মোস্তফা ইমরুল কায়েস
০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০১ পিএম
মিরপুরে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলেন দুই শতাধিক ব্যক্তি। তাঁদের বেশির ভাগই ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অবস্থান করে আন্দোলনে উসকানি দিয়েছেন। এ জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে দলভিত্তিক দায়িত্ব দিয়ে লোকজন ঢাকায় আনা হয়েছিল। তাঁদের অধিকাংশই রাজনৈতিক কর্মী। এই আন্দোলনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতাকর্মীরাও জড়িত বলে তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনা তদন্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং ডিবি ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নেপথ্যে ছিলেন দুই শতাধিক ব্যক্তি
ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, মিরপুরের আন্দোলনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১১ জনসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া জামায়াতের কয়েকজন কর্মীকে আটক করা হয়েছে। তবে তাঁদের কারও সাংগঠনিক পদ-পদবি নেই। এখন পর্যন্ত এই আন্দোলনে দুই শতাধিক ব্যক্তি নেপথ্যে থেকে ইন্ধন, অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছেন বলে তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে ডিবি।
গ্রেফতার হওয়া নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ডিবি। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, আন্দোলনে নাশকতা, পুলিশের ওপর হামলা, কারখানা ভাঙচুর ও জ্বালাও-পোড়াওয়ের জন্য তাঁদের টাকা দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া লোকজন সংগ্রহ করে আন্দোলনে নিয়ে আসার জন্যও অর্থ দেওয়া হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা আরও জানিয়েছেন, মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনের জন্য কর্মী জড়ো করা, তাঁদের ঢাকায় আনা, স্লোগান শিখিয়ে দেওয়া এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের কেউই প্রকৃত শ্রমিক নন বলে জানা গেছে। তাঁরা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী বলে স্বীকার করেছেন। তাঁদের কেউই ঢাকায় থাকেন না।
ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, মিরপুরের আন্দোলনে দুই শতাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাঁরা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন, তবে সবাই মাঠে ছিলেন না। তাঁরা সার্বক্ষণিক নির্দেশনা দিয়েছেন, স্লোগান তৈরি করেছেন এবং কোন প্রতিষ্ঠানে কখন হামলা হবে, কোথা থেকে আন্দোলন শুরু হবে ও কোথায় শেষ হবে, সেসব বিষয়ে পরিকল্পনা করেছেন। এমনকি আন্দোলন কখন শেষ হবে, সেই ছকও তৈরি করা হয়েছিল। ফলে শ্রমিক আন্দোলনের নামে পরিকল্পিতভাবে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আন্দোলনে জড়িত প্রত্যেককে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত ৪০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। তবে মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে দেওয়া হতো নির্দেশনা
মিরপুরের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের আন্দোলনের আগে টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করা হয়েছিল। এরপর তাঁদের নিয়ে বৈঠকও হয়। কে কোথায় থাকবেন, কীভাবে আন্দোলনে অংশ নেবেন এবং কার কী দায়িত্ব থাকবে, সেসব বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোলা গ্রুপগুলোতে নির্দেশনা দেওয়া হতো।
গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে জব্দ করা মুঠোফোনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁরা যেসব বার্তা ও ছবি মুছে ফেলেছেন, সেগুলো উদ্ধারের জন্য ফোনগুলো ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষার কথা ভাবছে ডিবি।
ছবি পাঠালেই মিলত টাকা
ডিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১১ জনের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা আন্দোলনের সময় ছবি তুলে তাঁদের বড় ভাইদের কাছে পাঠাতেন। প্রতিটি ছবির জন্য দেওয়া হতো নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা।
অনেকে টাকার লোভে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন এবং ভাঙচুর ও জ্বালাও-পোড়াওয়ে জড়িয়েছেন। পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপের মতো কর্মকাণ্ডের ছবিও তুলে পাঠিয়েছেন তাঁরা। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের কথোপকথন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
দলভিত্তিকভাবে লোক সংগ্রহ
মিরপুরের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, আন্দোলনের সময় যাতে সবাই একসঙ্গে পুলিশের হাতে গ্রেফতার না হন, সে জন্য তাঁদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। ফলে তাঁরা একেকজন একেক সময় আন্দোলনে অংশ নিতেন। কেউ স্লোগান দিতেন, কেউ ভাঙচুর করতেন, আবার কেউ ইটপাটকেল নিক্ষেপে যুক্ত ছিলেন।
আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য তাঁদের দলভিত্তিকভাবে ঢাকায় আনা হয়েছিল। প্রতিটি দলে ১৫ থেকে ২০ জন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে দলনেতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি দলের অন্য সদস্যদের পরিচালনা করতেন।
নেপথ্যে আওয়ামী লীগের নেতারা
গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া চার দিনের আন্দোলনে ভাঙচুর, জ্বালাও-পোড়াও ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাগুলো পরিকল্পিত ছিল বলে মনে করছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এসব ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ ও তাঁর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহর নাম এসেছে। আলিফকে মাঠপর্যায়ে লোক সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে ডিবির সূত্রে জানা গেছে। তিনি দেশেই অবস্থান করছেন। তাঁকে খুঁজছে ডিবি।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচির সংশ্লিষ্টতাও পেয়েছে ডিবি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলম এবং তাঁর সহযোগী মাহবুবুর রহমান জুয়েলও এই ঘটনায় জড়িত বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকায় সমন্বয়ের কাজে জুয়েলকে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁদের কেউ কেউ দেশের বাইরে অবস্থান করে অর্থায়ন করেছেন, আবার কেউ অনলাইন গ্রুপের মাধ্যমে নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁরা কেউই বর্তমানে দেশে অবস্থান করছেন না।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে বলেন, অনেকের তথ্য ও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। সব মিলিয়ে এই আন্দোলনে দুই শতাধিক ব্যক্তি কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে নেপথ্যে থেকে কাজ করেছেন বলে তথ্য রয়েছে। এঁদের অধিকাংশই দেশে অবস্থান করছেন।
এমআইকে/এআর