রাজধানীর মেট্রোরেলের নিচের ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযানের ইতিবাচক ফল মিলতে শুরু করেছে। এক সময় মেট্রোরেল স্টেশনগুলোর নিচে হকার, ভ্রাম্যমাণ দোকান, অবৈধ মোটরসাইকেল পার্কিং ও বিভিন্ন অননুমোদিত স্থাপনার কারণে যাত্রীদের চলাচলে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ সৃষ্টি হলেও বর্তমানে অধিকাংশ স্টেশন এলাকায় সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। নিয়মিত অভিযানের ফলে ফুটপাতগুলো এখন অনেকটাই হকারমুক্ত ও দখলমুক্ত থাকায় যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত হয়েছে।
সরেজমিনে রাজধানীর মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও, বিজয়সরণি, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সচিবালয় মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়েক মাস আগের তুলনায় ফুটপাতের পরিবেশে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। যেসব জায়গায় আগে সারিবদ্ধভাবে হকারদের দোকান বসত, সেখানে এখন যাত্রীরা নির্বিঘ্নে চলাচল করছেন। ফুটপাতজুড়ে অবৈধ দোকানপাট বা পার্কিংয়ের দৃশ্যও আগের তুলনায় অনেক কম।
তবে মতিঝিল স্টেশনসংলগ্ন কয়েকটি স্থানে এখনো কিছু ভ্রাম্যমাণ দোকান ও অস্থায়ী ব্যবসায়ীকে ফুটপাতের অংশ দখল করে বসতে দেখা গেছে। যদিও আগের তুলনায় তাদের সংখ্যা অনেক কম।
তবে উল্টো চিত্র শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশন এলাকা। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এই এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরও বিভিন্ন সময়ে কিছু ভ্রাম্যমাণ দোকানি আবারও ফুটপাত দখলের চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে বারডেম হাসপাতাল, শাহবাগ মোড় এবং স্টেশনসংলগ্ন অংশে সুযোগ পেলেই অস্থায়ীভাবে ফুডকার্ট ও ছোট ছোট দোকান বসানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ফলে এ এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে ডিএমটিসিএলকে।

এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবারও (২৩ জুলাই) শাহবাগ মেট্রোরেল স্টেশনে আবারও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ডিএমটিসিএলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে এমআরটি পুলিশ, ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা থানা, বাংলাদেশ আনসার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অভিযানটি স্টেশনের গ্রাউন্ড লেভেলের ‘বি’ গেট থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে সব গেট এবং স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় পরিচালিত হয়। এ সময় অবৈধ দখল, ভাসমান দোকান এবং অননুমোদিত স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। যাত্রীদের চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন সব অবৈধ স্থাপনা ও সামগ্রী সরিয়ে দিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়।
আরও পড়ুন
মেট্রোরেলের নিরাপত্তায় কমিটি কেন?
অভিযান চলাকালে বারডেম হাসপাতালের সামনে মেট্রোরেল স্টেশনসংলগ্ন ফুটপাথে অবৈধভাবে মোটরসাইকেল পার্কিং করায় মোটরসাইকেল মালিকদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়। একই সঙ্গে যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করায় একটি ভ্রাম্যমাণ ফুডকার্ট জব্দ করা হয়। পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সেটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, অভিযানের ফলে শাহবাগ স্টেশনসংলগ্ন এলাকা পুনরায় দখলমুক্ত হয়েছে এবং যাত্রীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। তবে কিছু অসাধু ব্যক্তি বারবার ফুটপাত দখলের চেষ্টা করায় নিয়মিত নজরদারি ও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।

মেট্রোরেলে চলাচলকারী কয়েকজন যাত্রী বলেন, আগে স্টেশনের নিচে হাঁটাই কঠিন ছিল। হকার, দোকান আর মোটরসাইকেলের কারণে ফুটপাত ব্যবহার করা যেত না। এখন পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে অফিস সময়ে আগের মতো ধাক্কাধাক্কি বা ফুটপাত ছেড়ে সড়কে নেমে হাঁটার প্রয়োজন হচ্ছে না। তবে শাহবাগের মতো ব্যস্ত এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
মিরপুর-১০ থেকে নিয়মিত মেট্রোরেলে যাতায়াত করা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে স্টেশনের নিচের ফুটপাত হকার ও অবৈধ পার্কিংয়ে ভরে থাকত। এতে ফুটপাত ব্যবহার না করে অনেক সময় সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হতো। এখন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তবে এই অবস্থা ধরে রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানো প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, আগে মেট্রোরেল স্টেশন থেকে বের হওয়ার পর হাঁটার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া যেত না। এখন বেশির ভাগ স্টেশনে স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করা যাচ্ছে। তবে শাহবাগ ও মতিঝিল স্টেশন এলাকায় এখনও কিছু ভ্রাম্যমাণ দোকান দেখা যায়। সেগুলোও সরিয়ে দিলে যাত্রীদের চলাচল আরও সহজ হবে।

মতিঝিলগামী যাত্রী ও ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, মেট্রোরেলের নিচের ফুটপাত দখলমুক্ত হওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি অনেক কমেছে। আগে ফুটপাতে দোকানপাট থাকায় চলাচলে সমস্যা হতো। এখন পরিবেশ অনেকটাই স্বাভাবিক। তবে যাতে আবার কেউ ফুটপাত দখল করতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত নজরদারি ও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু একদিনের অভিযান দিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। নিয়মিত অভিযান, কঠোর নজরদারি, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদারকি এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখলেই মেট্রোরেলের নিচের ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখা সম্ভব হবে। এতে রাজধানীর গণপরিবহনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অবকাঠামো ব্যবহারকারী লাখো যাত্রীর নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় চলাচল নিশ্চিত করা সহজ হবে।
এএইচ/জেবি




