জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকা-৯ আসনে (খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা) ভোটের হিসাব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। শেষ মুহূর্তের মনোনয়ন নাটক, জোটের অদল-বদল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর আবির্ভাব—সব মিলিয়ে এই আসনে এখন স্পষ্টভাবে একটি ত্রিমুখী নির্বাচনি লড়াইয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে। একদিকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, অন্যদিকে জোটসমর্থিত এনসিপির প্রার্থী, আর তৃতীয় শক্তি হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থী—এই তিন ধারায় ভাগ হয়ে গেছে ভোটের মাঠ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আলাদা অবস্থান, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর শুরুতে ঢাকা-৯ আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল বেশ সরব। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দলীয় সমীকরণে বড় পরিবর্তন আসে। বিএনপি ও জামায়াত—দুই দলই শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন ও মনোনয়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়, যা ভোটের অঙ্ককে পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। এর পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগ করে চিকিৎসক ও পরিচিত মুখ ডা. তাসনিম জারার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামার ঘোষণায় ভোটের মাঠে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
ঢাকা-৯ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব। শুরুতে এ আসনে তার নাম তেমন আলোচনায় না থাকলেও দলীয় প্রতীক পাওয়ার পর থেকেই তিনি দ্রুত মাঠে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। নিয়মিত গণসংযোগ, পাড়া-মহল্লায় সভা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি নিজেকে ভোটারদের সামনে তুলে ধরছেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তে সরে দাঁড়ান জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস। তার এই সরে দাঁড়ানো এবং দলীয় প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে বিএনপির ভেতরে সাংগঠনিক ঐক্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন অনেকে।
অন্যদিকে, নির্বাচনি সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে জামায়াতে ইসলামীর সিদ্ধান্তে। এই আসনে দলটির প্রার্থী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারে সক্রিয় ছিলেন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কবির আহমদ। নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে বিশেষ প্রচারণা, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প এবং সেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি এলাকায় বেশ পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছিলেন। তবে জোটগত সমঝোতার কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। একই সিদ্ধান্ত নেন খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মো. ফয়েজ বখশ সরকারও। হেভিওয়েট দুই প্রার্থীর মাঠ ছাড়ায় জামায়াত-সমর্থিত ভোটারদের একটি অংশ এখন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়েছেন।
জোটের পক্ষে ঢাকা-৯ আসনে প্রার্থী হিসেবে এনসিপি মনোনয়ন দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ জাবেদ মিয়াকে, যিনি জাবেদ রাসিন নামেও পরিচিত। তিনি ইতোমধ্যে প্রতিটি ওয়ার্ডে সরেজমিনে ঘুরে সাধারণ মানুষের সমস্যা জানার চেষ্টা করছেন বলে দাবি করেছেন। তবে তৃণমূল পর্যায়ের অনেক ভোটারের কাছে তিনি এখনো তুলনামূলকভাবে অপরিচিত মুখ। ফলে জামায়াত ও জোটসমর্থিত ভোট কতটা তার পক্ষে একীভূত হবে, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।
এই সমীকরণে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখা দিয়েছেন এনসিপি থেকে সদ্য পদত্যাগ করা স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. তাসনিম জারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত এই চিকিৎসক শুরুতে এনসিপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ছিল। তবে জোট রাজনীতির ঠিক আগ মুহূর্তে দল থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি ঢাকা-৯ আসনের ভোটের চিত্রে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেন। বিশেষ করে তরুণ ও শিক্ষিত ভোটারদের একটি অংশ তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
এই আসনে চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী করেছে দলের কেন্দ্রীয় নেতা শাহ ইফতিখার তারিককে। তিনি হাতপাখা প্রতীকে ভোট চেয়ে এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। এই আসনে দলটির উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোট আছে বলে দাবি নেতাদের।
সরেজমিনে খিলগাঁও, সবুজবাগ, মুগদা ও মান্ডা এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, নির্বাচনি আমেজ থাকলেও ভোটারদের মধ্যে রয়েছে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা। মুগদা-মানিকনগর ও মান্ডা এলাকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল অবস্থায় রয়েছে। মুগদা হাসপাতালের সামনের প্রধান সড়ক এবং ওয়াসা রোড দীর্ঘদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব সমস্যা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বছরের পর বছর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব সমাধান খুব কমই হয়েছে।
খিলগাঁও তালতলার বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী রাশেদ মাহমুদ বলেন, আমাদের এলাকায় ভোটের সময় এলেই অনেক প্রতিশ্রুতি শুনি, কিন্তু ভোট শেষ হলে আর কাউকে দেখা যায় না। রাস্তা, ড্রেনেজ আর যানজট—এই তিন সমস্যাই বছরের পর বছর একই রয়ে গেছে। এবার আমি তাকেই ভোট দিতে চাই, যিনি নির্বাচনের আগে নয়, নির্বাচনের পরও এলাকায় থাকবেন।
সবুজবাগ এলাকার গৃহিণী নাসরিন আক্তার বলেন, নারী ভোটার হিসেবে আমাদের সমস্যাগুলো কেউ আলাদা করে গুরুত্ব দেয় না। হাসপাতালের সামনে চলাচলের কষ্ট—এসব নিয়ে কথা বলার মানুষ দরকার। শুধু স্লোগান নয়, যে প্রার্থী বাস্তবে নারীদের জন্য কী করবেন, সেটা স্পষ্টভাবে বলবেন, তাকেই আমরা ভোট দেব।
দীর্ঘদিন পর ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ঢাকা-৯ আসনের ভোটারদের মধ্যে অংশগ্রহণের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে বারবার প্রার্থী বদল হওয়ায় অনেকেই বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ। কেউ কেউ পছন্দের প্রার্থী সরে যাওয়ায় নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার কেউ দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দেওয়ার কথাও ভাবছেন। প্রার্থীরাও ভোটারদের দরজায় দরজায় গিয়ে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
সব মিলিয়ে ঢাকা-৯ আসনে ভোটের লড়াই এখন স্পষ্টভাবেই ত্রিমুখী। জোট রাজনীতি, স্বতন্ত্র প্রার্থীর আবির্ভাব এবং ভোটারদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ—সবকিছু মিলিয়ে শেষ মুহূর্তে কার পাল্লা ভারী হবে, তা নির্ভর করবে কে কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে এলাকার সমস্যার সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরতে পারেন, তার ওপরই।
টিএই/জেবি