Dhaka Mail Logo

রাজনীতি

এক পদের ‘ধাক্কা’, বিএনপিতে নানা সমীকরণ

বোরহান উদ্দিন

১২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম

  • মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে ফাঁকা হবে তিন পদ
  • ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দৌড়ে রিজভী ও সালাহউদ্দিন
  • স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর আলোচনায় দুই নাম
  • বাবার আসনে ফখরুল কন্যা নাকি ফয়সল আমীন?
  • চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি তারেক রহমানের হাতে

দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গন ও ক্ষমতাসীন দল বিএনপির অন্দরমহলে বড় পরিবর্তনের হাওয়া বইছে। দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বঙ্গভবনে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠতেই ক্ষমতাসীন দলটিতে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। একটি মাত্র পদ খালি হওয়ার জেরে দল, সরকার ও মাঠ-রাজনীতি তিনটি মূল জায়গাতেই ধাক্কা লাগার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে একযোগে ফাঁকা হবে দেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাবশালী তিনটি পদ। একদিকে এক দশকের বেশি সময় ধরে সামলানো বিএনপির মহাসচিব পদ, দ্বিতীয়ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং তৃতীয়ত তাঁর সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, দলের প্রতি আনুগত্য, শতাধিক মামলা ও লম্বা সময় কারাবাসের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে রাষ্ট্রপ্রধানের পদে বিবেচনা করা হচ্ছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে বিএনপি।

অন্যদিকে এই তিন শূন্য পদে নতুন নেতৃত্ব কে সামলাবেন এবং কীভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হবে, তা নিয়ে পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা। দলের ভেতরে-বাইরে একাধিক নেতার নাম নিয়ে গুঞ্জন থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলীয় প্রধান তারেক রহমান। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার আগেই আলোচিত নেতাদের সমর্থক ও বলয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

মহাসচিব পদে রিজভী-সালাহউদ্দিনের সঙ্গে আলোচনায় ডা. জাহিদও

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর পূর্বপ্রস্তুতি ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে এবং মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে বিএনপি ও বিরোধী জোট। এই প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) জরুরি বৈঠক ডেকেছেন বিএনপি প্রধান তারেক রহমান। এই বৈঠকের পরই রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হতে পারে। অবশ্য দলীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ইঙ্গিতে এটা অনেকটাই স্পষ্ট যে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেই বঙ্গভবনের দায়িত্ব দিতে যাচ্ছে দল।

আরও পড়ুন

রাষ্ট্রপতি মনোনয়নেও ‘চমক’ দেখাবেন তারেক রহমান!

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির শপথ নিলে বিএনপির দ্বিতীয় শীর্ষ পদ ‘মহাসচিব’ ফাঁকা হবে। দলটির গঠনতন্ত্রে সরাসরি ‘ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব’ পদের কোনো সুনির্দিষ্ট স্থায়িত্বের উল্লেখ না থাকলেও বিশেষ পরিস্থিতিতে দলের চেয়ারম্যান তার অর্পিত ক্ষমতাবলে যেকোনো জ্যেষ্ঠ নেতাকে এই দায়িত্ব দিতে পারেন। মির্জা ফখরুল নিজেও দীর্ঘ সময় দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বর্তমানে এই পদের জন্য আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন এক দশকের বেশি সময় ধরে নয়াপল্টন কার্যালয় সামলানো দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তবে স্থায়ী কমিটির ভেতরে তার পদায়ন নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে। অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নিয়োগ না দেওয়া হলে স্বাভাবিক নিয়মেই রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হতে পারেন বলে মনে করছেন অনেকে।

Fakhrul22
দুর্দিনে বিএনপিকে আগলে রাখেন প্রবীণ এই নেতা। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের একটি বড় অংশ চান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হোক স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যকে। সেক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদের নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে তাকে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে; বিশেষ করে স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে তার প্রভাব এবং বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে দলীয় অঙ্গনেও নানা আলোচনা রয়েছে।

রিজভী ও সালাহউদ্দিন ছাড়াও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় এসেছে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের নাম।

এদিকে রুহুল কবির রিজভী মহাসচিব পদে উন্নীত হলে খালি হতে যাওয়া জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব পদের জন্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও হাবিব উন নবী খান সোহেলদের নাম বিবেচনায় আসতে পারে। বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত তারা মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও নীতি-নির্ধারণী মূল পদে তাদের দেখা যায়নি।

কে সামলাবেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়?

শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বঙ্গভবনের বাসিন্দা হলে ফাঁকা হবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ দফতর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। গুঞ্জন রয়েছে, দফতর বদল করে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে। তিনি স্থানীয় সরকারে গেলে ফাঁকা হওয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উত্তরসূরি হিসেবে আসতে পারেন বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। এছাড়া বর্তমানে এ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করে আসা প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

নেতারা সরকারে, ঝিমিয়ে পড়ছে দল!

তবে মন্ত্রিসভায় এই রদবদল বা নতুন দায়িত্ব বণ্টনের পুরো বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।

বাবার আসনে হাল ধরবেন ফখরুল কন্যা নাকি ভাই?

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে শূন্য ঘোষণা করা হবে তাঁর সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ (সদর)। এই আসনে উপনির্বাচনে মির্জা পরিবারের সদস্য নাকি অন্য কেউ বিএনপির টিকিট পাবেন-তা নিয়েও চলছে জল্পনা। তবে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের মেয়ে কিংবা ভাইয়ের মধ্য থেকেই কারও উঠে আসার সম্ভাবনা বেশি।

Fakhrul
জিয়া পরিবারের আস্থাভাজন নেতা মির্জা ফখরুল। ছবি: সংগৃহীত

ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে মির্জা পরিবারের শক্ত প্রভাব রয়েছে। মির্জা ফখরুলের বাবা রুহুল আমিন (চখা মিয়া) ছিলেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন সাবেক স্পিকার ও আইনমন্ত্রী। ফখরুলের বিদায়ে আসনটিতে উপনির্বাচনে তাঁর বড় মেয়ে, অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও গবেষক ড. শামারুহ মির্জা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। গত নির্বাচনেও বাবার পক্ষে তিনি মাঠে সক্রিয় ছিলেন। পাশাপাশি ফখরুলের ছোট ভাই, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মির্জা ফয়সল আমীনও প্রার্থী হিসেবে জোরালো আলোচনায় আছেন।

৩৫ বছর পর ব্যালটে গড়াচ্ছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

তফসিল অনুযায়ী, আগামীকাল ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। ইতোমধ্যে বিএনপির পক্ষে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হিসেবে নাম এসেছে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদের।

আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রীর ‘গতিতে’ বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট

একাধিক প্রার্থী থাকায় ১৯৯১ সালের পর অর্থাৎ দীর্ঘ ৩৫ বছর পর সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ব্যালট ভোটে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে দেশের নতুন রাষ্ট্রপতি। এ উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ও ভবনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ইতোমধ্যেই শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য ৬ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভার তারেক রহমানের হাতে

এদিকে গত ১ আগস্ট গুলশানে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করার পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয় দলটির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানকে। মির্জা ফখরুলকে বঙ্গভবনে পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পাশাপাশি মহাসচিব পদের ভার কার কাঁধে যাবে এবং মন্ত্রিসভায় কী রদবদল আসবে—তার সব রূপরেখাই আসবে দলীয় প্রধানের কাছ থেকে। বৃহস্পতিবারের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পরই এ বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিইউ/জেবি