# বিকেলে পৌঁছায় হাসিনার পালানোর খবর
# জেলে হট্টগোল করে মাদক ও ছিনতাই মামলার আসামিরা
# হট্টগোল থামাতে রাজনৈতিক বন্দিদের সহায়তা নেয় কর্তৃপক্ষ
# ৬ আগস্ট সকালে গুলিতে মারা যায় দুজন
# প্রথমে ছাত্ররা পরে জামিন পান রাজনৈতিক নেতারা
চব্বিশের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনার পালানোর খবর বিকেলে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে। বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে ফেটে পড়েন কয়েদি ও হাজতীরা। কিন্তু বিপত্তি ঘটায় মাদক, ছিনতাই ও জঙ্গি মামলার আসামিরা। তারা দরজা ও কারাগারের দেয়াল ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। পুরো কারাগারে শুরু হয় হট্টগোল।
সে সময় পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, কোনোভাবেই তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না কারা কর্তৃপক্ষ। পরে রাজনৈতিক বন্দিদের সহায়তা নেন তারা। এরপর পরিস্থিতি শান্ত হয়।
তবে পরদিন ঘটে আরেক ঘটনা। মাদক, ছিনতাই ও জঙ্গি মামলার আসামিরা পালানোর চেষ্টা করে। খবর পেয়ে অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। সেদিন সেনাবাহিনী ও কারারক্ষীদের গুলিতে মারা যায় দুই বন্দি।
সে সময় কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা ব্যক্তিদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।
তারা জানান, ৬ আগস্ট পর্যায়ক্রমে জুলাই আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তি, ছাত্র ও সাধারণ মানুষ একে একে জামিন পেতে শুরু করেন। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে কারাবন্দিদের নজরদারি বাড়ানো হয় এবং কথা বলা সীমিত করা হয়। প্রতিটি রুমে বাড়তে থাকে বন্দিদের সংখ্যা। শেষ পর্যন্ত এমন হয়েছিল যে, গাদাগাদি করে থাকতো হতো। হাঁটার মতো জায়গা ছিল না। হাসিনা পালানোর পরের দুই দিন কারাগারে এক বিভীষিকাময় দিন কাটে বলে জানান তারা।
১৩ জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় কারাগারে লকডাউন
সে সময় কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি হিসেবে বন্দি ছিলেন পল্টন যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক লিয়ন হক। তিনি সেখানে কারা শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন। থাকতেন কারাগারটির মনিহার ওয়ার্ডের ৬/৫ নম্বর রুমে।
লিয়ন জানান, ১৩ জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় কারাগার লকডাউন করে দেওয়া হলো। বন্দিদের কারাগারের ভেতরের মাঠ ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। প্রতিটি ভবনের (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, করতোয়া, মনিহার, রুপসা, চম্পাকলিসহ অন্য ওয়ার্ডগুলোর) সামনের করিডোরেও যেতে দেওয়া হতো না। ফ্লোরে ফ্লোরে শুধু সেবকরা ভাত ও ডাল দিয়ে যেত। প্রিজন ক্যান্টিনও বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। বাইরের খাবারও নিতে দিতো না।
তিনি আরও জানান, ১৭ জুলাই রাত থেকে চারজন করে বসিয়ে দিনে দুইবার করে গোনা হতো। এরপর প্রতিটি রুমে থাকার জায়গা বাড়ানোর ব্যবস্থা করা শুরু করে জেল কর্তৃপক্ষ। এরপর নিয়ম করা হয়েছিল, যারাই বন্দি হিসেবে আসবেন, তাদের সবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিতে হবে। চোখের ছাপ ও আঙুলের ছাপ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলো। আগস্টের ২ তারিখ রাত থেকে রুম থেকে বের হওয়া বন্ধ ও ৩ তারিখ থেকে সকল খাবার বন্ধ করে দেওয়া হয়।
হাসিনা পালানোর খবর বিকেল ৪টার পর পৌঁছায় বন্দিদের কাছে
কেন্দ্রীয় কারাগার ও গাজীপুর কাশিমপুর কারাগারে বিকেল চারটার পর শেখ হাসিনা পালানোর খবর পৌঁছায় বলে জানিয়েছেন সে সময় কারাগার দুটিতে বন্দি থাকা কয়েদিরা। কেন্দ্রীয় কারাগারের মনিহার ওয়ার্ডে ঠিক বিকেল চারটার পরে একজন কারারক্ষী গিয়ে খবর দেন যে, শেখ হাসিনা পালিয়েছে গেছে।
এ খবর শুনেই সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার দিয়ে ওঠেন কয়েদি ও কারা শিক্ষক লিয়ন হক। তিনি বলে ওঠেন, হাসিনা পালাইছে রে। তার চিৎকারে পুরো কারাগারে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। বন্দিদের মাঝে উল্লাস। সব ওয়ার্ডের রুমগুলোতে বন্দি থাকা কয়েদি ও হাজতীরা একযোগে লোহার শিক ধরে দরজায় ধাক্কা মারা শুরু করে। তারই মাঝে সঙ্গে থাকা একটি রেডিও চালু করতেই সেনাপ্রধানের দেওয়া ভাষণ শুনে খবরটি সম্পর্কে নিশ্চিত হন লিয়ন হক।
তিনি বলেন, আমি তো সেই কারারক্ষীর কথা প্রথমে বিশ্বাসই করিনি। পরে যখন রেডিওতে সেনাপ্রধানের ভাষণে শুনতে পেলাম, সকল রাজনৈতিক দলের লোকদের নিয়ে সরকার গঠন করা হবে, তখন ভাবলাম সত্যি তো। হাসিনা পালানোর খবরে অনেকে সেখানে আল্লাহর শুকরিয়া জানিয়েছে দোয়া মোনাজাত করেছে ও নামাজ পড়েছে।
হট্টগোল থামাতে রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তা নেয় কর্তৃপক্ষ
