আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো দেশের মর্যাদা শুধু তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামরিক শক্তি কিংবা ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই দেশের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা অর্জনের সক্ষমতা এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন। এ গুরুত্বপূর্ণ মনোনয়ন যুগোপযোগী এমন একটি সঠিক সিদ্ধান্ত যা বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর দূরদর্শিতা ও বিশ্ব নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতার প্রমাণ বহন করে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বিশ্বের প্রায় সব স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক ফোরাম। এই পরিষদের সভাপতির পদ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়; বরং বৈশ্বিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক নানা প্রশ্নে আলোচনা ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এই পদে কোনো দেশের প্রতিনিধির নির্বাচিত হওয়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে সেই দেশের প্রতি আস্থারই প্রতিফলন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করার একটি দীর্ঘ যাত্রা রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে আজকের উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে উত্তরণের পেছনে যেমন অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি কাজ করেছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পক্ষে ধারাবাহিক অবস্থান, দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা এবং বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে শক্তিশালী করেছে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রয়েছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি একটি নতুন বাস্তববাদী দিকনির্দেশনা লাভ করে। মুসলিম বিশ্ব, দক্ষিণ এশিয়া, পূর্ব এশিয়া এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করে। জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি, বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং উন্নয়ন সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপের ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সময়ের এই অর্জনকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক কূটনীতির সাফল্য সাধারণত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার ফল। বিভিন্ন সরকারের সময়ে গড়ে ওঠা সম্পর্ক, পেশাদার কূটনীতিকদের প্রচেষ্টা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধারাবাহিক উপস্থিতি এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক গ্রহণযোগ্যতা মিলেই এমন সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে। একই সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মহলের কার্যকর ভূমিকাও কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদের সাথে স্বীকৃতি পাওয়ার দাবি রাখে।
তবে আন্তর্জাতিক কোনো পদে বিজয়কে শুধু জাতীয় গৌরবের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশ্বিক নতুন দায়িত্বের সূচনা। কারণ বর্তমান বিশ্ব এক জটিল সময় অতিক্রম করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, জলবায়ু সংকট, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক ঋণসংকট, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন বাস্তবতা বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ পদে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের জন্য যেমন মর্যাদার, তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ দায়িত্বেরও।
বিজ্ঞাপন
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রোহিঙ্গা সংকট। প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়দাতা হিসেবে মানবিক দায়িত্ব পালন করে আসছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ও অর্থায়ন ক্রমশ কমে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব এ সংকটের টেকসই সমাধানের প্রশ্নটি পুনরায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। জলবায়ু ক্ষতিপূরণ, অভিযোজন অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রশ্নে উন্নয়নশীল বিশ্বের দাবিগুলোকে আরও জোরালোভাবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও এই অর্জন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ, বৈশ্বিক বাণিজ্যে ন্যায্যতা এবং টেকসই উন্নয়নের প্রশ্নে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে পারে।
তবে আন্তর্জাতিক মর্যাদা অর্জনের প্রকৃত ভিত্তি দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি। সুশাসন, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলো শক্তিশালী না হলে আন্তর্জাতিক সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিশ্বমঞ্চে সম্মান অর্জন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, সেই সম্মানের উপযোগী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাও তেমনি জরুরি।
ড. খলিলুর রহমানের এই বিজয় নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। এটি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতার একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কিন্তু এই অর্জনের প্রকৃত তাৎপর্য নির্ধারিত হবে ভবিষ্যতে এর সদ্ব্যবহার কতটা করা যায় তার ওপর। জাতীয় স্বার্থ, বৈশ্বিক ন্যায়বিচার এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে বাংলাদেশ যদি এই সুযোগকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, তবে এই সাফল্য কেবল একটি কূটনৈতিক বিজয় হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভূমিকার নতুন অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে।
আরও পড়ুন
বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের বড় অর্জন
গৌরবের সঙ্গে তাই দায়িত্বের কথাও স্মরণ রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক আস্থা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ; সেই আস্থাকে অর্থবহ ফলাফলে রূপান্তরিত করাই এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদেরকে আন্তরিক ভাবে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বিশ্বের নেতৃত্ব প্রদানে এ গুরু দায়িত্বকে একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সুযোগ বারবার নাও আসতে পারে।
আল্লাহ তায়ালা মেহেরবানি করে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে আমাদেরকে তাওফিক দান করুন। বিশ্ব নেতৃত্ব প্রদানে যথাযথ যোগ্যতা আমাদেরকে দান করুন।
জাতিসংঘের নবনির্বাচিত সভাপতি জনাব ডক্টর খলিলুর রহমান এবং মনোনয়ন দানকারী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান এর প্রতি প্রাণঢালা অভিনন্দন ও আন্তরিক শুভেচ্ছা। উভয়ের দীর্ঘায়ু ও সাফল্য কামনা করি।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী




