images

মতামত

হোল্ডিং সেন্টার, পুশইন, পুশব্যাক ও বাঙালি সত্তায় দুর্দশা

ঢাকা মেইল ডেস্ক

১৩ জুন ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় হোল্ডিং সেন্টার চালু করা হয়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইতোমধ্যে নারী ও শিশুসহ অনেককে এই হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে আটকে রাখা হয়েছে। এখানে যাদেরকে আনা হচ্ছে বলা হচ্ছে এরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, এরা বাংলাদেশের নাগরিক, এরা বাংলায় কথা বলে, এরা মুসলমান।

‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (শনাক্ত, তালিকা থেকে বাদ এবং ফেরত পাঠানো) নীতির অংশ হিসেবে হোল্ডিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। বলা হচ্ছে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আওতায় বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা সন্দেহভাজনদের এখানে রাখা হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের পরিচয় যাচাই ও প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ইতোমধ্যে ভারতীয় সীমন্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফ রাতের অন্ধকারে বা সুযোগ বুঝে তাদেরকে বাংলাদেশের সীমানায় পুশ-ইন করা শুরু করেছে বা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।  অন্যদিকে বাংলাদেশের বিজিবি ও স্থানীয়রা পুশ-ব্যাকের মাধ্যমে প্রতিহত করে যাচ্ছে। সীমান্তে চলছে টানটান ইত্তেজনা।

ইতিহাসে দেখা যায়, জার্মানির নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বা বন্দিশিবির মানবসভ্যতার অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে পরিচিত। ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে ইহুদি, রোমা, কমিউনিস্ট, বিরোধী মতাদর্শের ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে আটক করার জন্য এগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। প্রথমদিকে এগুলো রাজনৈতিক বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হলেও পরে তা গণহত্যার যন্ত্রে পরিণত হয়। 

ভারতের হোল্ডিং সেন্টারগুলোতে নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের মত নির্যাতনের খবর এখনও গণমাধ্যমে আসেনি। তবে ইতোমধ্যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা শুরু হয়েছে। মানুষকে জোরপূর্বকভাবে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। নারী, শিশু ও বয়স্কদের সীমান্তের শূন্যরেখায় (জিরো লাইন) পরিত্যক্ত অবস্থায় রেখে যাওয়া হচ্ছে। প্রচণ্ড রোদ–গরম, ঝড়বৃষ্টি ও পানির মধ্যে তাদের জীবন সংকটাপন্ন হচ্ছে, যা বিষয়টিকে মানবিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। 

বলা যেতে পারে নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ও ভারতের হোল্ডিং সেন্টারের মধ্যে একটা কাঠামোগত মিল রয়েছে। নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে জাতিগত ও বর্ণগত বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নাৎসিরা নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ মনে করত এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠীকে নিম্ন বা বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। অন্যদিকে বাংলাদেশি, বাঙালি বা মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ, সন্দেহ বা ঘৃণা থেকে হোল্ডিং সেন্টার চালু হয়েছে।  এর সাথে যোগ হয়েছে শ্রেণি সংঘাত কেননা সমাজের দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষদের আগে সেখানে আনা শুরু হয়েছে।

অবস্থার পেক্ষাপটে এমনটাই মনে হচ্ছে দুই বাংলার বাঙালিদের মধ্যে বিভেদের ফাটলটা যেন দীর্ঘ হচ্ছে। ১৯৪৭ সালের ভারত ভাগকে কেন্দ্র করে একটা বিরোধ তৈরি হয়েছিল, এরপর নানা সময়ে ছোটখাট সমস্যা হলেও, বর্তমান সময়ের মত সম্পর্কের এমন অবনতি কোন সময় ঘটেনি। ওপার বাংলার অনেকে বাংলা ও বাঙালি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরব হলেও তারা বর্তমানে চাপের মধ্যে আছে। 

আরও পড়ুন

স্বজনপ্রীতি ও আঞ্চলিকতা জাতীয় ঐক্যের অন্তরায়

একতরফাভাবে পুশ-ইন আন্তর্জাতিক আইন ও স্বীকৃত কূটনৈতিক রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ হলেও তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কিছু নিয়ম আছে।  আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, পারস্পরিক সম্মতি ও নির্ধারিত প্রটোকলের (সঠিক পরিচয় যাচাই, গ্রহণকারী রাষ্ট্রের সম্মতি এবং নির্ধারিত সীমান্ত চেকপয়েন্টের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর) ভিত্তিতে সেটা হওয়া উচিত। তাছাড়া কোনো ব্যক্তিকে অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে সন্দেহ করা হলে পরিচয় নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আটক, শুনানি এবং প্রত্যাবাসনের স্বীকৃত আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশ কাউকে সন্দেহ হলেও হোল্ডিং সেন্টার ও বিএসএফের কাছে পাঠাতে হবে এবং তাদেরকে জোর করে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে।

ভারতের গদি মিডিয়া এমন ধরনের সংবাদ ও সাক্ষাতকার প্রচার করছে যে বাংলাদেশের নাগরিকরা বিভিন্ন সুবিধার আশায় অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিল, এখন তারা দেশে ফেরার জন্য সীমান্তে জড়ো হচ্ছে। তবে এটা বিবেচনার বিষয় যে, চরম বিপদে থাকা মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলতে পারে বা পন্থা অবলম্বন করতে পারে।

 নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোর চরম অমানবিক নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য মানুষ নিজেদের পরিচয়, জাতি, বয়স, দক্ষতা ও পরিচয় গোপন করত বা বদলে ফেলত। নাৎসিরা যেটা প্রত্যাশা করত বন্দীরা সেই ধরনের আচরণ করত। 

ছিন্নমূল-অসহায় মানুষের কাগজপত্র থাকে না

বিশাল ভৌগোলিক এলাকা জুড়ে ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও ভূপ্রকৃতির পার্থক্যের কারণে ভারতকে বৈচিত্র্যময় দেশ বলা হয়। তবে সবচেয়ে বড় বৈচিত্র্য রয়েছে ধনী আর গরিবের মধ্যে। একদিকে রয়েছে যেমন বড় বড় ধনকুবের, ঝকঝকে অট্টালিকা, শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স আর স্টেডিয়ামের গ্যালারির নাচানাচি আর চিৎকার। অন্যদিকে রয়েছে ফ্লাইওভারের নীচে, ফুটপাতে, পার্কে, বস্তিতে, নিভৃত পল্লীতে বুভুক্ষু মানুষের হাহাকার। ভারত ক্রমেই অসম আয়ের দেশ হয়ে উঠছে, দীর্ঘ হচ্ছে গরীব-অসহায় মানুষের লাইন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শীর্ষ ১০ শতাংশ ভারতীদের আয় এখন দেশটির মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশের সমান; যা ১৯৯০ সালে ছিল ৩৪ শতাংশ। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আয় মোট জনসংখ্যার আয়ের ২২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে নেমে ১৫ শতাংশে ঠেকেছে। ২০১৪ সালে আদানী গ্রপের সে সম্পদ ছিল ২০২৬ সালে এসে দেখা যাচ্ছে তার কয়েক লক্ষ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপি’র একটি প্রতিবেদন বলা হয়েছে, চরম দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের ১১০টি কোটি মানুষ।  শুধু ভারতের দেশটির ১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে ২৩ কোটি ৪০ লাখই চরম দারিদ্র্যে দিন কাটায়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের তালিকায় ১২৭টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১০৫ নম্বরে। ভারতের চেয়ে অনেক ভাল অবস্থায় রয়েছে প্রতিবেশী বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো দেশ। ভারতে অপুষ্টির হার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণের দেশগুলো অর্থাৎ আফ্রিকার দরিদ্রতম দেশগুলোর চেয়ে খারাপ। সাহারার উনিশটি দেশের শিশুদের মধ্যে এর হার ৩৪%, অথচ ভারতে ৩৬%। মাথাপিছু আয় ও মানব উন্নয়নের সূচকের ক্ষেত্রেও ভারত নিঃশব্দে পিছিয়ে যাচ্ছে। ২০২৩-২৪ সালে প্রকাশিত হিউম্যান ডেভলপমেন্ট রিপোর্ট  অনুযায়ী,  ১৯৩টি দেশের মধ্যে ভারত ১৩৪তম স্থানে, ভারতের চেয়ে ভাল অবস্থায় ১২৯তম স্থানে ভুটান, ১২৫তম স্থানে বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা ৭৮তম স্থানে। ইন্ডাস ভ্যালি অ্যানুয়াল রিপোর্ট-২০২৫ অনুযায়ী ভারতের প্রায় ১০০ কোটি মানুষেরই পছন্দসই পণ্য কেনা বা সেবা গ্রহণের মতো পর্যাপ্ত অর্থের অভাব রয়েছে।

