images

রাজনীতি

জামায়াত প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থি ইসলামী রাজনৈতিক দল: দ্য উইককে ডা. শফিক

ঢাকা মেইল ডেস্ক

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:০৭ পিএম

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জামায়াত প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থি ইসলামী রাজনৈতিক দল– যা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিল রেখে নিজেদের নীতিগুলো ক্রমাগত পরিমার্জন করেছে। আমরা সবসময়ই গণতান্ত্রিক ও জনমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আনুষ্ঠানিক জোট গঠনে বিএনপির অনিচ্ছা সত্ত্বেও জামায়াত একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠনের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে।’

ভারতের ইংরেজি ম্যাগাজিন ‘দ্য উইক’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। গত রোববার এক প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ প্রকাশ করে ম্যাগাজিনটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ‘দ্য উইক’-এর সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট এডিটর নম্রতা বিজি আহুজা। 

এই সাক্ষাৎকারে জামায়াতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের বিষয়ে দলের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন দলটির আমির শফিকুর রহমান। সাক্ষাৎকারটির নির্বাচিত অংশ নিচে তুলে ধরা হলো।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া, জামায়াতে ইসলামী কতটা প্রস্তুত?— এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির বলেন, যদিও কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাত্র কয়েক দিন আগে জামায়াতে ইসলামীর ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল, তবে বাস্তবে ২০১৩ সাল থেকেই দলকে কার্যত নিষিদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচার বিভাগের অপব্যবহারের মাধ্যমে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করা হয় এবং নির্বাচনের প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয়। 

আরও পড়ুন: সব ধর্মের মানুষকে বুকে ধারণ করে দেশ গড়তে চাই: জামায়াত আমির

ডা. শফিকুর বলেন, নিবন্ধন বাতিল, গণগ্রেফতার ও ভয়ভীতি সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামী কখনো জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। বিশেষ করে ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে আমাদের ফলাফল প্রমাণ করেছে, সংগঠন হিসেবে আমরা দৃঢ় ছিলাম এবং জনগণের সমর্থন আমাদের সঙ্গে ছিল। সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থান এবং আদালতের রায়ে জামায়াতের নিবন্ধন ও প্রতীক পুনর্বহালের পর আমাদের সমর্থকেরা নতুন করে উদ্দীপ্ত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে আমরা সক্রিয়ভাবে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আমাদের ছাত্রসংগঠনের বিজয় তরুণ ভোটারদের আস্থার প্রতিফলন। সেই অর্থে জামায়াতে ইসলামী শুধু প্রস্তুত নয়, আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।

নির্বাচনী রাজনীতি না থাকার বছরগুলো থেকে জামায়াত কী শিক্ষা নিয়েছে?- দ্য উইকের এই প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমির, আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থাকলেও জামায়াতে ইসলামী কখনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ থেকে সরে দাঁড়ায়নি। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আমরা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নিয়েছিলাম এবং যৌথ প্রতীকে নির্বাচন করেছি। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে, যখন গণতন্ত্রই হুমকির মুখে পড়ে, তখন গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ঐক্য অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, এই সময়গুলো শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীকে আরও শক্তিশালী করেছে। আমরা সাংগঠনিক কাঠামো সুসংহত করেছি, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা জোরদার করেছি এবং তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করেছি। পাশাপাশি সমসাময়িক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে আমাদের রাজনৈতিক কৌশল পুনর্মূল্যায়ন করেছি। জামায়াতে ইসলামী একটি প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী ইসলামি রাজনৈতিক দল, যা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নীতি ও কর্মসূচি পরিমার্জন করেছে। তবে গণতান্ত্রিক ও জনমুখী রাজনীতির ভিত্তি থেকে কখনো সরে যায়নি।

জামায়াতকে সাধারণত একটি ক্যাডারভিত্তিক মতাদর্শিক দল হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই আদর্শিক অবস্থানকে কীভাবে গণমানুষের নির্বাচনী সমর্থনে রূপ দিচ্ছেন?

জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী প্রকৃতপক্ষেই ক্যাডারভিত্তিক মতাদর্শিক দল। তবে আমাদের আদর্শের মূল হলো—শৃঙ্খলা, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং জনসেবা। জামায়াত তার গঠনতন্ত্র অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের দমনপীড়নের সময়েও আমরা অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রেখেছি।

তিনি আরও বলেন, আজকের দিনে দুর্নীতি ও সুবিধাবাদ রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করেছে, এই পরিস্থিতিতে মানুষ ধারাবাহিকতা ও সততাকে বেশি মূল্য দিচ্ছে। বিভিন্ন স্বাধীন জরিপে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে ভোটাররা কথার ফুলঝুরি নয়, নীতির রাজনীতি চান; সুযোগ সন্ধান নয়, বিশ্বাসযোগ্যতা চান। সেই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের আদর্শিক অবস্থান কোনো দুর্বলতা নয়, বরং আমাদের শক্তি।

তরুণ এবং নতুন ভোটারদের সম্পৃক্ত করার জন্য জামায়াত কীভাবে পরিকল্পনা করছে?

