বোরহান উদ্দিন
২০ মে ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
দলের কার্যক্রম গতিশীল এবং তৃণমূল আরও শক্তিশালী করতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। এরই অংশ হিসেবে যুবদলের নতুন কমিটি গঠন নিয়েও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে জমা পড়ায় আপাতত নতুন কমিটি হবে কি না-এ নিয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। এর মধ্যেই সম্ভাব্য নতুন কমিটিতে শীর্ষ পদ পেতে আগ্রহীরা শুরু করেছেন লবিং-তদবির। অনেকেই বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেদের ভূমিকার বিষয়টি বিভিন্ন মাধ্যমে দলের হাইকমান্ডের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
জানা গেছে, বিএনপির অষ্টম জাতীয় কাউন্সিলের আগেই কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ঢাকার দুই মহানগর যুবদলের নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। সংগঠনটির নেতারা জানান, ২০২৪ সালের ৯ জুলাই ঘোষিত আংশিক কমিটিতে সভাপতি করা হয় আবদুল মোনায়েম মুন্নাকে এবং সাধারণ সম্পাদক হন নুরুল ইসলাম নয়ন। তবে নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নিজ নির্বাচনী এলাকায় ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ায় সংগঠনের কার্যক্রমে পূর্ণ সময় দিতে পারছেন না। এ পরিস্থিতিতে দ্রুত নতুন কমিটি গঠনের আলোচনা জোরালো হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘অপপ্রচার ঠেকাতে’ মাঠে নামছে বিএনপি
সংগঠনের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনেও কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ছে। এ সময়ের মধ্যে নানা কারণে অনেকেই সংগঠন থেকে ছিটকে পড়েছেন, কেউ কেউ বিভিন্ন অভিযোগে বহিষ্কারও হয়েছেন। পদপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে চেইন অব কমান্ড মানার প্রবণতাও কমে গেছে। এতে সংগঠনের ভেতরে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অপরদিকে যখন যুবদলের নতুন কমিটি গঠনের জোরালো দাবি উঠেছে, সেই সময়ে বর্তমান নেতৃত্ব কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলছেন নতুন কমিটি প্রত্যাশীরা। ইতোমধ্যে হাইকমান্ডের কাছে ১৫১ সদস্য ও ২৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদনের জন্য জমা দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
সাবেক ছাত্রদল থেকে আসা নেতাকর্মীরা বলছেন, যুবদলের রাজনীতিতে সময় দিলেও নতুন কমিটি হলে তাদের পদপদবি পাওয়ার আশা থাকবে না। সে ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে অন্তত রাজনৈতিক পরিচয় বহন করার সুযোগ পাবেন তারা। তবে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে যেন ত্যাগী ও যোগ্যরা স্থান পান সেই দাবি করেন তারা।
আবার নতুন কমিটি গঠিত হলে বর্তমান কমিটির ‘সুপার ফাইভে’ থাকা নেতাদের নতুন কমিটিতে থাকা না-থাকা নিয়েও গুঞ্জন রয়েছে।
এদিকে বিএনপির নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে, কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার প্রস্তাব জমা দেওয়া হলেও আপাতত তা স্থগিত রেখেছে হাইকমান্ড। কারণ দলীয় প্রধান তারেক রহমান যোগ্য, ত্যাগী এবং তরুণদের হাতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের দায়িত্ব দিতে চাচ্ছেন। তেমনটি হলে আগামীতে নেতৃত্বের সুযোগ পাবেন বিগত দিনের বঞ্চিতরা। এতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো গতি পাবে।
যুবদলের একাধিক নেতাকর্মী বলছেন, একসময়ে সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন যুবদল থেকে এখন হেভিওয়েট কোনো নেতা তৈরি হচ্ছে না। আংশিক কমিটির দুই বছর পার হলেও নেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি। এতদিন বৈরী পরিবেশের কথা বলা হলেও এখন সুসময়ে কমিটি দেওয়ায় বিলম্ব তারা মানতে পারছেন না। খোদ নেতাকর্মীদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে শক্তিশালী এই সংগঠনের সাংগঠনিক দুর্বলতা আগামীতে আরও প্রকট হতে পারে; যার নেতিবাচক প্রভাব পুরো বিএনপিকে বহন করতে হবে। এজন্য যত দ্রুত সম্ভব এই সংগঠনকে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে ঢেলে সাজানোর কোনো বিকল্প নেই।
যুবদলের সাবেক ১ম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘শৈশব থেকে বিএনপির আদর্শকে লালন করে আসছি। দলও আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে, পরিচিতি দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে। এজন্য জিয়া পরিবার, বেগম খালেদা জিয়া এবং জুলাই আন্দোলনের রূপকার তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা। কারণ প্রতিকূল অবস্থায়ও জিয়া পরিবার আমাদের পথ দেখিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে। এখন দলের যেমন সুদিন এসেছে, তেমনি অনেক চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের নেতা যার ওপর ভরসা করবেন, তাকেই সামনে আনবেন। আমরা তার সিদ্ধান্তকেই যথার্থ মনে করে আগামী দিনের পথ চলতে চাই।’
আরও পড়ুন: নেতারা সরকারে, ঝিমিয়ে পড়ছে দল!