India1
ভারতের খোলা একটি হোল্ডিং সেন্টার। ছবি: সংগৃহীত

এমন অবস্থার মধ্যে সুযোগসুবিধার অভাবে ভারতের মুসলিমরা অনেক বেশি পিছায়ে পড়ছে। ভারতের সর্বশেষ (২০১১) আদমশুমারী অনুযায়ী, মুসলিম জনগোষ্ঠী দেশের মোট জনসংখ্যার ১৪.২৩%। অথচ সরকারি চাকরিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যার অনুপাতে অনেক কম (সম্ভবত ২%)।

এটা স্বীকৃত সত্য যে, অনেক সচেতন মানুষ আবাসস্থলের সংকট, বন্যা, ঝড়সহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের কারণে কাগজপত্র রাখতে পারেনা। আর সেখানে ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষ যাদের নুন্যত্তম মাথা গোঁজার জায়গা নেই তারা কীভাবে আইডি কার্ড, পাসপোর্ট, দলিল বা নানা ধরনের কাগজপত্র রাখবে সেটাও বিবেচনার বিষয়। আর  কাগজপত্রের ত্রুটি থাকলে তারা বাংলাদেশের নাগরিক, জোর করে পাঠিয়ে দিতে হবে!  

ভারতের বাসিন্দাদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা

অনেক সময় কিছু মানুষ উন্নত জীবনের আশায় উন্নত দেশগুলোতে যেতে চায়। তবে যেখানে ভারত ছেড়ে সেই দেশের মানুষের অন্য দেশে যাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি, সেখানে বাংলাদেশের  মানুষ ভারতে বসবাসে আগ্রহী হবে এমনটাই ভাবা অপ্রাসঙ্গিক।

ভারত ছেড়ে মানুষের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা সেই ব্রিটিশ আমল থেকে। মরিশাস, ফিজি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বিভিন্ন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোতে কাজের জন্য ভারতীয়রা যেত। যে কারণে এসব দেশে এখনও হিন্দিভাষী মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তবে সম্প্রতি সময়ে অন্য দেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য ভারত ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। ভারত সরকাররের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১ সালের পর থেকে এখনও পর্যন্ত ১৭ লক্ষের বেশি ভারতীয় সম্পূর্ণভাবে তাদের নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছে। গড়ে প্রতিদিন ইচ্ছে করেই ৬১৮ জন ভারতের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে।  ২০২২ সালে ৭ লক্ষ ৭০ হাজার ভারতীয় ছাত্র বিদেশে পড়তে গিয়েছিল। বিদেশ থেকে পড়া শেষ হলে ৯০ শতাংশ ছাত্রই আর দেশে ফিরে আসেনি।  ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য এবং নিরাপত্তার কারণে ভারতীয়রা অন্য দেশের নাগরিক হচ্ছে।

আরও পড়ুন

বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন অর্জন, গৌরবের সঙ্গে বর্তাবে দায়িত্বও

তাছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় দেওয়া বিভিন্ন আর্থিক বা বস্তুগত সহায়তা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষ ভারতে ভিড় জমাবে এমনটাও ভাবা অপ্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের সব সরকারই দরিদ্র মানুষের উন্নয়নে কাজ করে এবং ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ ১,৪৪,৩৩৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশের এমনও এলাকা আছে যেখানে সুবিধাভোগীর হার শতভাগ।

কোনো ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ নিদিষ্ট ভূখণ্ডে আবদ্ধ থাকে না

বিষয়টি এমন নয় ভাষা ও সংস্কৃতি কাঁটাতারের বেড়া বা প্রাচীরের মধ্যের নিদিষ্ট কোন ভূখণ্ডে আবদ্ধ থাকে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় বাঙালিরা পূর্ব পাকিস্থান বা বর্তমানের বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও আসামের বরাক উপত্যকায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া মেঘালয়, বিহার, উড়িষ্যা ও আন্দমান নিকবোর দ্বীপপুঞ্ছে ও পাকিস্থানের করাচীতে কমবেশি বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। আবার কর্মসংস্থানসহ নানা কারণে ভারতের অংশের বাঙালিরা বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

হোল্ডিং সেন্টারে ও পুশ-ইনের জন্য যাদের কে আনা হচ্ছে দেখে মনে হয় তারা শ্রমজীবী, দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ, বাঙালি জনগোষ্ঠীর। তবে তারা কোন এলাকার সেই পরিচয় শনাক্ত করে সমাধানের দায়িত্ব ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের। বাঙালিরা উত্তর ভারত, ইরান-তুরান ও আরব থেকে আসেনি। এই অঞ্চলের নিভৃত পল্লীতে যে স্থানীয় অনার্য জনগোষ্ঠীর লোক বাস করত তাদের থেকে এসেছে। তারা প্রথমে কেউ হিন্দু বা মুসলমান ছিল না। পরে এক সময় কেউ হিন্দু হয়েছে, কেউ মুসলমান হয়েছে।

১৮৭২ সালের ব্রিটিশ ভারতের প্রথম আদমশুমারী ও ১৯০১ সালের দ্বিতীয়  আদমশুমারীতে বাঙালি মুসলমানদের জাতিগত বিষয়টি সামনে আসে। প্রথম আদমশুমারীর সাথে জড়িত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকারী কর্মকর্তা জেমস ওয়াইজ এ বিষয়ে লেখেন যে, ‘১৮৭২ সালের আদমশুমারীতে উদঘাটিত সব চাইতে কৌতুহলোদ্দীপক তথ্যটি হলো পুরনো রাজধানীগুলোর চারদিকে জড়ো হয়ে নয়, বরং নিভৃত পল্লীতে বিপুল সংখ্যক মুসলমান বসবাস করে’। আদমশুমারির প্রতিবেদনের সঙ্কলক হেনরি বেভারলি যুক্তি দেখান, বাংলায় মুসলিম শাসক ও তাদের সাথে আগত লোকদের বংশবিস্তারের কারণে এটা ঘটেনি, বরং স্থানীয়দের ধর্মান্তরের কারণেই এটা ঘটেছে।  

১৯০১ সালের আদমশুমারীর প্রতিবেদনে ই.এ. গেইট উপসংহার টানেন যে, নিজেদের সম্প্রদায়গত পরিচয় জানতে চাওয়া হলে বাঙালি মুসলিম কৃষকের দশ ভাগের নয় ভাগই স্থানীয় বংশোদ্ভুত বলে উল্লেখ করেন। অভিবাসন আদৌ ঘটেছিল কি না সে বিষয়েও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।

