বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকা

রাজপথের লড়াই পেরিয়ে বঙ্গভবনের পথে 'সজ্জন' মির্জা ফখরুল

বোরহান উদ্দিন
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩১ পিএম

শেয়ার করুন:

রাজপথের লড়াই পেরিয়ে বঙ্গভবনের পথে 'সজ্জন' মির্জা ফখরুল
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজপথে লড়াইয়ের দিনগুলো। ছবি: সংগৃীত
  • শিক্ষকতা থেকে রাজনীতি, কুড়িয়েছেন সর্বজনীন শ্রদ্ধা
  • চরম সংকটেও দলের হাল ছাড়েননি
  • শতাধিক মামলা, কারাবাসেও পিছু হটেননি
  • পেলেন ত্যাগ ও আস্থার স্বীকৃতি

দেশের রাজনীতির ভেতরে-বাইরে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে একটিই নাম—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ৭৭ বছরের দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি কখনো ছিলেন শ্রেণিকক্ষে অর্থনীতির পাঠ দেওয়া প্রিয় শিক্ষক, কখনো ছিলেন সচিবালয়ে কর্মরত দক্ষ কর্মকর্তা। আবার কখনো প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সামলেছেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর। তবে তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে বড় ক্যানভাসটি রচিত হয়েছে পিচঢালা রাজপথে। জীবনভর একশোর বেশি মামলা আর দফায় দফায় কারাবাসের নির্মম নির্যাতন সয়েও অটল ধৈর্যে যিনি সামলেছেন রাজনীতির কঠিন আন্দোলন ও প্রতিকূল সময়। সবশেষ তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা এই বর্ষীয়ান রাজনীতিক এবার বসতে যাচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ বঙ্গভবনে।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। এর আগে দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কক্ষে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তাঁকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। দলীয় ঐতিহ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক শিষ্টাচার বজায় রেখে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ার পরপরই তিনি বিএনপির মহাসচিব এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

image

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির প্রার্থী হওয়ায় এখন তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ার আনুষ্ঠানিকতাটুকুই কেবল বাকি। মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপ্রধানের পদে আনার এই সিদ্ধান্তকে দলমত-নির্বিশেষে সবাই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের মতে, রাজনীতিবিদ হিসেবে ফখরুলের রুচিবোধ, প্রজ্ঞা, চরম বৈরী পরিবেশেও দলকে আঁকড়ে রাখা এবং সততারই এক সর্বোচ্চ স্বীকৃতি এই বঙ্গভবনযাত্রা।

রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুলকে মনোনীত করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসা করেছেন সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, দীর্ঘ দুই যুগ পর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ বঙ্গভবনে একজন উপযুক্ত ও ব্যক্তিত্ববান আসীন হতে যাচ্ছেন। বহুবছর পর আমরা পেতে যাচ্ছি এই পদের জন্য সবদিক দিয়ে যোগ্য একজন ব্যক্তিকে।

শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে মির্জা ফখরুলের অবদান ও ত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার দুঃশাসনকালে মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দলের হাল ধরেছেন, বহুভাবে নির্যাতিত হয়েছেন এবং ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তিনি ব্যক্তিত্ববান, সুশিক্ষিত, সদাচারী ও সুবক্তা হিসেবে অগ্রগণ্য।

আরও পড়ুন: 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির দুর্দিনে যেভাবে দলকে আগলে রেখেছেন, দলের পতাকাকে তুলে ধরেছেন, তাঁর সম্মান দেওয়া উচিত। এই পদে ভিন্ন কোনো চিন্তার অবকাশ নেই।

রাজপথ থেকে বঙ্গভবনের পথে

রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে তাঁর প্রায় ছয় দশকের পথচলা। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী, সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী।

image

মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁও থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই তাঁর রাজনীতির পাঠ শুরু। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখায় নেতৃত্ব দেন।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রারম্ভিক অধ্যায় ছিল বামপন্থী রাজনীতিকে ঘিরে। পরে তিনি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

রাজনীতির পাশাপাশি মির্জা ফখরুলের কর্মজীবনও ছিল বৈচিত্র্যময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে তিনি ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করেন। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে সাধারণ মানুষের রাজনীতির আকর্ষণে ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নেমে পড়েন। ১৯৮৮ সালে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। পরবর্তীতে কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি ও দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্ব সামলান। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন।

image

২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করা হয়। ২০১১ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ থেকে টানা দলের মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। এর পাশাপাশি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে জয়ী হয়ে তারেক রহমানের নতুন সরকারে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পাশের আসনে অধিষ্ঠিত হন।

কারাবাস, ১১১টি মামলা ও আন্দোলনের সম্মুখযোদ্ধা

রাজনীতির ময়দানে মির্জা ফখরুলের এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনকালে দমন-পীড়ন ও নির্যাতনে বারবার বিপর্যয় ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছিল বিএনপি। সেই চরম দুর্দিনে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রবাসে অবস্থানকালে দেশে মূল কাণ্ডারি হিসেবে রাজপথের আন্দোলন সামলাতে হয়েছে মির্জা ফখরুলকেই।

image

এ আন্দোলন চালাতে গিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মোট ১১১টি মামলা দেওয়া হয়েছিল। জীবনের নানা সময়ে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে। বিশেষ করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিন দফায় গ্রেপ্তার হয়ে জীবনের প্রায় সাড়ে তিন বছর তাঁকে কাটাতে হয়েছে কারাগারে। তবে কোনো গ্রেপ্তার বা নির্যাতন তাঁকে আদর্শের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ২০১৮ সালে বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও ভোট কারচুপির প্রতিবাদে দলের সিদ্ধান্তে শপথ না নিয়ে বিরল রাজনৈতিক নজির স্থাপন করেছিলেন তিনি।

ব্যক্তিজীবনে বিনয়ী ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষ হিসেবে পরিচিত মির্জা ফখরুল। তাঁর সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগম একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাঁদের বড় মেয়ে ড. মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত এবং ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকার একটি ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

বিইউ/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর