২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
কিছু মানুষ শরীরের সীমাবদ্ধতায় থেমে যান, আর কিছু মানুষ সেই সীমাবদ্ধতাকেই শক্তিতে পরিণত করেন। মানিক মিয়া তেমনই একজন। দুই পা নেই, তবুও থেমে নেই তাঁর দুই হাত। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর অর্জিত দক্ষতায় মানুষের রিকশা-ভ্যানের চাকা ঘুরিয়ে সচল রেখেছেন নিজের সংসারের চাকাও।
রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের ফুটপাতে বসে রিকশা, ভ্যান ও সাইকেল মেরামত করেন ৬৫ বছর বয়সী মানিক মিয়া। সামনে ছড়িয়ে থাকা রেঞ্চ, প্লাস, হাতুড়ি আর নানা যন্ত্রপাতিই তাঁর জীবনের সঙ্গী।
এক ভ্যানচালক এলেন চাকার সমস্যা নিয়ে। অনেক চেষ্টা করেও যখন সমাধান হলো না, তখন ডাক পড়ল ওস্তাদের। এগিয়ে এলেন মানিক মিয়া। অভিজ্ঞ হাতের স্পর্শে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঠিক হয়ে গেল চাকার সমস্যা।
যেখানে অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল সেই কাজ, সেখানে দুই পা হারানো এই মানুষটি নিজের দক্ষতায় করে দিলেন সমাধান। তবে এই পথ কখনো সহজ ছিল না।
১৯৮২ সালে ট্রেন দুর্ঘটনায় হারাতে হয় তাঁর দুই পা। দীর্ঘ চিকিৎসার পর যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন সামনে ছিল কঠিন বাস্তবতা—কীভাবে চলবে জীবন, কীভাবে চলবে সংসার?

সেই সময় বড় ভাই দেখিয়েছিলেন নতুন পথ। তাঁর কাছ থেকেই শিখলেন রিকশা ও ভ্যান মেরামতের কাজ।
মানিক মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, “সুস্থ হওয়ার পরে ভাবলাম, কী করব। আমার বড় ভাই এই কাজ করতেন। উনি বললেন, তোর জন্য এই কাজটাই ভালো হবে। তখন থেকেই শুরু করি। এরপর আর থামিনি।”
তিনি বলেন, “এর পর কেটে গেছে ৪২ বছর। রোদে পুড়েছি, বৃষ্টিতে ভিজেছি কিন্তু কাজ থামাইনি। বর্ষায় ফুটপাত ভিজে গেলে সমস্যা হয়, আবার গরমের দিনেও দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “বৃষ্টি হলে অনেক সমস্যা হয়। যে ফোমের ওপর ভর দিয়ে হাঁটি, সেটি ভিজে যায়। কাজ করতে পারি না। গরমেও কষ্ট হয়। জীবন তো কষ্টেরই। সবার জীবন একরকম না। কিন্তু সংসারের দায়িত্ব তো টানতেই হবে।”
মানিক মিয়া ঢাকা মেইলকে আরও বলেন, প্রতিদিনের আয় দিয়েই সন্তানদের বড় করেছি। মেয়েকে বিএ পাস করিয়ে বিয়ে দিয়েছি, বড় ছেলেকে রাইড শেয়ারিংয়ের কাজ করিয়েছি, আর ছোট ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছি। দুর্ঘটনার পর অনেকেই হয়তো সহজ পথ হিসেবে ভিক্ষাকে বেছে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমি বেছে নিয়েছি কঠিন হলেও সম্মানের এই পথকে।
তিনি বলেন, “আমি ভিক্ষা পছন্দ করি না। ভিক্ষা করা মানে জীবনের কাছে হেরে যাওয়া। মানুষ চেষ্টা করলে স্বাবলম্বী হতে পারে। আমি নিজের কাজ করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাই।”
এছাড়া তিনি আরও বলেন, “কোনো জায়গায় যেতে পারি না। অন্যদের মতো হাঁটতে পারি না। ভালো পছন্দের পোশাক সবসময় পরতে পারি না। এগুলো আমার নিজের কষ্ট।”

বিল্লাল নামে এলিফ্যান্ট রোডের এক বাসিন্দা ঢাকা মেইলকে বলেন, “অনেকের এমন অবস্থা হলে ভিক্ষাবৃত্তি করতেন। কিন্তু মানিক মিয়া তাদের চেয়ে ব্যতিক্রম। তাঁর ইচ্ছাশক্তির কারণেই ভ্যান-রিকশা মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এটি সমাজের দৃষ্টান্ত।”
বাচ্চু মিয়া নামে আরেক পথচারী বলেন, “এ পথ দিয়ে যতবার যাই, ততবারই দেখি দুই পা নেই, তবুও হাতের তালুতে ভর করেই ভ্যান-রিকশা মেরামত করছেন তিনি। সমাজের সবার যদি এমন ইচ্ছাশক্তি থাকত, তবে ভিক্ষাবৃত্তি কমে যেত।”
ট্রেন তাঁর দুই পা কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিতে পারেনি তাঁর সাহস, শ্রম আর আত্মমর্যাদা। মানিক মিয়ার গল্প শুধু একজন মানুষের বেঁচে থাকার গল্প নয়। এটি প্রতিকূলতার কাছে হার না মানার গল্প। তিনি প্রমাণ করেছেন, শরীরের সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষের ইচ্ছাশক্তিই তাকে সামনে এগিয়ে নেয়। মানিক মিয়া সংগ্রাম, আত্মমর্যাদা আর সম্মানের এক জীবন্ত উদাহরণ।