Dhaka Mail Logo

জাতীয়

‘চড়া কর’ গিলে খাচ্ছে আয়, স্বজনদের চাপে দিশেহারা জাপানপ্রবাসীরা

বোরহান উদ্দিন

০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৯ এএম

# আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপে জাপানপ্রবাসীরা

# পার্টটাইম কাজে সময়ের কড়াকড়ি, আছে পরিবারের চাপ

# এজেন্সির প্রলোভন ও প্রতারণায় ঋণের বোঝায় জর্জরিত শিক্ষার্থীরা

# ইমিগ্রেশনের কঠোর নজরদারি, নিয়ম ভাঙলে ভিসা বাতিলের ঝুঁকি

মাস চারেক আগে কয়েক লাখ টাকা ব্যাংকঋণ নিয়ে এবং জমি বন্ধক রেখে স্টুডেন্ট ভিসায় জাপানে পাড়ি জমান মুশফিকুর রহমান। স্বপ্ন ছিল, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে নিজের ভাগ্য বদলাবেন, পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু জাপানে পা রাখার পর সেই স্বপ্নের সঙ্গে কঠিন বাস্তবতার ব্যবধান বুঝতে পারেন তিনি। প্রত্যাশা আর বাস্তবতার টানাপোড়েনে এখন মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে দিন কাটছে এই তরুণের।

জাপানের রাজধানী টোকিওতে একটি রেস্তোরাঁয় খণ্ডকালীন (পার্টটাইম) কাজ করে মুশফিকুর রহমান যা আয় করেন তার সিংহভাগই চলে যায় বাসা ভাড়া, টিউশন ফি আর সরকারের নানা ট্যাক্স মেটাতে। মাস শেষে নিজের খাবারের খরচ চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে দেশে টাকা পাঠানো প্রায় অসম্ভব। অথচ দেশে থাকা পরিবারের ভাবনা ছেলে জাপানে গেছে, প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠাবে। স্বজনদের এই চাপ আর জাপানের চড়া ব্যয়ের জাঁতাকলে পড়ে এখন চরম দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই তরুণ। টোকিওর একটি মেট্রো স্টেশনে আলাপ করার সময় ঢাকা মেইলের প্রতিবেদকের সামনে এভাবে নিজের অবস্থার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশি এই তরুণ।

japan-1শুধু মুশফিকুরই নন, জাপানে থাকা এমন হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তব চিত্র এমনই। যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন, জাপানে পা রাখার পর সেই স্বপ্নের সঙ্গে অনেকের বাস্তবতা মিলছে না। চড়া কর, আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার ব্যয়, এবং স্বজনদের প্রত্যাশা, এজেন্সির প্রতারণা এবং ভিসা হারানোর শঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে তাদের চাপ। ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে জাপানে যাওয়া অনেক তরুণের কাছে এখন টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ।

সাতবছর ধরে জাপানে পরিবার নিয়ে বসবাস করা আবুল খায়ের ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘জাপানে কাজ করা গেলে টাকা আয় করার সুযোগ আছে। কিন্তু বাধ্যতামূলক যেসব খাতে ট্যাক্স দিতে হয় আর নিজেদের খরচ মেটানোর পর আসলে টাকা রাখা কঠিন। এখানে যে যেমন কাজই করুক ট্যাক্স তাকে দিতেই হবে। ব্যাংক থেকে প্রয়োজনে অটোমেটিক কেটে নেবে। কিন্তু পরিবারের লোকজন বাস্তবতা বুঝতে চায় না।’

চায়ের কাপে আড্ডার অন্তরালে চড়া খরচের ধাক্কা

সম্প্রতি সরেজমিন রাজধানী টোকিওর ব্যস্ত এলাকা শিনওকোবেতে চোখে পড়ে প্রবাসীদের এমন টানাপোড়েনের দৃশ্য। এলাকাটিতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের যাতায়াত বেশ চোখে পড়ার মতো। শিনওকোবোয়ে মেট্রো স্টেশনের কাছেই ঢাকার ফকিরাপুল এলাকার সুমন মিয়ার ছোট্ট একটি চা-সিঙ্গারার দোকান রয়েছে। দেড় দশক ধরে জাপানে থাকা সুমন মিয়ার এই কয়েক স্কয়ার ফিটের দোকানটির পেছনেই মাসিক ভাড়া গুণতে হয় প্রায় ৩ লাখ ইয়েন (জাপানি মুদ্রা)।

japan-4জাপান সফরের এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় সুমন মিয়ার দোকানে দেখা মেলে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার কিছু তরুণ শিক্ষার্থীর। চায়ের কাপে গল্প জমলেও আড্ডার আড়ালে কাজ করছে অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা। দোকানটিতে সামান্য একটি সিঙ্গারা আর একটি পেঁয়াজু খেতেই খরচ হয় ৪০০ ইয়েন, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৫০ টাকা!

