একে সালমান
২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৮ পিএম
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযান চলছে, জব্দ করা হচ্ছে অবৈধ দোকানপাটের মালামাল। অভিযানের পর কিছু সময়ের জন্য স্বস্তি ফিরছে পথচারীদের চলাচলে, যানবাহনও পাচ্ছে নির্বিঘ্নে চলার সুযোগ। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হচ্ছে না। অভিযান শেষ হতে না হতেই, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগেই উচ্ছেদ হওয়া জায়গায় আবার বসছে দোকানপাট। ফুটপাতের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যবসার পসরা ছড়িয়ে পড়ছে সড়কের ওপর। ফলে যানজট, পথচারীদের দুর্ভোগ ও জনভোগান্তি ফিরে আসছে আগের চেহারায়।
একদিকে দখলমুক্ত করার উদ্যোগ, অন্যদিকে একই স্থানে পুনর্দখল-মোহাম্মদপুরের এই চিত্র উচ্ছেদ অভিযানের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের অভিযোগ, দখল সরানোর পাশাপাশি তা ঠেকাতে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় বারবার অভিযান চালিয়েও পরিস্থিতির দৃশ্যমান পরিবর্তন হচ্ছে না।
বাসিন্দারা বলেন, সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার স্থায়ী পরিকল্পনা না থাকায় অভিযান অনেক ক্ষেত্রে সাময়িক ফলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সরেজমিন মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।
মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকানপাট। বিশেষ করে বিকেল থেকে সন্ধ্যায় মানুষের চলাচল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুটপাতের বড় অংশ চলে যায় দোকানিদের দখলে। ফলমূল, সবজি, পোশাক, জুতা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। এতে ফুটপাত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের সুযোগ কমে যায়। বাধ্য হয়ে পথচারীদের নামতে হয় মূল সড়কে। অন্যদিকে সড়কের একাংশ দোকানপাট, ক্রেতা ও পণ্যবাহী ভ্যানের দখলে থাকায় ব্যাহত হয় যানবাহনের চলাচল। তৈরি হয় যানজট, বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, মোহাম্মদপুর আল্লাহ করীম মসজিদ থেকে তিন রাস্তার মোড় পর্যন্ত সড়কে চলাচল করা যায় না। সন্ধ্যা হলেই সড়কের ওপর দোকানপাট বসিয়ে রাস্তা দখল করে নেওয়া হয়। এই সড়কের তিনটি লেনজুড়েই দোকান বসে। মাঝেমধ্যে দিনের বেলা সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশ এসে সড়কে রাখা খালি ভ্যান উচ্ছেদ করে। কিন্তু এতে স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না।
উচ্ছেদ অভিযানের সময় দোকানিরা মালামাল সরিয়ে নিলেও অভিযান শেষ হওয়ার পর আবার আগের জায়গায় ফিরে আসেন। ফলে একই স্থান বারবার দখলমুক্ত করতে হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান চালিয়েও দখল ঠেকানো না গেলে জনভোগান্তি কমানো কঠিন। তাই উচ্ছেদের পাশাপাশি সড়ক ও ফুটপাত পুনর্দখল ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি এবং স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
কাদেরাবাদ হাউজিং এলাকার বাসিন্দা তুষার উদ্দিন স্বপন ঢাকা মেইলকে বলেন, সড়কের ওপর কয়েক লেনে দোকানপাট বসায় কোনোভাবে সড়কে হাঁটা যায় না। স্থানীয় প্রশাসন ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সকাল সকাল এসে উচ্ছেদ করে যায়। কিন্তু বিকেল হলেই আবারও সড়ক দখল করে দোকানপাট বসে। এতে পথচারীদের চরম ভোগান্তি দেখা যায়। এসব দোকানপাটের নেপথ্যে বড় একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। যারা নিয়মিত দোকানিদের কাছ থেকে দৈনিক হিসেবে দোকান ভাড়া আদায় করছে। যার ফলে প্রশাসন সকাল বেলা লোক দেখানো উচ্ছেদে নামে। এতে বাসিন্দা কিংবা পথচারীদের কারও কোনো উপকার হয় না।
এই বাসিন্দা আরও বলেন, ফুটপাত মূলত পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্মিত। কিন্তু ফুটপাত দখল হয়ে গেলে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী মানুষের চলাচল সবচেয়ে বেশি বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাদের ব্যস্ত সড়ক দিয়ে হাঁটতে হয়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে। প্রতিদিন নানা দুর্ঘটনার পর প্রশাসন সড়ক থেকে এসব দোকানপাট সরিয়ে সড়ক দখলমুক্ত রাখতে কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় না।
মোহাম্মদপুরের চাঁন মিয়া হাউজিংয়ের বাসিন্দা লুৎফুর রহমান জুয়েল ঢাকা মেইলকে বলেন, বিকেলের পর বাজারকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দোকান, ক্রেতা, রিকশা, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহন একই জায়গায় চলাচল করায় সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। জরুরি প্রয়োজনে চলাচলকারী যানবাহন বাধার মুখে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, এছাড়া দোকানপাটের সামনে জমে থাকা বর্জ্য ও পণ্য পরিবহনের কারণে হাঁটাচলা করা যায় না। বিভিন্ন স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতকারী শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন প্রতিনিয়ত। প্রকাশ্যে এমন ভোগান্তি নিয়ে কখনো কেউ কথা বলে না। কেউ এসব নিধনে এগিয়ে আসেনা। স্থানীয় প্রশাসন ম্যানেজ করেই সড়ক দখল করা হয় নিয়মিত।