শীর্ষ পদের জন্য আলোচনায় থাকা কামরুজ্জামান দুলাল ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জাতীয়তাবাদী যুবদলের সকল পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে। তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করে, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি চেয়ারম্যান সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি জানেন কাদের নেতৃত্বে আনলে যুবদল আবার শক্তিশালী হবে। কাদের হাতে যুবদল গেলে হাসিনা-পরবর্তী যে বদনাম অর্জিত হয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘সারা দেশে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে, কোথাও সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। যেসব কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে, সেগুলো একে একে দেওয়া হবে। সেখানে ত্যাগী ও পরীক্ষিতরা স্থান পাবেন। দলের আগামী কাউন্সিলের আগেই কমিটিগুলো পুনর্গঠন করা হবে।’
নতুন কমিটির শীর্ষ ২ পদে আলোচনায় যারা
জানা গেছে, যুবদলের সাবেক সিনিয়রদের মধ্য দিয়ে কমিটি হলে যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান ভালো অবস্থানে থাকতে পারেন। তবে তার ঢাকা মহানগর উত্তরের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আলোচনাই বেশি শোনা যাচ্ছে।
এ ছাড়া শীর্ষ পদে যাদের নাম আলোচনায় আছে তারা হলেন, সাবেক ১ম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন, সিনিয়র সহসভাপতি রেজাউল করিম পল, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক, সাবেক সহসভাপতি রুহুল আমিন আকিল, কামরুজ্জামান দুলাল, সাবেক সহসভাপতি মাহবুবুল হাসান পিংকু, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক এনামুল হক এনাম, ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশীদ মামুন, সাইদ ইকবাল টিটু।
আলোচনায় আরও আছেন- সাবেক সহ-শিল্পবিষয়ক সম্পাদক আসাদুল আলম টিটু, যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক শরীফ উদ্দিন জুয়েল, দক্ষিণের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, সাবেক ছাত্রনেতা ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল এবং কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ, দীপু সরকার।

জানা গেছে, শীর্ষ পদের জন্য বেশি আলোচনায় আছেন গোলাম মাওলা শাহীন। ২৮ অক্টোবরের আন্দোলন থেকে শুরু করে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ভূমিকার কারণে তিনি দলের হাইকমান্ডের গুডবুকে আছেন। একাধিকবার কারাবন্দিও থাকতে হয়েছে তাকে।
এ ছাড়া আলোচনায় যাদের নাম আছে, তাদেরও কেউ আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, কেউ আবার আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশি হামলার মুখে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের আমলে তাদের কারাগারেও যেতে হয়েছে।
হাইকমান্ডের হাতে পূর্ণাঙ্গ তালিকা
গত মাসে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে ১৫১ সদস্য ও ২৫১ সদস্যের ২টি কমিটি জমা দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। আংশিক কমিটির দেড় বছর পার হলেও সেই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা যায়নি। বর্তমানে ছয় সদস্যের আংশিক কমিটি দিয়ে সংগঠনটির কার্যক্রম চলছে।
বিএনপির একটি সূত্র বলছে, হাইকমান্ড ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করার নির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু যুবদলের নেতৃবৃন্দের চাওয়া কমিটি যেন ২৫১ সদস্যবিশিষ্ট হয়। এতে ত্যাগী, পরীক্ষিত ও বেশি সংখ্যক নেতাকে স্থান দেওয়া সম্ভব হবে।
যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদপ্রত্যাশী কয়েকজন নেতা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে আংশিক কমিটি বা সীমিত পরিসরের নেতৃত্বের কারণে অনেক ত্যাগী নেতা সাংগঠনিক পরিচয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে রাজপথে সক্রিয় থেকেও তারা প্রত্যাশিত মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। যখন বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলো পুনর্গঠনের আলোচনা চলছে, তখনই যুবদলের আংশিক কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তাদের এই দাবির বিষয় নিয়ে যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন। এরপরই পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া প্রস্তুত করে জমা দেওয়া হয়।
দলীয় সূত্র বলছে, শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে তার মেয়াদ হতে পারে ৫ থেকে ৬ মাস। তবে কমিটির সময় কমবেশি নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই পদপ্রত্যাশীদের। তারা চাচ্ছেন নিজেদের জন্য একটি সাংগঠনিক পরিচয়। কারণ চলতি বছরের শেষের দিকে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হওয়ার কথা রয়েছে। তার আগেই বিএনপির অঙ্গ সংগঠনগুলো পুনর্গঠন করা হবে।
যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যারা ডেডিকেটেড, ত্যাগী, পার্টির প্রতি বিশ্বস্ত-তারাই পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে জায়গা পাবেন।’
সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল হোসেন তারেক ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘কমিটি নিয়ে অনেক কথা শোনা যাচ্ছে। তবে দলের কাছে পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেওয়ার বিষয়টি জানি। আমরা দলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।’
বিইউ/এমআর