জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
২০ আগস্ট ২০২৬, ০১:১০ এএম
প্রায় চার দশক ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে রয়েছেন সাবেক শিক্ষক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অবশেষে ধানের শীষকে ‘শেষ বিদায়’ জানালেন দলটির জ্যেষ্ঠ এই নেতা।
বুধবার (১৯ আগস্ট) দিনগত মধ্যরাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে দেওয়া পোস্টে এমনই বার্তা দিয়েছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।
মির্জা ফখরুল লিখেছেন, ‘প্রিয় নেতৃবৃন্দ, আজ আপনাদের থেকে সর্বশেষ বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে। আজকে শেষবারের মতো ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ’ বলে বিদায় নিচ্ছি। আপনাদের বিশ্বস্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।’
প্রসঙ্গত, রাত পোহালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে নিশ্চিতভাবেই বিজয়ী হবেন বিএনপির প্রার্থী ও দলের সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

কারণ, এই নির্বাচনে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। সেক্ষেত্রে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেহেতু ২০০’র বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি, ফলে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া এখন শুধু ‘ভোট’ নামক একটি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
এদিকে এই নির্বাচনে অংশ নিতে নিয়ম অনুযায়ী দলের সব পদ থেকে অবসর নিয়েছেন বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব। এবার নির্বাচনের আগের রাতে দলকে সর্বশেষ বিদায়ও জানালেন এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক।
দেড় দশক পর অনুষ্ঠিতব্য এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলের প্রতিদ্বন্দী ১১ দল মনোনীত এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুর দুইটায় জাতীয় সংসদে শুরু হবে এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। শেষ হবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। এর কিছু সময় বাদেই জানা যাবে ২৩তম রাষ্ট্রপতির নাম। সেই নামটি যে মির্জা ফখরুল, তা একেবারেই সুনিশ্চত। শুক্রবার নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ।

রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই আলোচনায় তার প্রায় ছয় দশকের রাজনৈতিক পথচলা। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী।
মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই তার রাজনীতির পাঠ শুরু। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময়ও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নেতৃত্ব দেন।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভিক অধ্যায় ছিল বামপন্থী রাজনীতিকে ঘিরে। পরে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।
রাজনীতির পাশাপাশি মির্জা ফখরুলের কর্মজীবনও ছিল বৈচিত্র্যময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে তিনি ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করেন।

১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে সাধারণ মানুষের রাজনীতির আকর্ষণে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নেমে পড়েন। ১৯৮৮ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় মির্জা ফখরুল বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। পরবর্তীতে কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি ও দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব সামলান। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন।
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুলকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। ২০১১ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে টানা দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি।
এর পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারেক রহমানের নতুন সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে অধিষ্ঠিতও হন। খুব শিগগির তাকে দেখা যাবে রাষ্ট্রপতির আসনেও।
বিইউ/এএইচ