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সড়কজুড়ে গড়ে ওঠা এসব অস্থায়ী দোকানপাটের নেপথ্যে রয়েছে বড় ধরনের চাঁদাবাজি। দোকানপ্রতি প্রতিদিন ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয় ব্যবসায়ীদের। এ ছাড়া দোকান বসানোর জন্য অগ্রিম হিসেবে দিতে হয় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করীম মসজিদ থেকে তিন রাস্তার মোড়, টাউন হল ও রিং রোড এলাকা পর্যন্ত সক্রিয় রয়েছে চাঁদাবাজির একটি চক্র। এই চক্রের সদস্যরা দোকানিদের কাছ থেকে দৈনিক ও মাসিক চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি দোকান বসানোর জন্য অগ্রিম টাকাও নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ভয়ে এসব বিষয়ে মুখ খুলতে চান না দোকানি কিংবা স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, কেউ প্রতিবাদ করলে নেমে আসে নির্যাতন ও হুমকি। এমনকি প্রতিবাদকারীদের কুপিয়ে জখম করা এবং হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করীম মসজিদের পাশে সবজির দোকান করেন রবিন মিয়া (ছদ্মনাম)। ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, ‘আমাকে প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ভ্যানে সবজি বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয়। এ জন্য অগ্রিম হিসেবে ৭ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। প্রতিদিন লাইন খরচ বাবদ দিতে হয় ১৫০ টাকা। আমি যে লেনে দোকান বসাই, তার সামনে ও পেছনে আরও দুটি লেন রয়েছে। একেবারে মূল সড়কের ওপর সর্বশেষ যে লেনটি বসে, সেখানকার দোকানিদের অগ্রিম হিসেবে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। তাদের প্রতিদিন ৩০০ টাকা করেও দিতে হয়। ওই লেনে বিক্রি বেশি হওয়ায় খরচও বেশি।’
রিং রোড এলাকার ব্যবসায়ী তারা মিয়া (ছদ্মনাম) ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘রিং রোড প্রিন্স-এর সামনে থেকে শিয়া মসজিদ পর্যন্ত দুই শতাধিক ছোট বড় দোকান আছে। এসব দোকানে প্রতিদিনের লাইন খরচ হিসেবে প্রায় ৬০-৭০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। আমি ছোট একটি জুতার দোকান দিয়েছি। এ দোকান বসাতে অগ্রিম বাবদ ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে৷ প্রতিদিন লাইন খরচ হিসেবে ২২০ টাকা দিতে হয়। গমন অনেক দোকান আছে যারা ২০-৩০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে দোকান বসিয়েছেন। প্রতিদিন ব্যবসা হোক বা না হোক তাদের লাইন খরচ দিতে হবে।’
একই অভিযোগ টাউন হলের ব্যবসায়ী রুস্তম আলীর (ছদ্মনাম)। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি টাউন হল মার্কেটের সামনে ফাস্টফুডের দোকান বসিয়েছি। এ দোকান বসাতে প্রথমে অনেক জায়গায় ঘুরতে হয়েছে। পরে অগ্রিম বাবদ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে দোকান বসাতে পেরেছি। এছাড়াও প্রতিদিন লাইন খরচ হিসেবে ৩০০ টাকা করে দিতে হয়। না দিলে পুলিশ এসে দোকান বন্ধ করে দেয়।’
ব্যবসায়ীরা নানা অভিযোগ করে চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করলেও চাঁদাবাজদের নাম প্রকাশ করতে রাজি নন কেউ। সবার একটাই আতঙ্ক, চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে নিশ্চিত কোনো না কোনো বিপদে তাদের পড়তে হবে।
মোহাম্মদপুরে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসানো বন্ধে কাজ করছে এলাকার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। তবে এসব উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের। মোহাম্মদপুর অ্যালায়েন্স কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী পারভেজ হাসান সুমন ঢাকা মেইলকে বলেন, সড়ক ও ফুটপাত দখল বন্ধে আমরা নানা ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাই। সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা তুলে ধরতে গিয়ে অনেক সময় এলাকার নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরাগভাজন হতে হয়। ফলে আমরা যত কথাই বলি না কেন, কার্যকর কোনো সুফল পাওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, আমরা বারবার বলে আসছি, সড়কে বসানো এসব দোকানপাট কিশোর গ্যাং চক্রের আয়ের অন্যতম উৎস। দোকানগুলো থেকে আদায় করা অর্থ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় ব্যয় করা হয় বলে আমাদের অভিযোগ। প্রশাসনের নীরব ভূমিকার কারণে ফুটপাত পুরোপুরি দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে সরকারের পক্ষে সড়ক ও ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখা কঠিন হবে।
এদিকে, নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব ঢাকা মেইলকে বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত নজরদারি, সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিকল্প ব্যবস্থাপনার সমন্বয় প্রয়োজন। অস্থায়ী দোকানিদের জীবিকা ও নগরবাসীর চলাচলের অধিকার দুই বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে ব্যবসার উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, মোহাম্মদপুরে উচ্ছেদ অভিযানের পরও দোকানপাট ফিরে আসার পেছনে প্রশাসনিক দুর্বলতা, জনবলের সংকট, নিয়মিত তদারকির অভাব কিংবা অন্য কোনো কারণ কাজ করছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন। তারা স্পষ্ট করতে হবে, এসব অপরিকল্পিত দোকানপাট আসলে কারা বসায়, এর নেপথ্যে কে। না হলে কখনো এ শহরে শৃঙ্খলা ফিরবে না।
একেএস/জেবি