ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই। চাকরি পেলেও বেতন কম। তরুণদের হতাশা, বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা, ফ্রিল্যান্সিং ও ছোট উদ্যোগে ঝুঁকে পড়া এখন শহুরে বাস্তবতার অংশ। রাজধানীর বিসিএস কোচিং সেন্টার, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির লাইব্রেরিগুলো ঘুরলেই দেখা যায় একই চিত্র। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও স্থায়ী ও মানসম্মত কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে হাজারো তরুণের। আসন্ন জাতীয় বাজেটকে কেন্দ্র করে তাদের প্রধান প্রত্যাশা, কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।
তিন বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছেন সাইফুল ইসলাম। সেই থেকে চাকরির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। শতাধিক আবেদন করেও স্থায়ী কোনো চাকরি মেলেনি। পরিবার এখন চায় তিনি বিদেশে যান। কিন্তু নিজের দেশে থেকেই কিছু করার স্বপ্ন এখনো ছাড়েননি তিনি। বাজেট নিয়ে তার প্রত্যাশা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বাস্তব ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হোক।
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর কাঁটাবন এলাকার একটি বিসিএস কোচিং সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল তার সঙ্গে। হাতে পুরোনো ফাইল, চাকরির আবেদনপত্র আর বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র। দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতি আর অনিশ্চয়তার ভেতর দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, শুরুতে অনেক স্বপ্ন ছিল। মনে হতো চেষ্টা করলেই কিছু একটা হয়ে যাবে। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ততই বাস্তবতা কঠিন হয়েছে, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও গভীর হয়েছে।
সাইফুলের বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক। বড় ছেলে হিসেবে পরিবারের দায়িত্বও এখন তার কাঁধে। তিনি বলেন, প্রতিবার পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় পুরো পরিবার অপেক্ষা করে থাকে। আত্মীয়স্বজনের প্রশ্ন, প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসা সব মিলিয়ে চাপটা এখন আর শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, পরিবারেও ছড়িয়ে পড়েছে।
রাজধানীর ফার্মগেট, কাঁটাবন, নীলক্ষেত ও আজিমপুর এলাকায় প্রতিদিন হাজারো তরুণ চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কেউ বিসিএস, কেউ ব্যাংক, কেউ আবার বেসরকারি চাকরির প্রতিযোগিতায় নিজেদের গড়ে তুলছেন। দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করেও কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়ায় তাদের অনেকের মধ্যেই এক ধরনের স্থবিরতা ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন

কাঁটাবনের একটি লাইব্রেরিতে পড়ছিলেন ময়মনসিংহ থেকে আসা জুবায়ের হাসান। দুই বছর ধরে ঢাকায় থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। পরিবারের পাঠানো টাকায় চলা জীবনে প্রতিদিনই নতুন চাপ যোগ হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবার আশা করে আমি চাকরি পাব। কিন্তু প্রতিযোগিতা এত বেশি যে প্রতিদিনই মনে হয়, নিজের জায়গাটা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
তার কয়েকজন বন্ধু ইতোমধ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। কেউ মালয়েশিয়া, কেউ ইতালি, কেউ কানাডা। জুবায়ের বলেন, আশপাশের মানুষ যখন চলে যাচ্ছে, তখন নিজের সিদ্ধান্ত নিয়েও দ্বিধা তৈরি হয়। তবে এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, কারণ নিজের দেশে কিছু করার ইচ্ছাটা এখনো আছে।
