শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

শতাধিক আসনে ফলাফল নির্ণায়ক হতে পারে প্রবাসী ভোট

মো. মেহেদী হাসান হাসিব
প্রকাশিত: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫৮ এএম

শেয়ার করুন:

postal vote
পোস্টাল ভোট। ছবি: এ আই দিয়ে তৈরি

এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে তারা ভোট দেবেন। তাদের পাশাপাশি ভোটের কাজে নিয়োজিত ও আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিরাও একই পদ্ধতিতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ইতোমধ্যে এই পদ্ধতি অবলম্বন করে ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন ১৫ লাখের বেশি ভোটার। পাঁচ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন এমন আসনের সংখ্যা শতাধিক। ধারণা করা হচ্ছে, এসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হলে ফলাফল নির্ণায়ক হতে পারে পোস্টাল ব্যালটের ভোট। 

ec-20251112170854


বিজ্ঞাপন


ইসি কর্মকর্তারা জানান, আগে পোস্টাল ব্যালট থাকলেও সেটি অকার্যকর ছিল। যার ফলে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা, ভোটের কাজে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইনি হেফাজতে থাকা ব্যক্তিরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বর্তমান কমিশন ও সরকার প্রবাসী ও ভোটের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ভোটাধিকার নিশ্চিতে অকার্যকর পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতিকে কার্যকর করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট পদ্ধতি নিয়ে এসেছে। যার ফলে প্রথমবারের মতো ১৫ লাখের বেশি নিবন্ধন হয়েছে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে। যেখানে শতাধিক আসনে পাঁচ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন। তারা ভোটের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট কী?

আগের অকার্যকর পোস্টাল ব্যালট কার্যকর করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও এমআইএসটির বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় এবং বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালটে ভোট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। যেখানে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে ভোট দিতে ইচ্ছুক ভোটাররা প্রথমে নিবন্ধন করবেন, এরপর নির্ধারিত ভোটারের ঠিকানায় ডাক বিভাগের মাধ্যমে ব্যালট পাঠানো হবে এবং ভোটপ্রদান শেষে তা আবার দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। এই পদ্ধতির কিছু অংশ আইটি সাপোর্টেড।

তাই এই পদ্ধতির নাম দেওয়া হয়েছে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট ভোটিং সিস্টেম। সেই অ্যাপেই ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮২ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন। এরমধ্যে ভোটের দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি চাকরিজীবী, কয়েদিরা দেশের ভেতর থেকে নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪০ জন। বাকিরা প্রবাসী ভোটার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির এক কর্মকর্তা জানান, অতীতে অনেক আসনে এক থেকে পাঁচ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়েছে। সেখানে এবার বলা যায় ভোটের ফল পাল্টাতে পোস্টাল ব্যালটের ভোট অতি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সব আসনের পোস্টাল ব্যালট গণনা করা হবে না। যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধান ওই আসনের পোস্টাল ব্যালটের চেয়ে কম হলে পোস্টাল ব্যালট গণনা করা হবে। অন্যথায় গণনা করা হবে না। 

17-20240629231248

উদাহরণ দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ধরি একটি আসনে দুজন প্রার্থী একজন ভোট পেয়েছেন ৮০টি, আরেকজন ভোট পেয়েছেন ৪০টি। তাহলে ভোটের ব্যবধান হলো ৪০টি। এক্ষেত্রে ওই আসনে যদি পোস্টাল ব্যালটে ভোটের সংখ্যা ৪০-এর বেশি হয় তাহলে তা গণনা করা হবে। আর কম হলে তা গণনা করা হবে না।
কোন আসনে কত পোস্টাল ভোট?

পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন করা হয়েছে ফেনী-৩ আসনে, ১৬ হাজার ৯৩ জন নাগরিক। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১৪ হাজার ৩০১ জন, কুমিল্লা-১০ আসনে ১৩ হাজার ৯৭৭ জন, নোয়াখালী-১ আসনে ১৩ হাজার ৬৫৮ জন, নোয়াখালী-৩ আসনে ১২ হাজার ৮২৯ জন, ফেনী-২ আসনে ১২ হাজার ৭৯৭ জন, কুমিল্লা-১ আসনে ১২ হাজার ৫৮৩ জন, সিলেট-১ আসনে ১২ হাজার ৪৫৮ জন, কুমিল্লা-৫ আসনে ১২ হাজার ৩৭৩ জন, কুমিল্লা-৬ আসনে ১১ হাজার ৯৪৩ জন, চাঁদপুর-৫ আসনে ১১ হাজার ৮৫২ জন, নোয়াখালী-৫ আসনে ১১ হাজার ৬৭৫ জন, ফেনী-১ আসনে ১১ হাজার ২৪৬ জন, কুমিল্লা-৯ আসনে ১১ হাজার ১৮৫ জন।

১০ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন এমন চারটি আসন হলো—কক্সবাজার-৩, নোয়াখালী-৪, কুমিল্লা-৪, লক্ষ্মীপুর-২।

