নিজস্ব প্রতিবেদক
৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৩ পিএম
সরকারি ই-সেবা নিতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত যোগাযোগের শিকার হয়েছেন ৬১ শতাংশ নারী। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের উদ্বেগ রয়েছে তাদের মধ্যে। ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস বা হ্যাক হওয়ার আশঙ্কাকে ই-সেবা ব্যবহারে অনিরাপদ বোধ করার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সোমবার (৩১ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সুশাসনের বর্তমান অবস্থা ও করণীয়’ শীর্ষক সংলাপে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণায় দেশের আট বিভাগের দুই হাজার ৬১১ জন নাগরিক অংশ নেন। তাদের মধ্যে নারী, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া ২৯৭টি স্থানীয় সরকারি কার্যালয়ের ওপরও গবেষণা চালানো হয়েছে। গবেষণার তথ্য সংলাপে উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা ফেলো তামিম আহমেদ ও গবেষণা সহযোগী সাবিহা শারমিন।
গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি ই-সেবা ব্যবহারের পর ৬১ শতাংশ নারী অননুমোদিত যোগাযোগের অভিযোগ করেছেন। ২০ দশমিক ২ শতাংশ নারী এ বিষয়ে নিশ্চিত নন। আর ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ বলেছেন, তারা এমন কোনো যোগাযোগ পাননি।
ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও নারীদের বড় অংশ পুরোপুরি নিরাপদ বোধ করেন না। মাত্র ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী সরকারি ই-সেবার মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়াকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে করেন। ৬০ দশমিক ১ শতাংশ নিজেদের আংশিক নিরাপদ মনে করেন এবং ৬ দশমিক ৭ শতাংশ একেবারেই নিরাপদ মনে করেন না। আবার মাত্র ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ নারী ই-সেবা ব্যবহারের সময় কী ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেই বিষয়ে পুরোপুরি অবগত বলে জানিয়েছেন।
ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস বা হ্যাক হওয়ার আশঙ্কাই নারীদের অনিরাপদ বোধ করার প্রধান কারণ। ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ নারী এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশের আশঙ্কা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য অপব্যবহার হতে পারে। এ ছাড়া ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাব, সম্মতি ছাড়া তৃতীয় পক্ষের কাছে তথ্য চলে যাওয়া এবং স্পষ্ট গোপনীয়তা নীতির অভাবও উদ্বেগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ই-সেবা ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও নারীদের বড় অংশকে এখনো সেবা নিতে সরাসরি সরকারি কার্যালয়ে যেতে হয়। মাত্র ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, পুরো সেবা অনলাইনে সম্পন্ন করা যায়। ৩৮ শতাংশের ক্ষেত্রে শুধু আবেদনপত্রের অংশ অনলাইনে করা যায়, বাকি কাজ অফলাইনে করতে হয়। আরও ২০ দশমিক ৮ শতাংশের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ ধাপ অনলাইনে হলেও কিছু কাগজপত্রের কাজ করতে হয়।
অনলাইনে আবেদন করার পরও বিভিন্ন কাজে সরাসরি কার্যালয়ে যেতে হয়। ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ নারীকে কাগজপত্র জমা দিতে হয়। ৫১ দশমিক ৮ শতাংশকে শারীরিকভাবে নথি সংগ্রহ করতে হয়। ২৮ দশমিক ৯ শতাংশকে সরাসরি গিয়ে নথিতে স্বাক্ষর করতে হয়। ২২ দশমিক ৩ শতাংশকে অফলাইনে অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
ই-সেবা ব্যবহারে নারীদের অন্যতম বড় বাধা ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি। ৫৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী এটিকে প্রধান বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ নারী স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের অভাব এবং একই সংখ্যক নারী দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ ছাড়া ওয়েবসাইট ঠিকমতো কাজ না করা, সহায়তা বা নির্দেশনার অভাব এবং সেবা পাওয়ার নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকাও বাধা হিসেবে উঠে এসেছে।

