মো. মেহেদী হাসান হাসিব
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম
জাতীয় তথ্যভান্ডার থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নাগরিকদের তথ্য পাচারের অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) মাঠপর্যায়ের ৪ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন কারণে ৩৪ জনকে শোকজ করা হয়েছে এবং ১০ জন কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত করতে কমিটি গঠন করেছে সংস্থাটি।
ইসি সূত্র জানায়, যেসব কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে তথ্যভান্ডার থেকে ওয়েব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, এমন কিছু ঘটনা সামনে আসার পর ছায়া তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়। তদন্তে ৪ জনের বিরুদ্ধে তথ্য পাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও ৩৪ জন কর্মকর্তার সিএমএস অ্যাকাউন্টে (যে অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এনআইডির যাবতীয় কাজ করা হয়) অস্বাভাবিকভাবে এনআইডির তথ্য সার্চ করার কারণ জানতে চেয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্তের স্বার্থে কর্মকর্তাদের নাম এখনই প্রকাশ করা যাবে না বলে জানিয়েছে সূত্র।
সূত্র আরও জানায়, এ ঘটনায় ইতোমধ্যে রাজস্ব খাতের দুজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) ২য় পর্যায় প্রকল্পের দুজন ডেটা এন্ট্রি অপারেটরকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ১০ জনের বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ৩৪ জনকে শোকজ লেটার দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইসিতে প্রায় সাড়ে ৩’শ অভিযোগ
এই ৪ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা নিজেদের সিএমএস আইডি ব্যবহার করে একটি ওয়েব প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এনআইডির তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এর মাধ্যমে দুষ্কৃতকারীরা যেকোনো ব্যক্তির এনআইডির পিডিএফ সংগ্রহ করে ডার্ক ওয়েবসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
পঞ্চগড় সদর উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক কামনা রানী সরকার, কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আ. ছাত্তার (রাজস্ব খাত)। অন্যদিকে, আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) ২য় পর্যায় প্রকল্পের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত রমনা থানা নির্বাচন কার্যালয়ের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. আশিকুর রহমান এবং তালতলী উপজেলা নির্বাচন কার্যালয়ের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. জাকির হোসেন সোহাগ।
৪৮ জনই ইসির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে ঢাকা মেইল যোগাযোগ করলেও এ বিষয়ে বেশির ভাগ কর্মকর্তাই কথা বলতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপজেলা কর্মকর্তা জানান, আমাদের এখানে লোকবল কম, কিন্তু সেবার চাহিদা বেশি থাকে। দিন শেষে আমি কতটি এনআইডি সংশোধন করলাম, কতটি এনআইডি ডেটাবেজ সার্চ করলাম, তা আমরা দেখতে পাই না। এটি দেখার জন্য আমাকে ঢাকার আইটিতে কল করতে হয়।
এখন আমার অ্যাকাউন্টে যদি এসব দেখার সুযোগ থাকত, তাহলে কাজ শেষে আমি প্রতিবেদন তৈরি করে রেখে যেতাম। আবার সকালে এসে কাজ শুরু করার সময় সেই প্রতিবেদন দেখে কাজ শুরু করতে পারতাম। এতে করে অস্বাভাবিক যেকোনো কিছু আমাদের নজরে এলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিতে পারতাম। কিন্তু এসব তো আমরা দেখতে পারি না। এগুলোর জন্য আমাদের আইটি শাখার কাছে লিখিতভাবে জানাতে হয়।
আমার অ্যাকাউন্ট থেকে অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সেটি আমি দেখতেও পারিনি। শুধু আমার অ্যাকাউন্ট থেকে ঘটেছে দেখে আমি দোষী। দায় যেহেতু আমাকে নিতে হচ্ছে, তাহলে আমাদেরও এ সুবিধা দিতে হবে যে কয়টি এনআইডি সার্চ করলাম আর কয়টি এনআইডি সংশোধন করলাম, তা যেন আমরা দেখতে পারি এবং প্রতিবেদন তৈরি করতে পারি। তা না হলে একপাক্ষিকভাবে দোষ মেনে নেওয়া যায় না।
আরেকজন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা জানান, একজনের এনআইডি সংশোধন করতে গেলে তার পরিবারের সবার এনআইডির তথ্য আমাদের যাচাই করতে হয়। এ ক্ষেত্রে দিনে যদি ১০০ জনকেও আমরা সেবা দিই, তাহলে গড়ে একজনের এনআইডি সংশোধনে ৪টি এনআইডি যাচাই করলে ৪০০টি হয়। এ ছাড়া বর্তমানে ভোটার নিবন্ধনে আরও সতর্ক থাকতে আমরা নতুন ভোটারের বাবা-মা ও ভাই-বোনেরও এনআইডি যাচাই করছি। সেখানেও অনেক তথ্য যাচাই করতে হয়।
আরও পড়ুন: বদলি তদবিরে অতিষ্ঠ ইসি সচিব
এমনকি নাগরিকদের দ্রুত এনআইডি সেবা দেওয়ার জন্য আমাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচনসংক্রান্ত কাজ শেষ করে অনেক সময় রাতে আমরা এনআইডি সংশোধন ও নতুন ভোটারের তথ্য আপলোডের কাজ করছি। এর জন্যই যদি অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়, তাহলে তো আমাদের কিছু করার নেই। ব্যাখ্যা চেয়েছে, আমরা ব্যাখ্যা দেব। সমস্যা নেই।
এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে ইসির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেইলকে জানান, যাদের শোকজ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে সবাই ব্যাখ্যা দিলে আসল ঘটনা জানা যাবে। তবে আমার কাছে মনে হয়, এসব কর্মকর্তা কাজের প্রয়োজনে সার্চ করেছেন। তবে যে ১০ জন কর্মকর্তার বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাঁদের নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। আর ৪ জনের অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাদের চাকরি থেকে ইতোমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে।
একসঙ্গে এত কর্মকর্তাকে শোকজ ও তদন্তের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ঢাকা মেইলকে জানান, কোনো কারণ ছাড়া তো কাউকে শোকজ করা কিংবা কারও বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয় না। নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে। শোকজের জবাব আসুক, তারপর বিস্তারিত বলা যাবে।
এমএইচএইচ/এআর