১৮৮১ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, স্থানীয় দরিদ্র কৃষক শ্রেণীর লোকদের ধর্মান্তরিত হওয়ার কারণে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দও একই কথা বলেছেন, ‘অতীতের অনেকে এবং ইদানিংকালের কেউ কেউ মুসলমানদের ‘বিদেশী’ বলে আখ্যাত করে থাকেন। মুসলমান শাসনের প্রথম দিকে যারা ভারত আক্রমণ করেছিল তারা বিদেশী ছিল। তবে তারা ছিল মুষ্টিমেয়। কিন্তু সাধারণ মুসলমানরা বহিরাগত না। আক্রমণকারীও না। এইসব মুসলমানরা পুরোপুরিই ভারতীয় (স্থানীয়) জনসমাজের”।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক  রিচার্ড ম্যাক্সওয়েল ইটন, যিনি রিচার্ড এম ইটন নামে পরিচিত। দীর্ঘ  গবেষণার পর  ১৯৯৩ সালে ‘রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দা বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার-১২০৪-১৭৬০’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, মুসলিমরা ৫০০ বছর শাসন করলেও প্রথম ৪০০ বছরে বাংলার মুসলিম জনসংখ্যা তেমন বাড়েনি। শেষ ১০০ বছরে মোঘল আমলে বিশেষ করে আকবরের সময়ের কিছু নীতি, কৌশলগত পদক্ষেপ ও প্রাকৃতিক কারণে বাঙালি জনগোষ্ঠীর লোকেরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং মুসলিম জনসংখ্যা বেড়ে যায়। তিনি তার গ্রন্থে এমন ৫০টি স্থানীয় গোত্রের কথা উল্লেখ করছেন।

১৯৪৭ সালের আগে তিনটি নৃতাত্ত্বিক সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছিল।  প্রথম সমীক্ষাটি ১৯৩৮ সালে ইলেন ম্যাকফারলেন চব্বিশ পরগনা জেলায় পরিচালনা করেন।  এর তিন বছর পর আবারও চব্বিশ-পরগনা জেলাতেই আরেকটি রক্তের গ্রুপের বন্টন বিষয়ক সমীক্ষা পরিচালনা করেন বি কে চ্যাটার্জি এবং এ কে মিত্র। সব সমীক্ষা থেকে সর্বসম্মত ভাবে সিধান্তে আসে বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্ভব স্থানীয় ও আদিবাসী গোত্র এবং তফশিলী অমুসলিম সম্প্রদায় থেকে। বাইরের শিয়া ও সুন্নীদের থেকে নয়। তাছাড়া বলা যেতে পারে সম্প্রতিকালের হাড়গোড়সহ বিভিন্ন ধরনের আধুনিক নৃতাত্ত্বিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এ বিতর্ক অনেকটা শেষ হয়েছে।

তবে বিষয়টি এমন নয় যে ইরান-তুরান বা বাইরের থেকে কোন মুসলিম আসেনি। এসেছিল তবে তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। যেসব বহিরাগত মুসলিমরা এসেছিল তারা ছিল মূলত নগরকেন্দ্রিক। পুরোনো রাজধানীগুলোর চারদিকে জড়ো হয়ে বসবাস করত। প্রত্যন্ত গ্রামে তারা যেত না এবং পেশা হিসাবে কৃষি ছিল তাদের অপছন্দের। আবার তাদের একটা বড় অংশ ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি বা অর্থ উপার্জন করে ফিরে যেত। এই অঞ্চল এতই দুর্গম ও সুযোগসুবিধার অভাব ছিল যে বাইরের লোক এসে এখানে স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে পারত না। মোগলদের অনেক লোক মারা গেলে মোগলদের বাংলা শাসন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়ে ছিল। ইংরেজ আমলে একটা কথা প্রচলিত ছিল ‘two rains’ অর্থাৎ এক বর্ষা পার করে দ্বিতীয় বর্ষা দেখার অনেকের সুযোগ হত না। 