সুমন মিয়ার দোকানের পাশের গলিতে বাংলাদেশি এক প্রবাসীর রেস্তোরাঁয় গিয়ে শুধু এক বাটি পাতলা ডাল খেতেও গুণতে হয় একই পরিমাণ টাকা। নিত্যদিনের খাবারের এমন আকাশছোঁয়া দামই বলে দেয়, সাধারণ একজন শিক্ষার্থীর জন্য জাপানে টিকে থাকা কতটা কঠিন।

অনেকেই দেশীয় খাবারের স্বাদ নিতে এই হোটেলে খেতে আসেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সামান্য ভর্তা-ডাল দিয়ে ভাত খেতেও এখানে ১ হাজার ইয়েনের মতো খরচ হয়। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৯শ টাকা।

‘দ্য গ্রেট জাপানিজ স্ক্যাম’ ও এজেন্সির ফাঁদ

এদিকে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পরপরই একশ্রেণির দালাল ও এজেন্সির চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে অনেক শিক্ষার্থী জাপানে পাড়ি জমাচ্ছেন। এজেন্সির কথায় ভুলে পরিবারগুলো চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সন্তানদের পাঠালেও প্রবাসে এসে বিপদে পড়ছেন তারা।

টোকিওর ওহানাজায়াতে আইটি বিষয়ে পড়াশোনা করা কুমিল্লার তরুণ মোহাম্মাদ সাকিব হাসান বলেন, জাপানে জীবনযাত্রার মান নিঃসন্দেহে চমৎকার। কিন্তু পকেটে টাকা না থাকলে এই প্রবাস জীবন দ্রুতই জাহান্নামে পরিণত হবে।

japan-5

সাকিব জানান, বাংলাদেশে জাপানি ভাষার ‘এন-৩’ (N3) কোর্স করতে খরচ হয় মাত্র ৬০ হাজার টাকা, সময় লাগে সাত মাস। অথচ এজেন্সিগুলোর পরামর্শে জাপানে এসে একই কোর্স ল্যাংগুয়েজ স্কুলে করতে শিক্ষার্থীদের খরচ করতে হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ লাখ টাকা! সাকিব এটাকে আখ্যা দিয়েছেন 'দ্য গ্রেট জাপানিজ স্ক্যাম' বা জাপানি শিক্ষার ফাঁদ হিসেবে।

জানা গেছে, জাপানে বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার বাংলাদেশি কাজ করছেন, যার অর্ধেকই শিক্ষার্থী। এজেন্সিগুলোর মিথ্যা আশ্বাসে পড়ে অনেকেই এখন দেনার দায়ে জর্জরিত।

পার্টটাইম কাজে আইনি কড়াকড়ি ও খরচের হিসাব

প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাপানে পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করার সুযোগ থাকলেও তাতে রয়েছে কঠোর আইনি সীমারেখা। শিক্ষার্থী ভিসায় আয় করতে হলে প্রথমত নিতে হয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি। আর এই অনুমতির ভিত্তিতে একজন শিক্ষার্থী সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২৮ ঘণ্টা খণ্ডকালীন কাজ করতে পারেন। শহরাঞ্চলে ঘণ্টায় সর্বনিম্ন ১২৭০ ইয়েন মজুরি হিসাব করলে পরিশ্রমের পর একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে বৈধভাবে মাসে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪০ হাজার ইয়েন আয় করা সম্ভব।

তবে এই আয়ের বিপরীতে খরচের তালিকা বেশ লম্বা। জাপানে শেয়ারিং বাসা বা ছোট ফ্ল্যাটের জন্য মাস শেষে দিতে হয় ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ইয়েন বা তারও বেশি। খরচ বাঁচাতে অনেক সময় এক কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতে হয় পাঁচজন শিক্ষার্থীকে। এর ওপর গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেটের মতো ইউটিলিটি বিল বাবদ বের হয়ে যায় আরও ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ইয়েন। নিজে রান্না করে খেলে খাবারের পেছনে মাসে অন্তত ৩০ থেকে ৪০ হাজার ইয়েন ব্যয় হয়, যা বাইরে খেলে তিনগুণ পর্যন্ত হতে পারে। সেই সঙ্গে যোগ হয় বাস বা ট্রেনের চড়া ভাড়া। কারণ জাপানে বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ১৯০ ইয়েন। আর ট্রেনে সর্বনিম্ন ভাড়া গুনতে হয় ২০০ ইয়েন।

