Dhaka Mail Logo

জাতীয়

গুলশানে আ.লীগের মিছিল: কপাল পুড়তে পারে অনেক কর্মকর্তার

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২২ পিএম

গুলশানের ব্যস্ত সড়কে হঠাৎ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ঝটিকা মিছিল, এরপরই ককটেল বিস্ফোরণ-ঘটনাটি ঘিরে এখন প্রশ্নের মুখে রাজধানীর নিরাপত্তাব্যবস্থা। আকস্মিক এই মিছিলের আগাম তথ্য কি পুলিশের কাছে ছিল? গোয়েন্দা সংস্থাগুলোই বা কী জানত? তথ্য থাকলে তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছাল না কেন-এসব প্রশ্নে এখন তোলপাড় চলছে পুলিশ ও প্রশাসনে।

ঘটনাটিতে গুলশান থানা পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার মাঠপর্যায়ের সদস্য থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্জনও ছড়িয়েছে।

এই ইস্যুতে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় টানা সাড়ে তিন ঘণ্টার বৈঠক হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর আরেকটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেই বৈঠকে গুলশান এলাকার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা সংস্থার অনেকের কপাল পুড়তে পারে বলে সূত্রে জানা গেছে। 

সূত্র জানায়, ঘটনার দিন সকাল থেকেই গুলশান এলাকায় লোকজনের ভিড় বাড়তে থাকে। মিছিল শুরুর আগে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, কদমতলী, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরাসহ গুলশানের আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন সেখানে জড়ো হন। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ স্থানীয় যানবাহনে, আবার কেউ পাঠাও ও উবারে করে ঘটনাস্থলে আসেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের এভাবে জড়ো হওয়ার তথ্য অল্প সময়ের মধ্যেই গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে পৌঁছে যায়। তবে অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়নি এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও তা জানানো হয়নি। ফলে আগাম তথ্য না থাকায় সেদিন দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরে কয়েকটি গাড়িতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের সামনে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরাও হামলার শিকার হন।

আরও পড়ুন

রোধ হচ্ছে না পুলিশের তথ্য ফাঁস, নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা

বিষয়টি নিয়ে ডিবি পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গুলশান এলাকায় কত মানুষ নামবে এবং কতজন মিছিল করবে এমন তথ্য গোয়েন্দাদের কাছে ছিল। কারণ সেদিন সকাল থেকে লোকজন ধীরে ধীরে জড়ো হচ্ছিল। গোয়েন্দারা বিষয়টি বুঝতেও পেরেছিলেন। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে তাদের ঊর্ধ্বতন অফিসারদের জানাননি। গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য থাকলেও তা কাজে আসেনি।

সূত্র জানায়, গুলশান এলাকায় ডিবি, এনএসআই, ডিজিএফআই, এসবির সদস্যরা সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকেন। ডিপ্লোমেটিক জোন হওয়ার কারণে তাদের নজরদারিও কড়া। কিন্তু সেদিন তারা মাঠে থাকলেও তাদের পর্যবেক্ষণ কোনো কাজে আসেনি। ফলে তাদের এখন প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। ব্যর্থতা প্রমাণিত হলে তাদের কাউকে কাউকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

League2
গুলশানে এই ঝটিকা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: সংগৃহীত

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুলশান এলাকায় কত মানুষ প্রবেশ করছে এবং কতজন বের হচ্ছে, তা বিভিন্ন পয়েন্টের সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। এসব ক্যামেরা ডিএমপি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করে। ফলে ওই এলাকায় মানুষের অস্বাভাবিক সমাগমের বিষয়টি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে আসেনি-বিষয়টি এমন নয়। কূটনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এমন কর্মসূচি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এ ঘটনার পর বিষয়টি ভিন্নভাবে সামাল দিতে মাঠে নেমেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কারণ, যেকোনো সময় এই এলাকার দায়িত্বে থাকা পুলিশ, এসবি, এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

আগাম তথ্য পেলেও জানাননি গোয়েন্দারা!

জানা গেছে, গুলশানের সেদিনের ঘটনায় গোয়েন্দাদের কাছে আগাম তথ্য ছিল। কিন্তু তারা বিষয়টি আমলে নেননি এবং ঊর্ধ্বতনদের জানাননি। এ ঘটনার পর ডিএমপির পক্ষ থেকে একটি রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। রিপোর্টে সেদিন কী ঘটেছিল, কারা এজন্য দায়ী, কাদের ব্যর্থতা ছিল তা তুলে ধরে স্বরাষ্ট মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এখন দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রের দাবি, সেদিন সকাল থেকেই তাদের নেতাকর্মীরা পাঠাও চালক, পথচারী ও সাধারণ ব্যস্ত মানুষের ছদ্মবেশে গুলশান এলাকায় অবস্থান নেন। তাদের নির্দেশনা ছিল, জুমার নামাজের আগেই প্রধান সড়কে এসে জড়ো হবেন। এর আগে অলিগলিতে আড্ডা, চা খেয়ে সময় কাটানোর কথা থাকলেও তারা সেই পরিকল্পনা অনুযায়ীই চলেন। বেলা সাড়ে ১১টার পর তারা ধীরে ধীরে প্রধান সড়কের দিকে আসতে শুরু করেন।

সূত্রগুলো জানায়, মিছিল শেষে দ্রুত সরে যাওয়ার জন্য আগে থেকেই গুলশানের বিভিন্ন পয়েন্ট ও সম্ভাব্য পালানোর পথ চিহ্নিত করে একটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মিছিল কোথা থেকে শুরু হবে, কারা নেতৃত্ব দেবেন, কী স্লোগান দেওয়া হবে এবং নারীরা মিছিলে কোন অংশে থাকবেন—এসব বিষয়ও আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারা প্রায় ৩০ সেকেন্ড ধরে দৌড়ে মিছিল করে দ্রুত বিভিন্ন দিকে সরে যান। এর মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও কয়েকজনকে আটক করতে সক্ষম হয়; বাকিরা নিরাপদে এলাকা ছেড়ে যান। তবে মিছিলকারীরা প্রায় ১০ মিনিট সড়কে অবস্থান করেছিলেন বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন

একের পর এক বোমা উদ্ধার, নেপথ্যে কারা?

মিছিল চলাকালে পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাবার বুলেট ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি তাজা ককটেল জব্দ করা হয়। পরে এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

ঘটনার পর প্রথমে পুলিশ তিনজনকে আটক করে। পরে রাতে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে অভিযান চালানো হয়। পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে এ পর্যন্ত মোট ৭২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ঘটনার দিন প্রাথমিকভাবে ৩২ জনকে এবং পরবর্তী সময়ে আরও ৪০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ জনকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের প্রত্যেকের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গুলশানের কর্মকর্তাদের আ.লীগ সম্পৃক্ততার অভিযোগ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গুলশান বিভাগে পুলিশ, ডিবি ও এসবিতে বর্তমানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের কয়েকজনের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, তাদের মধ্যে কেউ কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতিও করেছেন। আবার কয়েকজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল টিমেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা গেছে।

League1
মিছিলের পর অনেককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ছবি: সংগৃহীত

গুলশান বিভাগের ডিসি এম তানভীর আহমেদের পুরো নাম মোহাম্মদ তানভীর আহমেদ রওনক। ‘রওনক’ তার ডাকনাম হলেও ডিএমপির ওয়েবসাইট ও দাফতরিক কাজে তিনি এম তানভীর আহমেদ নামেই পরিচিত। এর আগে তিনি বাংলাদেশ সচিবালয়ের ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় সচিবালয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সম্প্রতি তিনি গুলশান বিভাগের ডিসি হিসেবে দায়িত্ব নেন।

তানভীর আহমেদের বিষয়ে আরও জানা গেছে, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানের সময়ে বিশেষ পছন্দে তাকে গুলশান এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে সে সময় তিনি ডিসি পদে ছিলেন না। এছাড়া তিনি ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা প্রটোকলের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

আরও পড়ুন

হাসিনার পতনের পরের দুদিন কেন্দ্রীয় কারাগারে যা ঘটেছিল

অন্যদিকে, ডিবির ঢাকা জেলা দক্ষিণের ওসি আশফাক রাগিব হাসানের সেদিনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, সেদিনের মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার রিয়াজ খন্দকারও ছিলেন। তিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবে পরিচিত। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রিয়াজের সঙ্গে আশফাক রাগিবের ব্যক্তিগত পরিচয় ও বন্ধুত্ব রয়েছে। রিয়াজকে ঘটনার ছয় দিন আগে ওই দায়িত্বে পদায়ন করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে।

মিছিলের পর রিয়াজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিছিলের ছবি প্রকাশ করলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এরপরই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন সামনে আসে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত দুই দিন ধরে ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি এম তানভীর আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ওসমান গণিকে ফোন করা হলে তিনি বৈঠকে থাকার কথা জানিয়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এমআইকে/জেবি