India2
সীমান্তে বিরাজ করছে উত্তেজনা। ছবি: সংগৃহীত

আর বহিরাগতরা যারা থেকে গিয়েছিল তারা স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতিকে অনেক সময় প্রভাবিত করেছে কিন্তু পরিবর্তন করতে পারেনি। এক সময় নিজেরাই স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায়। এক সময় এই অঞ্চলে উত্তর ভারত থেকে ব্রাহ্মণরা এসেছে, আবার এক সময় মুসলিমরাও এসেছে।  তাবে তারা সবাই বউ বা স্ত্রী সাথে করে নিয়ে এসেছিল এমন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় না। স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করে এখানেই ঘর সংসার শুরু করত। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, এই অঞ্চলে যারা মা হয়েছে তারা সবাই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ছিল। আর ভাষা ও সংস্কৃতিতে মায়েদের প্রভাব থেকেই যায়। আমরা মাতৃভাষা বলি, পিতৃভাষা বলি না।

তাছাড়া এটা ইতিহাস স্বীকৃত যে, আর্য বা ব্রাহ্মণদের আদি নিবাস মধ্য এশিয়ায়। তারা এক সময় ইরান-আফগানিস্তান হয়ে ভারত উপমহাদেশে এসে বিকাশ লাভ করেছে। আর্যরা এসে ভারতের ফাঁকা মাঠ দখল নেয়নি। এখানে জনবসতি ছিল। আর যারা বহিরাগত মুসলিম তারাও একইভাবে সেই পথে এসেছে। কেউ আগে আর কেউ পরে। আর  স্থানীয়রা কেউ মুসলিম হয়েছে, আর কেউ হিন্দু হয়েছে। অতএব কেউ কারোর বাড়া ভাত কেড়ে নেয়নি, আর এ সব নিয়ে বাড়াবাড়ি করার সুযোগও নেই।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ কেন ‘আদর্শ রাষ্ট্র’ হতে পারছে না?

অনেকের ধারণা, মুহাম্মদ বিন কাসিম, মুহাম্মদ ঘোরি ও ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজীর মতো লোকেরা এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম নিয়ে এসেছিল, এই ধরনের ভুল ধারণা থেকে সরে আসা উচিত। তাদেরক কারণে হয়ত মুসলিমরা সাহস পেয়েছিল কিন্ত তাদের কারণে এই অঞ্চলের মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে তার নজির খুবই কম।   মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা:) ৬১০ সালে  ইসলাম প্রচার শুরু করে এবং এই সময়েই ভারতে এমনকি বাংলায় উপকূল অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম এসে পৌঁছায়। মহানবী (সা:) সাথে দেখা করে কেরালা রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত কোনডাংগালুর  রাজা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ভারতের সঙ্গে আরবদের ব্যবসায়ী সম্পর্ক অত্যন্ত প্রাচীন, যে কারণে আরবের মত প্রথম থেকে এই অঞ্চলেও ইসলাম প্রচার শুরু হয়। ইসলামের ২য় খলিফা হজরত উমরের (রা.) সময় (৬৩৫-৪৫)  ধর্ম প্রচারের জন্য একদল লোক বাংলায় এসেছিলেন। লালমনিরহাটের পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নে ৬৮৯ খ্রিস্টাব্দের একটি মসজিদেরও ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে।

সব বাঙালির সচেতন হওয়া উচিত

উপমহাদেশের এই অঞ্চলে দেখা যায় একই গ্রাম একই পাড়া বা মহল্লায় বংশ পরস্পরায় বাস করে আসছে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। একই আকাশ-বাতাস, ফসলের মাঠ, রাস্তাঘাট, স্নানের পুকুর, হাটবাজার, খাবারের দোকান, পানীয় জলের উৎস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সবই একই। কোন সমস্যা নেই, দুই সম্প্রদায়ের লোকই যুগের পর যুগ ব্যবহার করে চলেছে। তবে কোন সময় কোন সমস্যা হয়নি এমনটাও বলা যাবেনা।  অনুসন্ধানে দেখা যায় সেসব সমস্যার পিছনে ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তি স্বার্থ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি ধর্মকে ব্যবহার করে ভারতের ক্ষমতায় এসেছিল আর এই ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার জন্য আবার ধর্মকে একের পর এক ব্যবহার করে যাচ্ছে। মুসলিমদের উপাসনাস্থল ধ্বংস, খাদ্য-খাবার ও পোশাকের উপর নিষেধাজ্ঞা, পাঠ্যপুস্তক থেকে মুসলিমদের নাম বাদ দেওয়া থেকে শুরু করে তৈরি করছে নানা ধরনের আইন। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ), এনআরসি, ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল ও পশু জবাই নিয়ে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে রয়েছে সাম্প্রদায়িকতার ছায়া।

