images

রাজনীতি

‘মন্দার বাজারে’ টিকে থাকার লড়াই, বাজেটে কী চান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

আব্দুল হাকিম

০৮ জুন ২০২৬, ০৩:০০ পিএম

চায়ের কাপে খটখট শব্দ করছে, আর তার ভেতরেই যেন জমে আছে ভাপা কষ্ট আর হিসাব-নিকাশের চাপ। রাজধানীর মিরপুর ৬ নম্বর এলাকার গলি, বাজার আর মোড় ঘুরে ছোট দোকানগুলোর একই চেনা চিত্র চোখে পড়ছে। একসময় যেসব দোকান দিনভর ক্রেতায় মুখর থাকত, সেখানে এখন নেমে এসেছে নীরবতা। বিক্রি কমেছে, খরচ বেড়েছে, আর ঋণের কিস্তির চাপ হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের বাস্তবতা।

মিরপুর ৬ নম্বরের একটি গলিতে ছোট চায়ের দোকান চালান সুমন মিয়া। এই দোকানই তার পরিবারের আয়ের প্রধান ভরসা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকান খোলা থাকলেও এখন আগের মতো আর বিক্রি নেই। দোকানের সামনে দুটি বেঞ্চ, একটি টেবিল আর পুরোনো কেটলি-এই নিয়েই চলছে তার ব্যবসা। ছোট এই চায়ের দোকানটাই এখন তার জন্য বড় চাপের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ খরচ কমছে না, বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।

ঢাকা মেইলকে সুমন মিয়া বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল, দোকান ভাড়া সবই আগের মতো বা আরও বেশি। কিন্তু বিক্রি কমে গেছে। আগে সকালে চুলা ধরানোর পর একের পর এক মানুষ আসত। এখন অনেক সময় বসে থাকতে হয়, আগের মতো আয় হয় না। আমরা ছোট মানুষ। আমাদের ব্যবসাও ছোট। কিন্তু খরচ বড় ব্যবসার মতোই লাগে। ভ্যাট-ট্যাক্সের কথা শুনলেই ভয় লাগে।’

একই এলাকার আরেক চায়ের দোকানি নয়ন আলী বলেন, ‘মিরপুর ৬ নম্বরে আগে যেটা ব্যস্ত এলাকা ছিল, এখন মানুষও কমে গেছে। অফিস টাইম ছাড়া তেমন ভিড় থাকে না। ফলে চায়ের বিক্রিও কমে গেছে। ছোট ব্যবসায়ীরা এখন শুধু লাভের জন্য নয়, টিকে থাকার জন্য লড়ছেন। প্রতিদিন হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই হিমশিম খাচ্ছেন।’

মিরপুর ৬ নম্বরের বাজার ঘুরে দেখা যায়, মুদি দোকান, কসমেটিকস দোকান, চায়ের স্টল সব জায়গায় একই অবস্থা। বিক্রি কম, কিন্তু দোকান চালু রাখতে হচ্ছে। কারণ বন্ধ করলেই পুরো পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যাবে।

মুদি দোকানের মালিক শরীফ উদ্দীন বলেন, ‘আগে দিনে যে বিক্রি হতো, এখন তার অর্ধেকও হয় না। পণ্য কিনে রেখে দিতে হয়, কিন্তু বিক্রি হয় না। ব্যাংকঋণের কিস্তি আছে, দোকানভাড়াও দিতে হয়। সব মিলিয়ে চাপ বাড়ছে, ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

তিনি জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন পুঁজির সংকট। অনেকেই ঋণ নিয়ে দোকান শুরু করেছেন, কিন্তু বিক্রি কমে যাওয়ায় সেই ঋণ শোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

আরেক দোকানি লিমন হোসেন বলেন, ‘নতুন মাল তুলতে ভয় লাগে, আগের মালই বিক্রি হয় না, নতুন মাল এনে লাভ নেই। বাজেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং সুদের চাপ কমানোর ব্যবস্থা না থাকলে অনেক দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। কিস্তির লোক এলেই টেনশন শুরু হয়। হাতে টাকা না থাকায় অনেক সময় ধার করে কিস্তি দিতে হয়।’

শুধু দোকানদার নয়, ফুটপাত ও মোড়ের ক্ষুদ্র বিক্রেতারাও একই অবস্থার মধ্যে আছেন। অনেকে পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন, কেউ আবার ব্যবসার পরিধি ছোট করে ফেলেছেন।

এক কসমেটিকস দোকানের মালিক আফজাল হোসেন বলেন, ‘আগে নতুন মাল নিয়মিত তুলতাম, এখন পুরোনো মালই পড়ে থাকে। নতুন মাল আনতে সাহস হয় না। কিস্তির জন্য অন্য জায়গা থেকে ধার করতে হয়, তারপর সেই ধার শোধ করতে আবার চাপ পড়ে। বাজেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কিস্তি পুনঃতফসিল বা বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা না থাকলে অনেকেই ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ক্ষুদ্র ব্যবসা দেশের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি। এই খাত দুর্বল হলে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো অর্থনীতিতেই চাপ পড়ে। বাজেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কম সুদে ঋণ, কর সহজীকরণ, বিদ্যুৎ বিলে সহায়তা এবং ভ্যাট কাঠামো সহজ করা জরুরি।

এএইচ/এমআর