শুধু সরকারি চাকরি নয়, বেসরকারি চাকরির বাজার নিয়েও তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ স্পষ্ট। অনেকেই বলছেন, চাকরি পেলেও বেতন এত কম যে শহরের ব্যয় মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মাহিনুর রহমান। দুই বছর আগে স্নাতক শেষ করে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। মাসিক আয় ২৪ হাজার টাকা। তিনি বলেন, মাস শেষে হিসাব করলে দেখা যায়, বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত আর প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়ে কিছুই থাকে না, বরং অনেক সময় ঋণ নিতে হয়।
তিনি বলেন, চাকরি থাকলেও আর্থিক নিরাপত্তা নেই, ভবিষ্যতের জন্য কোনো স্থিতিশীলতা তৈরি হয় না, যা মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক তরুণ এখন চাকরির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা ও ছোট উদ্যোগের দিকে ঝুঁকছেন। তবে এখানেও রয়েছে অনিশ্চয়তা, অনিয়মিত আয় এবং স্থায়িত্বহীন ভবিষ্যতের শঙ্কা।
মিরপুরের নাঈম হোসেন জানান, তিনি আগে চাকরির জন্য বহু চেষ্টা করেছেন, পরে গ্রাফিক ডিজাইনের কাজে যুক্ত হন। তিনি বলেন, এক পর্যায়ে বুঝেছি শুধু চাকরির পেছনে দৌড়ালে নিজেকে গড়ে তোলা সম্ভব না, তাই অন্য পথ খুঁজতে হয়েছে। এই কাজেও আয় কখনো ভালো হয়, আবার কখনো একেবারেই কাজ থাকে না, ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কোচিং সেন্টার ও লাইব্রেরিগুলোর আশপাশে কথা বলে জানা যায়, তরুণদের বড় একটি অংশ এখন মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা ও সামাজিক প্রত্যাশার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন বেকার থাকা, পরিবার ও আত্মীয়দের চাপ এবং বন্ধুদের সাফল্যের তুলনায় নিজেদের অবস্থান সব মিলিয়ে অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছেন।
>> আরও পড়ুন
মিরপুর-১০ এলাকার কোচিং সেন্টারের সামনে বিকেলে কয়েকজন তরুণকে দেখা যায় চাকরির প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করতে। কেউ পরীক্ষার ফল নিয়ে কথা বলছেন, কেউ ভাইভার অভিজ্ঞতা ভাগ করছেন। তাদের আলোচনায় একই সঙ্গে আশা, চাপ আর অনিশ্চয়তা একসঙ্গে মিশে আছে।
শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি পাওয়া অনেক তরুণ বাস্তব দক্ষতার অভাবে চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছেন। প্রযুক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, কারিগরি শিক্ষা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
চাকরিপ্রার্থী রাকিব হাসান বলেন, আমরা খুব বেশি কিছু চাই না, শুধু চাই পড়াশোনা শেষ করে যেন সম্মানের সঙ্গে নিজের জায়গাটা খুঁজে নিতে পারি, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া। তরুণদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থান নিশ্চিত না হলে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নও টেকসই হবে না।

বিসিএস পরীক্ষার্থী তানজিলা আক্তার বলেন, একসময় আত্মীয়দের বাসায় যেতে ভালো লাগত, এখন মনে হয় সবাই একই প্রশ্ন করবে, চাকরি হয়েছে কি না, আর সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে ভারী লাগে। বেকারত্ব এখন শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি ধীরে ধীরে মানসিক সংকটেও রূপ নিচ্ছে, যা তরুণদের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
অনেক পরিবার এখন সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে আগ্রহী। দেশে থেকে দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও চাকরি না পাওয়ার অভিজ্ঞতা এই প্রবণতা আরও বাড়াচ্ছে। নরসিংদী থেকে ঢাকায় কোচিং করতে আসা সোহেল রানা বলেন, বাবা প্রায়ই বিদেশে যাওয়ার কথা বলেন, কিন্তু আমি এখনো নিজের দেশে কিছু করার চেষ্টা ছাড়িনি, যদিও পথটা সহজ মনে হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিক্ষাব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি পাওয়া অনেক তরুণ বাস্তব দক্ষতার অভাবে চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছেন। প্রযুক্তি, যোগাযোগ দক্ষতা, কারিগরি শিক্ষা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।