ডিজিটাল দক্ষতা তৈরির প্রশিক্ষণেও নারীদের অংশগ্রহণ কম। মাত্র ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ নারী কখনো ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ পেয়েছেন। বাস্তবে এমন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন মাত্র ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ। সহায়তা ছাড়া ই-সেবা ব্যবহারে খুব আত্মবিশ্বাসী মাত্র ১৯ দশমিক ২ শতাংশ নারী। ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশ কিছুটা আত্মবিশ্বাসী।
ই-সেবা নিয়ে সমস্যা হলেও অভিযোগ জানানোর প্রবণতাও খুব কম। ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তারা কখনো কোনো ই-সেবা নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি। এর মধ্যে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ অভিযোগ করতে চাইলেও কীভাবে অভিযোগ করতে হয় তা জানতেন না।
সিপিডির গবেষণায় স্থানীয় সরকারে নারীদের অংশগ্রহণের চিত্রও উঠে এসেছে। ৪২ দশমিক ৬ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তারা কখনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেননি। নিয়মিত অংশ নেন মাত্র ১১ শতাংশ। ৫৭ দশমিক ৯ শতাংশ নারী কখন বা কোথায় স্থানীয় সরকারের সভা হয় সেই বিষয়ে অবগত নন। ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ মনে করেন, তাদের অংশগ্রহণে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না।
সংলাপে গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করে সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, ডিজিটাল সেবার প্রস্তুতি ও সচেতনতায় দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় রংপুর বিভাগ সবচেয়ে পিছিয়ে। অন্যদিকে ডিজিটাল প্রশিক্ষণ ও সচেতনতার দিক থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও দক্ষিণাঞ্চলের নারীরা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। উত্তরাঞ্চলের নারীরা প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে পিছিয়ে থাকায় অনলাইনে সেবা গ্রহণেও তাদের পিছিয়ে থাকার প্রবণতা রয়েছে।
সংলাপে আরও জানানো হয়, ইউনিয়ন পর্যায়ের কার্যালয়গুলোতে কম্পিউটার ও দ্রুতগতির ইন্টারনেটের ঘাটতি, অনলাইনে তথ্য ফাঁসের ভয় এবং আস্থার ঘাটতি নারীদের ই-সেবা গ্রহণে বাধা তৈরি করছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, অনলাইনে সেবা গ্রহণের হার বাড়াতে হলে সেবাকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করার পাশাপাশি প্রতিটি দফতরে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাখা এবং অভিযোগ প্রতিকারের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ের তদারকিতে নারী জনপ্রতিনিধি ও নারী সংগঠনকে যুক্ত করতে হবে। অনলাইনে সেবা প্রদানের উদ্যোগ সফল করতে হলে সব স্তরের মানুষকে সেবার আওতায় আনতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, সংখ্যালঘু, নিম্ন আয়ের পরিবার, প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দা ও সীমিত শিক্ষার মানুষকে সেবার বাইরে রাখা যাবে না। প্রয়োজনে বাংলা ভাষার পাশাপাশি স্থানীয় ভাষাতেও সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কণ্ঠনির্ভর ও প্রতিবন্ধীবান্ধব ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন।
জবাবদিহিতা বাড়াতে বাজেট, প্রকল্প ব্যয়, সুবিধাভোগীর তালিকা ও সেবা দেওয়ার সময়সীমা প্রকাশের ওপরও গুরুত্ব দেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, অভিযোগ জানানো, অভিযোগের অগ্রগতি দেখা এবং আপিলের জন্য কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা রাখতে হবে । তবে শুধু প্রযুক্তি নয়, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্যের সুরক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
সংলাপে নাগরিক অংশগ্রহণ তহবিলের উপপ্রধান ক্যাথরিনা কোনিগ বলেন, শুধু ডিজিটাল সেবা চালু করলেই তা নাগরিকবান্ধব হয় না। নারী, তরুণ, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবা গ্রহণের বাধাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। নাগরিকের প্রয়োজন ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সেবার নকশা ও উন্নয়ন করতে হবে। এজন্য সরকার, নাগরিক সমাজ ও জনগণের অংশগ্রহণমূলক সহযোগিতা জরুরি।
সংলাপে এটুআইয়ের পরামর্শক ভাস্কর ভট্টাচার্য, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ নুরুল্লাহসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আলোচনায় অংশ নেন।
এএইচ/এফএ