আরও পড়ুন: ক্ষমতায় গেলে আমাদের সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে: জামায়াত আমির

জবাবে জামায়াত আমির বলেন, দুর্নীতি, ব্যর্থ প্রতিশ্রুতি এবং অকার্যকর শাসনে হতাশ একটি প্রজন্মের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে মিলে যায়। তরুণেরা জীবনের উদ্দেশ্য, সততা ও সুযোগ খোঁজেন। জামায়াত মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প তুলে ধরে। এই সংযোগ ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দৃশ্যমান। আমাদের নীতিগত অগ্রাধিকার কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরির ওপর জোর দেওয়া, যাতে তরুণদের বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য না হয়ে দেশেই মর্যাদাপূর্ণ কর্মজীবন গড়া সম্ভব হয়।

তিনি বলেন, আমরা তরুণদের কোনো সমস্যা হিসেবে দেখি না, বরং জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখি। একই সঙ্গে আমরা জুলাইয়ের চেতনায় বিশ্বাস করি—যে সময় তরুণেরা গণতন্ত্র, জবাবদিহি ও স্বাধীনতার সংগ্রামে আত্মত্যাগ করেছেন।

জামায়াতের অতীত এখনো তাদের বর্তমানকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে... সমালোচকদের এমন বক্তব্যে বিষয়ে কী মনে করেন? 

জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমি এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই যে জামায়াতে ইসলামীর অতীত তার বর্তমানকে আড়াল করে রেখেছে। বাংলাদেশের মানুষ আমাদের ইতিহাস ভালোভাবেই জানেন এবং একাধিকবার ব্যালটের মাধ্যমে জামায়াতের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন। কোনো দলের অতীতকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করে বর্তমানের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ অস্বীকার করা উচিত নয়। তবে জামায়াত নৈতিক দায়বদ্ধতা ও সমঝোতায় বিশ্বাস করে। 

তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে আমি প্রকাশ্যে বলেছি, ১৯৪৭ সালের পর থেকে যদি কোনো জামায়াত সদস্যের কর্মকাণ্ডে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন, আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এটি আমাদের বিনয়, নৈতিক জবাবদিহি ও ন্যায়ের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট বা নির্বাচনী সমঝোতার জন্য জামায়াত কতটা উন্মুক্ত?

জবাবে জামায়াতের আমির স্পষ্ট করে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের জন্য রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সহযোগিতা অপরিহার্য। জামায়াত স্বল্পমেয়াদী সুবিধার চেয়ে নীতির ভিত্তিতে জোট গঠনের জন্য উন্মুক্ত।

আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তিনটি অ-আলোচনাযোগ্য নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত: জুলাইয়ের চেতনার প্রতি অঙ্গীকার এবং কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ; দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা; এবং জাতীয় স্বার্থ এবং জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয় এমন বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির প্রতি প্রকৃত অঙ্গীকার। এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্য রেখে, জামায়াত ইতিমধ্যে ১০টি রাজনৈতিক দলের সাথে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করেছে, যা আমাদের বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে যে জাতীয় পুনর্নবীকরণের জন্য আদর্শিক লাইন জুড়ে নীতিগত সহযোগিতা প্রয়োজন।

গণতন্ত্র, নারীর অংশগ্রহণ ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে জামায়াতের অবস্থান কী? কোনো নারী প্রার্থী নেই কেন? জানতে চাইলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের প্রতি দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দু হলো—ন্যায়বিচার, সমান নাগরিক অধিকার এবং সব বাংলাদেশির মানবিক মর্যাদা। এই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে জামায়াত হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যা সংখ্যালঘুদের বাস্তব প্রতিনিধিত্বের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারকে তুলে ধরে।

নারীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে জামায়াতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীরা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বর্তমান নির্বাচনে নারী প্রার্থী না থাকার কারণ হলো জোটভিত্তিক আসন বণ্টন, যেখানে প্রতিটি আসনে একজন করে প্রার্থী মনোনীত হয়েছেন। জোটসঙ্গী দলগুলোর যেসব নারী প্রার্থী আছেন, জামায়াত তাদের যৌথ প্রার্থী হিসেবে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে।

অতীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জামায়াত বহু নারী প্রার্থী দিয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রম ও নীতিনির্ধারণেও নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। আমাদের নীতিমালায় একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ জাতীয় সরকারের কথা বলা হয়েছে, যেখানে নারী, সংখ্যালঘু, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ সব স্তরে নিশ্চিত করা হবে।

সূত্র: দ্য উইক

এমএইচআর