images

রাজনীতি

চানাচুর না এটি ‘হাওয়াই মিঠাই’ বাজেট: সারোয়ার তুষার

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৯ জুন ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে ‘হাওয়াই মিঠাইয়ের বাজেট’ আখ্যা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সচিব সারোয়ার তুষার। তার দাবি, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট দেখতে আকর্ষণীয় হলেও সাধারণ মানুষের জন্য এতে কার্যকর কোনো সুফল নেই। বরং বাজেট বাস্তবায়িত হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর আরও বেশি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে।

শুক্রবার (১৯ জুন) জাতীয় প্রেসক্লাবে জাতীয় যুবশক্তি আয়োজিত ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শ্রমিকের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তুষার এ মন্তব্য করেন।

সারোয়ার তুষার বলেন, ‘আমাদের সমন্বয়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বাজেটটি চানাচুরের মতো। আমার কাছে বরং এটি হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মনে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট শুনতে খুব আকর্ষণীয়। কিন্তু হাওয়াই মিঠাই যেমন দেখতে সুন্দর হলেও মুখে দেওয়ার পর মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়, এই বাজেটও তেমন। এর কোনো পুষ্টিগুণ নেই, বাস্তব উপকারও নেই।’ 

শ্রমজীবী মানুষের প্রসঙ্গ তুলে তুষার বলেন, ‘দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করলেও তাদের জন্য বাজেটে কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেই। বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাজেট তৈরি করা হয়েছে। অনেকেই আশা করেছিলেন গরিব মানুষ ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য কিছু থাকবে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই নেই।’  

রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সারোয়ার তুষার। তার মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বর্তমান সক্ষমতার সঙ্গে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যের কোনো সামঞ্জস্য নেই। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরে এনবিআরের লক্ষ্য ছিল প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু তারা আদায় করতে পেরেছে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সেখানে হঠাৎ করে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

এনসিপির এ নেতা বলেন, ‘মনে হচ্ছে যেন কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটবে এবং এনবিআর এই লক্ষ্য পূরণ করে ফেলবে। বাস্তবে এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’ 

সারোয়ার তুষার দাবি করেন, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতির বাজেটগুলোর একটি। শুরুতেই প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতি নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারকে এই ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের তুলনায় ব্যয় অনেক বেশি হওয়ায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রাখা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এনসিপির এই নেতা। তিনি বলেন, খেলাপি, পুনঃতফসিল ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ মিলিয়ে ব্যাংক খাত বড় ধরনের চাপে রয়েছে। এর মধ্যেই সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও সংকুচিত করতে পারে।

আইএমএফের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কও প্রত্যাশিত অবস্থায় নেই বলে মন্তব্য করেন সারোয়ার তুষার। তার দাবি, রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কার ছাড়া আন্তর্জাতিক ঋণ পাওয়া কঠিন হবে, ফলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। বাজেটের উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখার সমালোচনাও করেন তিনি। বলেন, এত বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

‘থোক বরাদ্দের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো জনগণ জানে না, এই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় হবে। এতে স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হয় এবং অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ে,’ বলেন তুষার।

কর কাঠামোর সমালোচনা করে সারোয়ার তুষার বলেন, খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অগ্রিম কর আদায়ের ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে। তাঁর দাবি, নতুন কর কাঠামোয় নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের করের বোঝা তুলনামূলক বেশি বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা হিসাব করে দেখেছি, যাদের আয় কম তাদের করের চাপ তুলনামূলক বেশি বেড়েছে। মাসিক ৭৪ হাজার টাকা আয় হলে কর প্রায় ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ছে, ৯৮ হাজার টাকা আয় হলে কর বাড়ছে ৫৭ শতাংশ। অথচ উচ্চ আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে কর বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম।’ 

এ কারণে তুষার বাজেটকে ‘রিগ্রেসিভ’ বা পশ্চাৎমুখী করব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

সারোয়ার তুষার বলেন, ‘এই বাজেট বাস্তবায়ন না হলেও সমস্যা, আবার বাস্তবায়িত হলেও সমস্যা। বাস্তবায়ন না হলে যাদের খুশি করার চেষ্টা করা হয়েছে তারা অসন্তুষ্ট হবে। আর বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষ, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর আরও বেশি চাপ তৈরি হবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের উচিত ছিল নিজের ব্যয় কমিয়ে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকারের ব্যয় কাঠামো বজায় রাখতে জনগণকেই আরও বেশি ব্যয় বহন করতে হবে।’ 

এমএইচ/ক.ম