেছে যে আমার আজাব (নিঝুম) রাতে তাদের কাছে আসবে না, যখন তারা (গভীর) ঘুমে (বিভোর হয়ে) থাকবে!’ (সুরা আরাফ: ৯৭)
১. তওবা ও ইস্তেগফার
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা সকলেই আল্লাহর নিকট তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা নূর: ৩১)
নিয়মিত ইস্তেগফার করা উচিত, বিশেষ করে সকাল-সন্ধ্যায়। রাসুলুল্লাহ (স.) দিনে অন্তত ১০০ বার ইস্তেগফার করতেন (বুখারি: ৬৩০৭)
আরও পড়ুন: সবসময় ইস্তেগফার করলে ১৫ নেয়ামত লাভ হয়
২. গুনাহ ত্যাগ
বাদ্যযন্ত্র, মাদক ও অশ্লীলতা পরিহার করুন
হারাম উপার্জন বর্জন করুন
পর্দার বিধান মেনে চলুন
রাসুল (স.) বলেছেন, ‘যখন আমার উম্মত প্রকাশ্যে গুনাহ করবে, তখন আল্লাহ তাদের উপর ভূমিকম্প প্রেরণ করবেন।’ (তাবরানি, মাজমাউজ জাওয়ায়েদ: ৩/২৯৮)
৩. সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানুষের কল্যাণের জন্য প্রতিষ্ঠিত। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করো।’ (সুরা আলে ইমরান: ১১০)
পরিবার ও সমাজে সৎকাজের প্রচলন করতে হবে।
৪. নামাজ ও ধৈর্য
রাসুল (স.) এবং সাহাবিরা কোনো বিপদ এলে নামাজে দাঁড়াতেন এবং ধৈর্য ধারণ করতেন (মেশকাত: ৫৩৪৫)
ফরজ নামাজের পাশাপাশি নফল নামাজ বাড়ানো উচিত, বিশেষ তাহাজ্জুদ নামাজ।
৫. দান-সদকা
দান-সদকা আল্লাহর গজবকে প্রতিহত করে। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘সদকা আল্লাহর ক্রোধকে নিভিয়ে দেয় এবং অপমৃত্যু রোধ করে।’ (তিরমিজি: ৬৬৪)
নিয়মিত দান করুন, বিশেষ করে গোপনে দান করার চেষ্টা করুন।
আরও পড়ুন: দান-সদকার যেসব প্রতিদান আল্লাহ দুনিয়াতেই দিয়ে দেন
৬. দোয়া
এই দোয়াটি বেশি পড়ুন- ‘লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন’ (হে আল্লাহ! তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, আমি অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছি)। এই দোয়া (দোয়া ইউনুস) বিপদে পড়লে পড়তে হবে।
৭. কোরআন তেলাওয়াত
ঘরে নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করুন। রাসুল (স.) বলেছেন- ‘যে ঘরে কোরআন তেলাওয়াত করা হয়, সে ঘরে কল্যাণ বৃদ্ধি পায়।’ (মুসলিম: ১৩০৮)
৮. পরিবারের হেফাজত
পরিবারের সদস্যদের হেফাজত করুন এবং তাদের নিয়ে নিয়মিত ইবাদত করুন। রাসুল (স.) বলেছেন, ‘তোমরা সবাই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বুখারি: ২৫৫৮)
৯. আল্লাহর ভয় অন্তরে ধারণ
‘যদি জনপদের মানুষগুলো ঈমান আনত এবং (আল্লাহকে) ভয় করতো, তাহলে আমি তাদের ওপর আসমান-জমিনের যাবতীয় বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম। (সুরা আরাফ: ৯৬)
ভূমিকম্প আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সতর্কবার্তা। আমাদের উচিত গুনাহ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। নবীজি (স.)-এর শিক্ষা মেনে চললে আল্লাহ আমাদের রক্ষা করবেন। হে আল্লাহ! আমাদেরকে ভূমিকম্পসহ সব ধরনের দুর্যোগ থেকে হিফাজত করুন। আমিন।