সম্প্রতি ভারতের নামকরা প্রত্রিকা দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজেপি এখন আসামের উগ্র হিন্দুত্ববাদী মডেল পশ্চিমবঙ্গে প্রয়োগ শুরু করছে। উত্তর ও মধ্য ভারতে হিন্দুত্বের উত্থানের প্রবণতা শুরু হয় মধ্যযুগীয় মসজিদগুলোকে মন্দির দাবি করা  ও তা পুনরুদ্ধারের নামে তৎপরতা বৃদ্ধি ও গরু নিয়ে রাজনীতি করে। আর পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিজেপির উপাদান হচ্ছে অনুপ্রবেশেকারী, বাঙালি মুসলিম আর বাংলাদেশ।

ধর্মের নামে হিংসা আর ঘৃণার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে, যুদ্ধ বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে আসলে কোন ধর্মের কোন উপকার হয় না । বরং বিশেষ গোষ্ঠী উপকৃত হয়।   ৪৬/৪৭ সালের  উপমহাদেশের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা সেটা মনে করিয়ে দেয়। সরকারি হিসাবে এই দাঙ্গায় নিহতের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ আর বেসরকারি হিসাবে ১২ লাখ। দুই কোটির বেশি মানুষ তাদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। ইতিহাসের ভয়াবহ এই  দাঙ্গায় নিরহ মানুষের প্রাণ গিয়েছিল, দাঙ্গাকারীদের তেমন কিছু হয়নি।

সন্ন্যাসী, দার্শনিক ও লেখক স্বামী বিবেকানন্দ, যিনি একজন বাঙালিও ছিলেন, আমেরিকার শিকাগো শহরে বিশ্বধর্ম সম্মেলনে (১৮৯৩) হিন্দুধর্মের বৈদান্তিক রূপকে বিশ্ববাসীর সামনে প্রথমে সহজ ভাবে তুলে ধরেন। এই ধর্মগুরু বার বার উল্লেখ করেছেন, হিন্দু-মুসলিম সমন্বয়, প্রেম, প্রীতি সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির কথা। হিন্দু-মুসলমান সংহতির ক্ষেত্রে, উভয় সমাজকেই নিজের পরিচয়ের ক্ষুদ্রতাকে অতিক্রম করতে হবে। হিন্দু-মুসলমানের যুগ্ম সাধনাই এই অঞ্চালকে এক উন্নত, সুসংহত জীবনের ধারণা দিতে পারে। কিন্তু সেসব কথাগুলো আজ ভারতে উপেক্ষিত।   আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান।’

উত্তর ভারতের ও প্রভাবশালী ভারতীয়দের কুটকৌশলে বাঙালিরা যে দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। একসময়ের বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র  কলকাতার জনসংখ্যার বেশির ভাগ এখন অবাঙালি। ভুলে গেলে চলবেনা ১৯৪৬ সালের কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অবাঙালিরাই বিষয়টিকে চরম পর্যায় নিয়ে গিয়েছিল, যার ঢেউ গিয়ে পড়ে ছিল নোয়াখালীতে। এমন অবস্থায় সব বাঙালির এখন সচেতন হওয়া উচিত। শুধু ধর্মের কারণে বাঙালি হয়ে অন্য বাঙালির সর্বনাশ করা বা অন্য বাঙালির ঘর দেখায়ে দেওয়া থেকে বিরত হওয়া উচিত।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী