মোস্তাফিজুর রহমান
২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৩০ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শুরুর দিন থেকেই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যদিয়ে অতিবাহিত করছেন প্রার্থীরা। রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের মুখে একই সুর। নেতা বা প্রার্থী উভয়েই প্রতিপক্ষকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়াচ্ছে উত্তাপ। দিন যত গড়াবে এই উত্তাপ আরও প্রকট হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিষয়টিকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে দেখলেও রাজনীতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের’ মতো কিছু ঘটানোর অপচেষ্টা করতে পারে তৃতীয় পক্ষ। এজন্য নির্বাচনি মাঠে সব পক্ষকেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার দীর্ঘদিন ধরেই দেশের নির্বাচন নিয়ে কাজ করে আসছেন। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘পাল্টাপাল্টি বক্তব্য তো ঠিকই আছে। তারা তো প্রতিযোগী- তারা বক্তব্য দেবে, প্রতিপক্ষের সমালোচনা করবেই। তবে অন্যের সমালোচনা করার অধিকার আছে, সেই অধিকারেরও স্বীকৃতি দেওয়াটা জরুরি। সেটার ব্যাপারেই অনেক রকম আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে।’
১২ ফেব্রুয়ারি ভোটকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণা শুরু হয় বৃহস্পতিবার। সেদিন পৃথকভাবে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো।
এই নির্বাচনে সক্রিয় দুটি বড় জোট। একটি বিএনপির নেতৃত্বে। অতীতে দলটির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা গণঅধিকার পরিষদ, গণতন্ত্র মঞ্চের দলগুলোসহ বিভিন্ন দলকে নিয়ে গঠিত হয় আসন সমঝোতার এই জোট। অন্যটি নেতৃত্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তাদের নির্বাচনি জোটে আছে এনসিপিসহ ১০টি দল।
সিলেট থেকে বৃহস্পতিবার প্রথম দিন প্রচার শুরু করে বিএনপি। সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসার মাঠে জনসভা থেকে প্রচার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
প্রথম নির্বাচনি জনসভায় অভিযোগ তোলেন তারেক রহমান। বলেন আবার ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ষড়যন্ত্র হচ্ছে। জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বিএনপি প্রধান এটাও বলেন, একটা দল নির্বাচনের আগে মানুষকে ‘ঠকাচ্ছে’। ‘শুধু ঠকাচ্ছে না, মুসলমানদের শিরক করাচ্ছে,’ বলেও অভিযাগ তারেক রহমানের।
অন্যদিকে রাজধানীর মিরপুর ১০-এর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক জনসমাবেশের মাধ্যমে জামায়াতর নির্বাচনি প্রচার যাত্রা শুরু হয়। প্রথম জনসমাবেশেই বিএনপি ঘোষিত ‘ফ্যামেলি কার্ডের’ সমালোচনা করেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, তার দল কোনো কার্ডের ওয়াদা করবে না। তিনি এও বলেন, ‘দুই হাজার টাকায় কিছুই হয় না।’
ওই সমাবেশে বিএনপির সমালোচনা করেন জামায়াত জোটের নেতা ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘তারা তো আবার ক্ষমতায় গিয়ে লুট করবে।’ আজ শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দ্বিতীয় দিনের প্রচারে নেমেও বিএনপির সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের মাঝে ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্য ছড়াচ্ছে, ‘আতঙ্ক’ ছড়াচ্ছে।
এদিকে প্রচারের প্রথম দিন থেকেই অন্যান্য নেতা ও প্রার্থীদের মধ্যেও পারস্পারিক তর্কযুদ্ধ চলছে। ‘ঢাকায় বিএনপিকে কোনো সিট দেওয়া হবে না; জামায়াতের এক প্রার্থীর এমন মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা-৬ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইশরাক হোসেন হুমকি দিয়েছেন, ‘ইলেকশনের অনেক আগেই আমরা জামায়াতকে ঢাকা থেকে বিতাড়িত করে দেবো।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ঘোষণা দিই, তাহলে ঢাকা শহরে জামায়াতের প্রার্থী রাস্তায় নামতে পারবে না। সেটা জামায়াত হোক বা অন্য কেউ।’
নির্বাচনি প্রচারে প্রধান দুইপক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে যখন ‘রণপ্রস্তুতি’ দেখা যাচ্ছে ঠিক তখন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা মেইলকে বলেন, এটি আরও ‘প্রকট’ হবে। তিনি বলেন, ‘আই হোপ, তারা পরিপক্ষ। তারা বক্তব্য দেবে। তারা সমালোচনা করবেই। তবে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে তারা যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়।’
সুজন সম্পাদক বলেন, ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানে গণতন্ত্রের মূল্যবোধ। অর্থাৎ, পরের মতামতের ওপর শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীলতা হওয়া। অন্যের সমালোচনা সয়ে নেওয়া। অন্যকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত না করে তাকে প্রতিহত করার মানসিকতার ঊর্ধ্বে ওঠা।’
ড. বদিউল আলম বলেন, ‘যারা এমন দাবি করে যে আমরাই একমাত্র। আমরাই গুরুত্বপূর্ণ। আমাকেই নির্বাচিত ঘোষণা করা হোক, এই ধরনের মানসিকতা ক্ষতিকর। এটা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে যায় না।’
এই বিশ্লেষক বলেন, ‘আমি আশা করি, আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো এই ব্যাপারে দায়িত্ববান হোন এবং ওই আচরণ থেকে বিরত থাকেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ‘রাজনৈতিকভাবে একে অপরের ঘায়েল করতে গিয়ে পরিস্থিতি অবনতি হলে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্যই সুযোগ নিতে পারে। এটা দলের নেতা বা প্রার্থী উভয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে।’
এমআর/জেবি