সে সময় কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা কয়েকজন বন্দি জানিয়েছেন, সেদিন বিকেলে জেলটির ডিপুটি জেলার হাসিনা পালানোর খবরে প্রতিটি ওয়ার্ডে যান এবং পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনোভাবে কেউ শান্ত হচ্ছিল না। হট্টগোালের সময় জেলের খাবারও লুট করে খেয়েছিল তারা। পরে এই পরিস্থিতি থামাতে বিভিন্ন ওয়ার্ডে বন্দি থাকা রাজনৈতিক বন্দিদের সহযোগিতা চান তিনি।
বন্দি থাকা বিএনপির নেতারা সেদিন পরিস্থিতি শান্ত করেছিলেন। এতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। তিনি সকলকে বুঝিয়ে নিজ নিজ রুমে পাঠিয়ে দেন। সেদিন পুরো কারাগারে বন্দিদের রুমগুলোতে ঢুকতেই রাত ৯টা বেজে গিয়েছিল।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, আমরা হাসিনা পালানোর খবরটা পেলাম বিকেলে। এরপর তো সেই খুশি সবার মাঝে। কিন্তু শুরু হলো হট্টগোল। এরপর আমার নেতৃত্বে অন্যদের সঙ্গে নিয়ে নেমে পড়লাম ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে সকলকে অনুরোধ করতে। সকলে কথা শুনলো। তারা ফিরে গেল নিজ নিজ রুমে। পরদিন থেকে শুরু হলো জামিন।
জানা গেছে, এই কারাগারে সেসময় জুলাইয়ের আগে ও পরে গ্রেফতার হওয়া বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী, সাইফুল আলম নিরব, নিরু, বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল ইসলাম, প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ঢাকা মহানগর শ্রমিক দলের সভাপতি সুমন ভুইয়া, ফেনী জেলা বিএনপির নেতা নুরুল আমিন ভুইয়া বাদশা, নুরুল হক নুর, আম জনতা পার্টির তারেক রহমান, যুবদল নেতা রফিকুল আলম মজনু ও ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শ্রাবণসহ আরও অনেকে।
মাদক ও ছিনতাই মামলার আসামিরা হট্টগোল শুরু করে
ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি শ্রাবণও ওই সময় কারাবন্দি ছিলেন। তিনি ঢাকা মেইলের কাছে দাবি করেন, ৫ আগস্ট হাসিনা পালানোর খবর পৌঁছামাত্র পুরো কারাগারে হট্টগোল শুরু হয়। বিশেষ করে মাদক ও ছিনতাই মামলার আসামিরা লোহার দরজা ভাঙার চেষ্টা করেন। তারা হট্টগোল করে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষের কৌশলগত কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: চোখ হারিয়ে জীবনযুদ্ধে তিন জুলাইযোদ্ধা
৬ আগস্ট সকালে গুলিতে নিহত হয় ২ জন
সে সময় কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকা একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, হাসিনা পালানোর পরদিন ৬ আগস্ট সকাল ৯ থেকে ১১টা পর্যন্ত সেখানে তারা গুলি ও হেলিকপ্টারের শব্দ শুনতে পেয়েছেন। সেদিন বন্দি থাকা ছাত্রদলের নেতা শ্রাবণ বলেন, ‘আমি তখন আমার রুমে। সকালে গুলির শব্দ শুনেছিলাম। কিন্তু গুলি কোথা থেকে চলেছিল, তা বোঝা যাচ্ছিল না।
তবে বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন আরেক ছাত্রনেতা লিয়ন হক। তিনি বলেন, সকালে মূলত কারাগারের এক পাশে দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিল কিছু লোক। তাদের অনেকে দেয়াল টপকে ভেতরেও ঢুকে পড়েছিল। এরপর তারা লোকজনের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছিল। পরে খবর পেয়ে সেদিন সেনাবাহিনী ও র্যাব অভিযান চালায়। গুলিতে দুজন জেলের বাইরের মানুষের মৃত্যু হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সে সময় কারাগারটিতে দায়িত্বে থাকা উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা।
তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, সরকার পতনের পর বন্দিরা গন্ডগোল শুরু করে। পরদিন সকালে কিছু লোক জেলের দেয়াল ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করে। পরে কারারক্ষী ও সেনা সদস্যরা মিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গুলি চালাতে হয়েছে। এতে দুজন সাধারণ ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়। পরে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হলে মারা যায়।
তিনি আরও বলেন, পরদিন সকাল থেকে জামিন দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু যাদের জামিন হবে না জেনেছিল, বিশেষ করে মাদক ও ছিনতাই মামলার আসামিরা, তারাই হট্টগোল শুরু করে। তারা জেল ভেঙে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সেনা অভিযানের কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক বন্দিরা জামিন পেতে রাত ১১টা বেজে যায়
সে সময়ের বন্দিরা জানিয়েছেন, পরদিন সকাল থেকে কারাগারটিতে আসতে শুরু করে জামিনের কাগজ। প্রথমেই জামিন দেওয়া হয় আন্দোলনে গ্রেফতার ছাত্রদের। পরে রাজনৈতিক নেতারা জামিন পেয়েছিলেন।
তবে তারা সেদিন জামিন পেতে দুপুর একটায় গেটে চলে এসেছিলেন। কিন্তু বের হতে হতে রাত ১১টা বেজে গিয়েছিল। অনেকের নথিপত্র ছিল না। অনেকে বাড়িতে ফোন করে নথিপত্র নিয়ে যান। অনেকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেলাতে সময় লেগে যায়।
এমআইকে/এএইচ



