মুহা. তারিক আবেদীন ইমন
২২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
- চার বিভাগে লংমার্চ, ঢাকায় মহাসমাবেশ
- দেশজুড়ে আন্দোলনের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা
- কর্মসূচিতে বাধা দিলে আরও কঠোর আন্দোলন
- প্রয়োজনে আবারও গণঅভ্যুত্থানের হুঁশিয়ারি
- দাবিতে থাকবে জ্বালানি সংকট, দ্রব্যমূল্য ইস্যু
গণভোট বাস্তবায়নে এবার আটঘাট বেঁধে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। এজন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে আন্দোরনের রূপরেখা। বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে না হতেই বড় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। চার বিভাগে লংমার্চসহ ঢাকায় মহাসমাবেশও করতে চায় বিরোধী জোট। ঢাকা বড় জমায়েতের ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। জোট নেতারা বলছেন, সরকার তাদের কর্মসূচিতে বাধা দিলে আরও বড় কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে। সরকারকে গণভোট বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে। প্রয়োজনে আরেকটি গণঅভ্যুত্থানের ডাক দেওয়া হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই বিএনপি সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে বিক্ষোভ মিছিল, সভা-সেমিনার এবং বিবৃতি দিচ্ছে জামায়াত জোট। সম্প্রতি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ইস্যুতে সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও পালন করা হয়েছে। এর আগে মুক্তাঙ্গনে এক সমাবেশ থেকে চার বিভাগীয় শহরে লংমার্চ এবং ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। গণভোটের রায় কার্যকর করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে কয়েক মাস ধরেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে।
এছাড়া সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া, স্কুল কমিটির হাতে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া, জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের ‘ভুতুড়ে বিল’ নিয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সম্প্রতি গ্যাসের দাম বাড়াতে সরকার কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে বলে অভিযোগ করছেন বিরোধী নেতারা।
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি উপলক্ষে জুলাই-আগস্ট মাসে ঢাকাসহ সারা দেশে প্রায় প্রতিদিনই কর্মসূচি পালন করছে জামায়াতে ইসলামী। তা ছাড়া ছাত্র, যুব, মহিলা ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের ব্যানারেও কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে। এসব কর্মসূচিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, শহীদদের যথাযথ মর্যাদা ও জুলাই গণহত্যার বিচারের পাশাপাশি সরকারের নানা সমালোচনা করছেন নেতারা।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায় কার্যকর করার জন্য সরকার ইতোমধ্যে সংবিধান সংশোধন কমিটি করেছে। তবে সেই কমিটিতে প্রতিনিধি দেয়নি বিরোধী জোট। তারা সংবিধান সংস্কারের দাবি জানিয়ে কমিটি গঠনের দিনেই সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আমাদের দাবি খুবই স্পষ্ট। জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে আমরা সবাই একমত হলাম। বলা হলো একটি গণভোট হবে, সেই আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হবে। এতে সরকারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আসবে। সেই আলোকে আমাদের এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন, কিন্তু তাদের (বিএনপি) সদস্যরা নিলেন না।’
জামায়াত নেতা বলেন, ‘সরকারের ক্ষমতায় ভারসাম্য জরুরি। সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে যে একক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার ফলে কী হয় তার বাস্তব উদাহরণ শেখ হাসিনার শাসনামল। এ জাতির দুর্ভাগ্য বারবার স্বৈরাচার ঘাড়ে চেপে বসে, আর মানুষ জীবন দিয়ে তাদের ক্ষমতা থেকে নামায়। আমার চাই এবারই এটার অবসান হোক। আগামী ২৭ আগস্ট সংসদের যে অধিবেশন ডাকা হচ্ছে, সেখানেই সরকার এর সুরাহা করুক।’
সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা, ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেট লংমার্চ (রেলপথে) কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এ ছাড়া ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচি নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান জানান, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, সব ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর, তেল, গ্যাস বিদ্যুতের দাম কমিয়ে আনা, জনভোগান্তি নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, খুনিদের বিচার নিশ্চিত, সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের বিচার দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য আন্দোলনে নেমেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
সরকারকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে ১১ দল অনেকগুলো কর্মসূচি পালন করেছে। নতুন ঘোষিত লংমার্চ জনগণের দাবি আদায়ের জন্য। অতীতের মতো যেন বাধা দেওয়া না হয়। বাধা দিলে লংমার্চ দ্বিগুণ গতিতে গন্তব্যে পৌঁছবে।’
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডসহ নানা কাজে বিরোধী দলের এমপিদের ‘মূল্যায়ন’ না করার অভিযোগ করেছেন জোট নেতারা। বর্তমান রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও সাবেক এলজিআরডিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি রংপুরে এক সমাবেশে ওই এলাকার উন্নয়ন না হওয়ার কারণ হিসেবে জামায়াত-জাতীয় পার্টিকে ভোট দেওয়াকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। তার এই বক্তব্যকে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বলে দাবি করছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তাদের দাবি, বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হওয়া এমপিদের নানাভাবে কোণঠাসা করে রাখা হচ্ছে। অনেক এলাকায় এমপিদের ওপর ‘মব’ সৃষ্টি করে হেনস্তা করা হচ্ছে। যশোরে এক এমপির বাড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটেছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে তারা বাকশালের পথে হাঁটছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের খবর নেই, সব জায়গায় দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে বসাচ্ছে। বিরোধীদলীয় এমপিদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।’
জামায়াতের এই এমপি বলেন, ‘শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সব সময় স্থানীয় এমপিকে সিন্ডিকেট মেম্বার করা হয়। অথচ আমাকে বাদ দিয়ে সরকারি দলের একজন সংরক্ষিত এমপি ও মাদারীপুরের একজন এমপিকে সিন্ডিকেটের মেম্বার করা হলো। বুটেক্স, পলিটেকনিকসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অনুষ্ঠানে স্থানীয় এমপিকে রাখা হয় না। এখানে শুধু আমাকে না, এই এলাকার মানুষ যে ভোট দিয়েছে, তাদের অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।’
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরব রয়েছে বিরোধী জোটের আরেক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সম্প্রতি বরিশালে এক সমাবেশে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘আজকে বরিশালে জড়ো হয়েছি। সর্বশেষ আমাদের ঢাকায় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। তারপর প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলায় আমাদের এই কর্মসূচি চলমান থাকবে। এর মধ্যে সরকার যদি গণভোটের রায়ের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, তাহলে গণআন্দোলন এবং গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত যেতে আমরা বাধ্য হবো।’
সম্প্রতি রংপরে আয়োজিত আরেক সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করা হবে। গণভোট বাস্তবায়নের দাবি থেকে আমাদের সরিয়ে নিতে নানা ধরনের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আমরা জাতির সঙ্গে বেঈমানি করতে পারি না। জনগণকে আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের আন্দোলন চালিয়ে যাব। প্রয়োজনে সরকারকে তা বাস্তবায়নে বাধ্য করব। আবু সাঈদের রক্তে ভেজা রংপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে আবারও সেই অঙ্গীকার করছি।’
টিএই/জেবি