বাংলাদেশ পুলিশের অভ্যন্তরীণ স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের ঘটনা দিন দিন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গোপন নথি, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, দাফতরিক নির্দেশনা ও অভ্যন্তরীণ নানা তথ্য নির্ধারিত গণ্ডি পেরিয়ে চলে যাচ্ছে বাইরে। গত কয়েক বছর ধরে এমন ঘটনা ঘটলেও তথ্য পাচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
পুলিশের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক গ্রুপে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া হলেও তা অনেক সদস্য আমলে নিচ্ছেন না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁসের পাশাপাশি বাহিনীর অভ্যন্তরে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন শঙ্কা।
বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ পুলিশের অন্তত ১ লাখ ৮ হাজার ৪১৬ সদস্যের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার তথ্য প্রকাশ্যে আসে। তখন সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা একটি স্বেচ্ছাসেবী দলের বরাত দিয়ে এমন খবর প্রকাশ করা হয়েছিল। ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে ছিল পুলিশ সদস্যদের বিপি নম্বর, পদমর্যাদা, কর্মস্থল, যোগদানের তারিখ, মোবাইল ও সরকারি ফোন নম্বর, বাবা-মা ও স্বামী-স্ত্রীর নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, ঠিকানা, উচ্চতা, ওজনসহ বিভিন্ন শনাক্তকারী তথ্য।
উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধু ব্যক্তিগত তথ্য নয়, পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইম ডেটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম-এ প্রবেশের ইউজারনেম, পাসওয়ার্ড ও লগইন-সংক্রান্ত তথ্যও ফাঁস হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশের অপরাধসংক্রান্ত ৩১ হাজারের বেশি তথ্য ফাঁসের কথাও জানা গেছে।
এ ধরনের তথ্য ফাঁস হলে শুধু ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট নয়, তদন্তাধীন মামলা, আসামি, সাক্ষী, তদন্ত কর্মকর্তা এবং পুলিশের অপারেশনাল সক্ষমতাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসব তথ্য পাচারের পেছনে কারা?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে জানান, পুলিশের ভেতর থেকেই বিভিন্ন স্পর্শকাতর তথ্য বাইরে পাচার করা হচ্ছে। বিশেষ করে পুলিশ সদর দফতর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ রয়েছে। নিজেদের অবস্থান শক্ত করা কিংবা পদোন্নতির প্রত্যাশায় কেউ কেউ পরিকল্পিতভাবে এসব তথ্য বাইরে সরবরাহ করছেন বলে দাবি কর্মকর্তাদের।
তাদের ভাষ্য, বিষয়টি পুলিশের অনেক সদস্যই জানেন। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ, কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করতে চান না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে অনেকেই ভয় পান। সম্প্রতি রেজাউল নামে এক পুলিশ কর্মকর্তা একটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের লিংক দিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় বিপাকে পড়েন। কর্মকর্তাদের দাবি, এমন আরও অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেওয়ার আড়ালে পুলিশের অভ্যন্তরীণ ও স্পর্শকাতর তথ্য বাইরে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের ভেতরে তথ্য পাচারের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে ঈর্ষা ও ব্যক্তিগত বিরোধ। তার ভাষ্য, কোনো সহকর্মী পদোন্নতি পেলে তা মেনে নিতে না পেরে কেউ কেউ ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য ছড়ান। কখনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে, আবার কখনো বাইরে এসব তথ্য সরবরাহ করে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা করা হয়। এতে পদোন্নতি পেয়েও নানা অভিযোগে শাস্তি বা বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে দাবি তার।
তিনি আরও বলেন, অতীতে কর্মক্ষেত্রে কোন কর্মকর্তা কী ধরনের অপরাধে শাস্তি পেয়েছেন, সেই তথ্যও দ্রুত দেশের বাইরে থাকা বিভিন্ন ইউটিউবারের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। একইভাবে অফিস আদেশ, নোটিশ ও প্রজ্ঞাপনের তথ্যও অনেক সময় প্রকাশের আগেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। এতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতিনিয়ত বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে।
আরও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ৫ আগস্টের পর পুলিশের অনেক সদস্য বিভিন্ন মামলায় আসামি হয়েছেন। তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির আগেই সংশ্লিষ্টরা সেই তথ্য পেয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগেই অনেকে দেশ ছাড়তে সক্ষম হন। কর্মকর্তাদের দাবি, পুলিশের ভেতরের কিছু সহকর্মী, সাবেক সহকর্মী এবং একটি নির্দিষ্ট মহল এসব তথ্য সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে দিতেন। তাদের অভিযোগ, এই ব্যক্তিরাই বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও সমন্বয়ের মাধ্যমে অতীতেও পুলিশকে বিতর্কিত করার মতো কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রেখেছেন।
তথ্য ফাঁস ঠেকাতে নির্দেশনা কাজে আসেনি
বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন স্পর্শকাতর তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ফাঁস হওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসে পুলিশ সদর দফতর। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করা হয়।