নয় হাজারের বেশি ভোটার রয়েছে নয়টি আসনে। এগুলো হলো— লক্ষ্মীপুর-৩, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩, কক্সবাজার-১, কুমিল্লা-৩, সিলেট-৬, মুন্সীগঞ্জ-৩, চাঁদপুর-৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪, নোয়াখালী-২।

আট হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন এমন আসন সংখ্যা ১০টি। সেগুলো হলো—ঢাকা-৮, মুন্সীগঞ্জ-১, চাঁদপুর-৩, চাঁদপুর-২, কুমিল্লা-১, কুমিল্লা-৮, ঢাকা-১, ঢাকা-১৮, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫, রাজবাড়ী-২।

সাত হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন এমন আসন সংখ্যা ১১টি। সেগুলো হলো—সিলেট-৫, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩, চাঁদপুর-১, চট্টগ্রাম-২, ঢাকা-১৫, কিশোরগঞ্জ-২, কুমিল্লা-২, যশোর-২, ঝিনাইদহ-২, লক্ষ্মীপুর-১, পার্বত্য খাগড়াছড়ি।

ছয় হাজারের বেশি ভোটার রয়েছে এমন আসন সংখ্যা ২১টি। এগুলো হলো—নরসিংদী-৫, যশোর-৩, চট্টগ্রাম-৫, চট্টগ্রাম-১৬, মৌলভীবাজার-৩, বরিশাল-৫, শরীয়তপুর-২, নারায়ণগঞ্জ-৩, চট্টগ্রাম-১, মৌলভীবাজার-১, কিশোরগঞ্জ-১, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১, ঢাকা-১০, বরগুনা-১, ময়মনসিংহ-৪, সাতক্ষীরা-২, নরসিংদী-৪, সিলেট-৩, চট্টগ্রাম-১০, মাদারীপুর-৩, ঢাকা-৯।

পাঁচ হাজারের বেশি ভোটার রয়েছে ৪৬টি আসনে। এগুলো হলো—ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, ঢাকা-১৭, চট্টগ্রাম-১১, লক্ষ্মীপুর-৪, চট্টগ্রাম-৭, সাতক্ষীরা-১, মুন্সীগঞ্জ-২, ফরিদপুর-৪, কুমিল্লা-৭, টাঙ্গাইল-৬, ঢাকা-২০, ঢাকা-১৩, চট্টগ্রাম-৮, মৌলভীবাজার-২, সুনামগঞ্জ-৫, ঢাকা-১৯, টাঙ্গাইল-৮, ঝিনাইদহ-৩, গাজীপুর-৪, টাঙ্গাইল-৩, পার্বত্য রাঙ্গামাটি, চুয়াডাঙ্গা-১, ঢাকা-১৪, চট্টগ্রাম-১৪, টাঙ্গাইল-৫, মাদারীপুর-২, ময়মনসিংহ-১০, রাজশাহী-২, খুলনা-৩, রংপুর-৩, গাজীপুর-২, মানিকগঞ্জ-২, চুয়াডাঙ্গা-২, যশোর-৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬, কিশোরগঞ্জ-৬, চট্টগ্রাম-৪, মাগুরা-১, বরিশাল-২, নেত্রকোণা-২, শরীয়তপুর-১, রাজবাড়ী-১, মাগুরা-২, টাঙ্গাইল-২, বরগুনা-২, শরীয়তপুর-৩।
পাঁচ হাজারের নিচে কিন্তু এক হাজার ৫০০ ভোটারের বেশি নিবন্ধন করেছেন এমন আসনের সংখ্যা ১৭৬টি। সবচেয়ে কম নিবন্ধন হয়েছে বাগেরহাট-৩ আসনে এক হাজার ৫৯৫ জন।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে প্রবাসী ভোটারদের ভোটগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মাধ্যমে প্রবাসী ভোটারদের কাছে মোট ৭ লাখ ৬৭ হাজার ৮৪টি ব্যালট পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৭ লাখ ৭ হাজার ৫০০টি ব্যালট সংশ্লিষ্ট দেশে পৌঁছেছে এবং এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৭৩ জন ভোটার ব্যালট হাতে পেয়ে কিউআর কোড স্ক্যান করেছেন। তবে ভুল ঠিকানার কারণে ৪ হাজার ৫২১টি ব্যালট ফেরত এসেছে, যার বেশির ভাগই মালয়েশিয়া থেকে।


ইসি সানাউল্লাহ বলেন, ইলেকটোরাল ইন্টেগ্রিটি রক্ষায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। পোস্টাল ব্যালট নিয়ে কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, জাতীয় পরিচয়পত্র ব্লক এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দেশ থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দেশের ভেতরে ভোটের জন্য ব্যালট এখনো পাঠানো হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ ও চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর দেশীয় ভোটের ব্যালট ছাপানো ও বিতরণ শুরু হবে। প্রয়োজনে প্রবাসীদের জন্যও ‘অ্যাকচুয়াল ব্যালট’ পাঠানোর সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।

তফসিলের অনুযায়ী, আগামী ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত শুনানি নেবে কমিশন। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। আর ভোট গ্রহণ করা হবে ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত।

এমএইচএইচ/জেবি/এমআই

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর