ধর্ম ডেস্ক
২০ অক্টোবর ২০২৪, ০১:৪৫ পিএম
মৃতব্যক্তির জন্য জীবিতদের অনেক করণীয় রয়েছে। এর একটি হলো সওয়াব পাঠানো। যাকে আরবিতে ঈসালে সওয়াব বলা হয়। এই ঈসালে সওয়াব বিভিন্ন আমলের মাধ্যমে করা যায়। যেমন- নফল নামাজ-রোজা, কবর জিয়ারত, ওমরা, কোরবানি ইত্যাদি আমল মৃতব্যক্তির ঈসালে সওয়াবের নিয়তে করা যায় এবং এতে মৃতব্যক্তি সওয়াব লাভ করে থাকেন। এছাড়া মৃতব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করা, অপূরণকৃত ওয়াদা ও মান্নত আদায় করা ওয়ারিশদের কর্তব্য। এসবের মাধ্যমে মৃতের বড় উপকার হয়। হাদিসে এসবের দলিল রয়েছে।
তবে, মৃতব্যক্তির রুহে সওয়াব পৌঁছানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো দোয়া ও সদকা। এই দুই আমল কোরআন-হাদিস দ্বারা স্বীকৃত। এতে মৃতব্যক্তির অনেক উপকার হয়। নিচে এ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলো নিচে তুলে ধরা হলো।
১. দোয়ার উপকার
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- وَ الَّذِیْنَ جَآءُوْ مِنْۢ بَعْدِهِمْ یَقُوْلُوْنَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَ لِاِخْوَانِنَا الَّذِیْنَ سَبَقُوْنَا بِالْاِیْمَانِ وَ لَا تَجْعَلْ فِیْ قُلُوْبِنَا غِلًّا لِّلَّذِیْنَ اٰمَنُوْا رَبَّنَاۤ اِنَّكَ رَءُوْفٌ رَّحِیْمٌ۠ ‘এবং (ফাই-এর সম্পদ তাদেরও প্রাপ্য আছে ) যারা তাদের (অর্থাৎ মুহাজির ও আনসারদের) পরে এসেছে। তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! ক্ষমা করুন আমাদের এবং আমাদের সেই ভাইদেরও যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে এবং আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি কোনো হিংসা-বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি অতি মমতাবান, পরম দয়ালু।’ (সুরা হাশর: ১০)
এখানে পূববর্তী মুমিনদের জন্য দোয়ার প্রশংসা করা হয়েছে। দোয়া যদি তাদের জন্য উপকারী না হয়, তবে এ প্রশংসার কী অর্থ থাকে? হাফেজ সাখাবি (রহ) বলেন, এখানে পূর্ববর্তীদের জন্য দোয়া করায় তাদের প্রশংসা করা হয়েছে। বোঝা গেলো-দোয়া উপকারে আসে। (কুররাতুল আইন পৃ. ১২৩)
অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে- ‘হে আমার প্রতিপালক! যেদিন হিসাব প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল ঈমানদারকে ক্ষমা করুন।’ (সুরা ইবরাহিম: ৪১) আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করে দিন এবং আমার পিতা-মাতাকেও এবং যে ঈমান অবস্থায় আমার ঘরে প্রবেশ করেছে আর সমস্ত মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকেও।’ (সুরা নূহ: ২৮)
রাসুলুল্লাহ (স.)-কে উদ্দেশ্য করে ইরশাদ হয়েছে, ‘জেনে রাখুন, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং ক্ষমাপ্রার্থনা করুন নিজ ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য এবং মুসলিম নর-নারীদের জন্যও। (সুরা মুহাম্মদ: ১৯)
আরও পড়ুন: মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া করার সওয়াব
দোয়া মৃতের পক্ষে কল্যাণকর হওয়ার সবচেয়ে বড় দলিল হলো জানাজার নামাজ। জানাজার নামাজের মূল উদ্দেশ্যই হলো দোয়া। আলেমদের মতে, জানাজার নামাজই বস্তুত দোয়া। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যখন মাইয়িতের নামাজ পড়বে তখন তার জন্য নিষ্ঠার সাথে দুআ করবে।’ (সুনানে আবু দাউদ: ৩১৯৯)
জানাজার নামাজের দোয়া ছাড়াও বিভিন্ন দোয়ার মাধ্যমে মৃতব্যক্তির রুহে সওয়াব পৌঁছানো যায়। এ কারণে নবীজি (স.) সাহাবিদেরকে মৃতদের জন্য দোয়া করতে উৎসাহিত করতেন। নবী (স.) মৃতের দাফনকার্য সম্পন্ন করে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বলতেন-استغفروا لأخيكم، وسلوا له بالتثبيت، فإنه الآن يسأل ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করো এবং সে যেন সুদৃঢ় থাকতে পারে সে দোয়া করো। কারণ এখনই তাকে ‘সুয়াল’ করা হবে। (সুনানে আবু দাউদ: ৩২২১)
আরও পড়ুন: জানাজার নামাজ পড়ার নিয়ম
উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল (স.) আবু সালামাকে দেখতে এলেন, তখন তার চোখ খোলা ছিল। তিনি চোখ বন্ধ করে দিয়ে বললেন, যখন রুহ কবজ করা হয় তখন চোখ তার অনুসরণ করে। এ কথা শুনে লোকেরা কান্না শুরু করে দিল। নবী (স.) বললেন, তোমরা ভালো ছাড়া অন্যকিছু বলাবলি করো না। কারণ, তোমরা যা কিছু বলো ফেরেশতারা তার উপর আমিন বলেন। তারপর তিনি এভাবে দোয়া করলেন- اللهم اغفر لأبي سلمة، وارفع درجته في المهديين، واخلفه في عقبه في الغابرين، واغفر لنا وله يا رب العالمين، وافسح له في قبره، ونور له فيه ‘হে আল্লাহ! আপনি আবু সালামাকে ক্ষমা করে দিন, হেদায়েতপ্রাপ্তদের মধ্যে তার মর্যাদা উঁচু করুন, তার পরিবারের অভিভাবক হয়ে যান। হে জগতসমূহের প্রতিপালক! তাকে ও আমাদেরকে মাফ করে দিন। তার কবরকে প্রশস্ত ও নুরানি করে দিন।’ (সহিহ মুসলিম: ৯২০)
একবার রাসুল (স.) আবু আমের (রা.)-কে এক যুদ্ধে আমির নিযুক্ত করে পাঠিয়েছিলেন। একটি তীরের আঘাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তার আগে ভাতিজা আবু মূসা আশআরি (রা.)-কে বলে গেছেন, তিনি যেন নবী (স.)-এর কাছে তার সালাম পৌঁছান এবং তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে বলেন। আবু মূসা আশআরি (রা.) তা-ই করলেন। অতপর নবী (স.) পানি আনিয়ে অজু করলেন এবং দু’হাত প্রসারিত করে দোয়া করলেন- اللهم اغفر لعبيد أبي عامر، اللهم اجعله يوم القيامة فوق كثير من خلقك أو من الناس
আরও পড়ুন: মৃত মা-বাবার জন্য সন্তানের করণীয়
হে আল্লাহ! আপনি আবু আমেরকে মাফ করে দিন। তাকে কেয়ামতের দিন আপনার বহু সৃষ্টির উপর (বর্ণনাকারী বলেন, অথবা বলেছেন, মানুষের উপর) মর্যাদা দিন।’ (সহিহ মুসলিম: ২৪৯৮)
উল্লেখি আয়াত ও হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, দোয়া জীবিত ও মৃত সকলের জন্য কল্যাণকর।
২. সদকার উপকার
সদকা জীবিতদের মতো মৃতদের জন্যও করা যায় এবং এতে মৃতব্যক্তির অনেক সওয়াব লাভ হয়। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, সাদ ইবনে উবাদা (রা.)-এর অনুপস্থিতিতে তার মা ইন্তেকাল করেন। তিনি রাসুল (স.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমার অনুপস্থিতিতে আমার মা মারা গেছেন। আমি যদি তার পক্ষ থেকে সদকা করি, তবে কি তার কোনো উপকারে আসবে? বললেন, হ্যাঁ। সাদ (রা.) বললেন, আমি আপনাকে সাক্ষী রাখছি যে, আমার ‘মিখরাফ’ নামক বাগানটি আমার মা’র জন্য সদকা।’ (সহিহ বুখারি: ২৭৫৬)
আরও পড়ুন: দান-সদকা করবেন যাদের
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক লোক নবী (স.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করল, আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন, কোনো অসিয়ত করে যেতে পারেননি। আমার মনে হয়, তিনি যদি কথা বলতে পারতেন, তাহলে সদকা করে যেতেন। আমি তার পক্ষ থেকে সদকা করলে কি তিনি এর সওয়াব পাবেন? বললেন, হ্যাঁ।’ (সহিহ মুসলিম: ১০০৪)
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, আস ইবনে ওয়ায়েল জাহেলি যুগে একশ উট জবাই করার মানত করেছিল। অতপর (তার ছেলে) হিশাম তার পক্ষ থেকে ৫০টি উট জবাই করে। (বাকি ৫০টি অপর ছেলে আমর জবাই করতে চান।) এ ব্যাপারে তিনি নবী (স.)-কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, তোমার পিতা যদি তাওহিদ স্বীকার করত আর তুমি তার পক্ষ থেকে রোজা রাখতে বা সদকা করতে, তবে এটি তার কাজে আসত।’ (মুসনাদে আহমদ: ৬৭০৪)
এ হাদীসগুলো থেকে প্রমাণিত হলো যে- সদকার সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে। মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও সদকায় কল্যাণ হয়—এতে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের কোনো দ্বিমত নেই। ইমাম নববি (রহ) বলেন- وفيه أن الدعاء يصل ثوابه إلى الميت، وكذلك الصدقة، وهما مجمع عليهما ‘এ থেকে প্রমাণ মেলে যে, দোয়ার সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে, এমনিভাবে সদকার সওয়াবও। এ দুটি সর্বসম্মত বিষয়। (শরহু সহিহ মুসলিম: ১১/৮৫)
অন্যত্র এক প্রসঙ্গে লিখেছেন- ‘...যে ব্যক্তি পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করতে চায় সে যেন তাদের পক্ষ থেকে সদকা করে। সদকা মাইয়িতের কাছে পৌঁছে এবং তার উপকারে আসে। এতে কোনো দ্বিমত নেই। আর এটাই সঠিক। আর মাওয়ারদি কতক ‘আহলে কালাম’ থেকে যে কথা বর্ণনা করেছেন যে, মাইয়িতের কাছে কোনো সওয়াব পৌঁছে না, সেটা সম্পূর্ণ বাতিল ও ভুল। কিতাব-সুন্নাহ ও উম্মাহর ইজমা বিরুদ্ধ। সুতরাং তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’ (শরহু সহিহ মুসলিম: ১/৮৯-৯০)