বেতনের বড় অংশ যায় ট্যাক্সে

শিক্ষার্থীদের আয়ের ওপর সরকারি করের চাপ আরেক বড় সমস্যা। বেতনের টাকা হাতে পাওয়ার আগেই কেটে নেওয়া হয় সামাজিক বীমা (স্বাস্থ্য বীমা ও পেনশন) এবং আয়কর। দ্বিতীয় বছর থেকে এর সঙ্গে যুক্ত হয় 'রেসিডেন্স ট্যাক্স', যা আগের বছরের আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ।

সব মিলিয়ে আইনি সীমার মধ্যে থেকে যা আয় হয়, তা দিয়ে নিজের খরচ ও সেমিস্টারের টিউশন ফি দেওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পরিবারকে টাকা পাঠানো তো দূরের কথা, নিজের খরচ চালানোই দায় হয়ে দাঁড়ায়।

অবশ্য সুবিধা হলো- স্বাস্থ্য বীমা ও পেনশনের জন্য মাসে কেটে নেওয়া ট্যাক্সের সুবিধা পুরোপুরি পেয়ে থাকেন তারা।

japan-3জাপানের চিবা এলাকার ইনাগেতে বসবাস করা মৌসুমী ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘এখানে ট্যাক্স দিতে হয় ঠিক কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী তার সুবিধাও পাওয়া যায়। দ্বিতীয় সন্তান জন্মের সময় অনেকদিন হাসপাতালে থাকায় প্রায় ৯ লাখ টাকার মতো বিল এসেছিল। আমাদের মাত্র ২ লাখ ইয়েন দিতে হয়েছে। বাকিটা বীমা কভার করেছে। পেনশনের ক্ষেত্রেও ঠিকঠাক পাওয়া যায়। জাপান থেকে চলে এলেও নিয়মমাফিক পেনশনের টাকা দিয়ে দেয়।’

২০০৮ সাল থেকে জাপানে থাকা মাইনুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে আক্ষেপ করে বলেন, জাপানে নতুন-পুরানো বলে কোনো কথা নেই। এখানে সবার জন্য নিয়ম আছে। তা মানতে বাধ্য। খুব বেশি বেতনের ভালো চাকরি কিংবা ব্যবসার বাইরে এখানে মাস শেষে টাকা হাতে রাখা কিংবা পরিবারকে দেওয়া কঠিন। কিন্তু পরিবার কিংবা আত্মীয়-স্বজনরা বাস্তবতা বুঝতে চেষ্টা করেন না। এদিকে ঝড় বইছে, কিন্তু তাদের প্রত্যাশা কমে না। এতে প্রবাসীরা মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজও করতে পারে না।’

ইমিগ্রেশনের কড়া নজরদারি ও ভিসা বাতিলের ঝুঁকি

হিরোশিমা ইউনিভার্সিটিতে জনস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণারত ডা. জিয়াউর রহমান জানান, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো প্রতারণা করে না। তবে নতুন সরকার আসার পর কাজের ক্যাটাগরি ও নিয়মনীতি পালনে ইমিগ্রেশন ভীষণ কঠোর হয়েছে।

বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের অনিয়ম ঠেকাতে নজরদারি আরও বাড়ানো হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে চালু হওয়া নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতি তিন মাস পর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের শিক্ষার্থীদের কাজের সময় ও স্থানের হিসাব রাখতে হবে।

japan-2

দূতাবাসের এক কাউন্সিলর ঢাকা মেইলকে জানান, ‘সপ্তাহে ২৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করলে ওই শিক্ষার্থীর ভিসা না বাড়িয়ে মাত্র দুই সপ্তাহের সময় দিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া এক বিষয়ে ডিপ্লোমা করে অন্য বিষয়ে কাজ নিলে (যেমন: মেকানিক্যাল পড়ে কৃষিতে কাজ করা) ভিসা মিলছে না।’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এজেন্সিগুলো মাসে ২-৩ লাখ টাকা আয়ের যেসব চটকদার বিজ্ঞাপন দেয়, তা পুরোটাই ভুয়া। ঋণ শোধ করতে গিয়ে বেশি কাজ করলে ক্লাসে উপস্থিতি কমে যায়, আর এতে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে খালি হাতেই দেশে ফিরতে হয়। তাই জাপান যাওয়ার আগেই সতর্ক থেকে সবকিছু জেনে বুঝে আসা উচিত।’

বিইউ/এমআর