পুলিশ সদর দফতরের ওই নির্দেশনায় গোপনীয় তথ্য ও নথি, অস্ত্র-গোলাবারুদ এবং স্পর্শকাতর স্থাপনার ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ইউনিটের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট পরিচালনায় একাধিক প্রশাসক রাখার, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার ও নির্দিষ্ট সময় পরপর তা পরিবর্তনের এবং ইউনিটপ্রধানদের নিয়মিতভাবে এসব অ্যাকাউন্ট মনিটরিংয়ের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল।
তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এসব নির্দেশনা অনেকাংশেই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়েছে। বাস্তবে তা কার্যকর করতে পুলিশের ভেতরে কিংবা বাইরে দৃশ্যমান ও জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। ফলে নির্দেশনা জারির পরও পুলিশের অভ্যন্তরীণ ও স্পর্শকাতর তথ্য বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
একসময় হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে পুলিশের তথ্য চুরি বা পাচারের অভিযোগ সামনে এলেও বর্তমান চিত্র ভিন্ন। এখন পুলিশের তথ্য হ্যাকিং করে নয়, বরং বাহিনীর ভেতরে থাকা কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যদের মাধ্যমেই বাইরে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কখনো এসব তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে, আবার কখনো প্রতিপক্ষের হাতে। প্রায় দুই বছর আগেই পুলিশের অভ্যন্তর থেকে তথ্য বাইরে চলে যাওয়ার এমন প্রমাণ তদন্তে উঠে এসেছিল।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পুলিশের ভেতরে থাকা একটি চক্রের মাধ্যমে কিছু কর্মকর্তা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় তথ্য ফাঁস করছেন। এসব তথ্য পরে পলাতক সাবেক কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। পুলিশ সদর দফতরসহ পুলিশের কয়েকটি ইউনিটের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ রয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পুলিশের তথ্য বাইরে চলে যাওয়ার বিষয়টি যে শুধু আশঙ্কা নয়, এর প্রমাণও বিভিন্ন সময়ে পাওয়া গেছে। এ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা আইজিপি বাহারুল আলমসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে উদ্বেগ ও সতর্কতার কথা জানিয়েছিলেন। পলাতক কর্মকর্তাদের কাছে পুলিশের ভেতর থেকে কেউ তথ্য পৌঁছে দিচ্ছেন, এমন আশঙ্কাকে সামনে রেখে সে সময় তদন্ত ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছিল।
তৎকালীন আইজিপি এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন, পুলিশের ভেতরে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট থাকতে দেওয়া হবে না। কেউ সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এরপরও পুলিশের অভ্যন্তর থেকে স্পর্শকাতর তথ্য বাইরে যাওয়ার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
পুলিশের অভ্যন্তর থেকে স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের ঘটনা কোনোভাবেই রোধ করা যাচ্ছে না। এর ফলে শুধু পুলিশের তদন্ত কার্যক্রমই ব্যাহত হচ্ছে না, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি এবং মামলা করে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় থাকা ভুক্তভোগীরাও। অভিযোগ রয়েছে, অনেক সময় কোন এলাকায় অভিযান চালানো হবে, কাদের গ্রেফতার করা হবে কিংবা কারা নজরদারিতে রয়েছেন—এমন গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্যও আগেভাগেই বাইরে চলে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া বিভাগের এআইজি সাহাদাত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কী বলছেন অপরাধ বিজ্ঞানী
পুলিশের তথ্য ফাঁসের ঘটনা এবং এর প্রতিকার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, তথ্য ফাঁসের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ফরেনসিক তদন্ত হওয়া জরুরি। তবে তদন্তের ফলাফল দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে না এলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে। এ ধরনের ঘটনা রোধে পুলিশের তিনটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, তথ্য কোথা থেকে ফাঁস হয়েছে তা শনাক্ত করা, ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত ফাঁসের পার্থক্য নির্ধারণ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এই বিশ্লেষখ বলেন, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তথ্য বাইরে চলে গেলেই তাকে অপরাধী হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করতে হবে যথাযথ ফরেনসিক প্রমাণের ভিত্তিতে।
ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। পুলিশের সিদ্ধান্ত ও অপারেশনাল তথ্য বাইরে চলে যাওয়া শুধু প্রশাসনিক গোপনীয়তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে তদন্তের ভবিষ্যৎ, পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা, অপরাধ দমন কার্যক্রম এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত।
ড. তৌহিদ বলেন, শুধু নতুন নির্দেশনা জারি কিংবা মাঝেমধ্যে কর্মকর্তাদের বদলি করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদার করা, কঠোর অ্যাক্সেস কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু করা, নিয়মিত সাইবার অডিট, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিশ্চিত করা, স্বাধীন তদন্ত এবং তথ্য ফাঁসের ঘটনায় দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া।
এমআইকে/জেবি




