পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার কয়েকটি গ্রামে গড়ে ওঠা ফুলঝাড়ু শিল্প এখন শত শত মানুষের জীবিকার উৎস। কম পুঁজি, সহজ প্রযুক্তি ও স্থানীয় শ্রমনির্ভর এই শিল্পে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন নারী-পুরুষ। অনেক পরিবারের সংসারে ফিরেছে সচ্ছলতা।
নেছারাবাদ উপজেলার মাগুরা, অলংকারকাঠী, পানাউল্লাহপুর, কুনিয়ারী, সংগীতকাঠী, সুটিয়াকাঠি, নান্দুহার ও জনতা বাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি ছোট-বড় ঝাড়ু কারখানা। এসব কারখানায় কাজ করছেন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিক।
সম্প্রতি কয়েকটি কারখানা ঘুরে দেখা যায়, কেউ ঝাড়ুর শলা ছাঁটছেন, কেউ হাতল লাগাচ্ছেন, আবার কেউ স্কচটেপ পেঁচিয়ে ঝাড়ুকে বাজারজাতের উপযোগী করে তুলছেন। পুরুষ শ্রমিকেরা উলুফুল ও পাটখড়ি গুনা দিয়ে বেঁধে ঝাড়ুর মূল অংশ তৈরি করেন। পরে নারী শ্রমিকেরা তাতে স্কচটেপ বা পিভিসি পাইপ লাগিয়ে কাজ শেষ করেন।

ফুলঝাড়ু তৈরির প্রধান উপকরণ উলুফুল বা ঝাড়ুফুল। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এ ফুল পাওয়া গেলেও ব্যবসায়ীরা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকে সংগ্রহ করেন। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফুল সংগ্রহ করে শুকানোর পর ঝাড়ু তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়।
আধুনিক গৃহস্থালির নানা সরঞ্জাম এলেও ফুলঝাড়ুর চাহিদা কমেনি। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও এর বাজার রয়েছে। ফলে উৎপাদিত ঝাড়ু বিক্রিতে তেমন সমস্যা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
কুনিয়ারী গ্রামের শ্রমিক নাসির উদ্দিন প্রায় এক দশক ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৫০টি ঝাড়ু বানাতে পারি। এতে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হয়। এই কাজ করেই পরিবার নিয়ে ভালো আছি।

আরেক শ্রমিক মজিবর রহমান বলেন, আমরা শুধু ঝাড়ু তৈরি করি। কাঁচামাল মালিকের। প্রতিটি ঝাড়ু থেকে ৪ থেকে ৬ টাকা মজুরি পাই। এতে সংসারের অবস্থা আগের চেয়ে ভালো হয়েছে।
নারী শ্রমিক খাদিজা বেগম বলেন, আগে শুধু স্বামীর আয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হতো। এখন কারখানায় কাজ করে দিনে প্রায় ৩০০ টাকা আয় করি। সংসারে অনেকটা স্বস্তি এসেছে।
ঝাড়ু কারখানার মালিক মো. কবির হোসেন বলেন, একজন শ্রমিক কয়েক মিনিটেই একটি ঝাড়ু তৈরি করতে পারেন। শ্রমিকেরা প্রতিটি ঝাড়ুর জন্য ৪ থেকে ৫ টাকা মজুরি পান। পাইকারি বাজারে একটি ঝাড়ু ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হয়। পরে খুচরা বাজারে সেটি ১০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়।

তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো লাভ থাকছে না। ব্যবসায়ী মো. মিলন বলেন, উলুফুল সংগ্রহ ও পরিবহনে নানা জটিলতার কারণে খরচ বেড়েছে। আবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে ব্যবসা চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখা এ ধরনের ক্ষুদ্র শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।

পিরোজপুর বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক (ভারপ্রাপ্ত) এইচ এম ফাইজুর রহমান বলেন, ফুলঝাড়ু শিল্পে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়ছে। বিসিকের নীতিমালা অনুযায়ী ঋণ বা অন্য কোনো সহায়তা চাইলে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হবে।
স্থানীয়দের আশা, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও নীতিগত সহায়তা পেলে ফুলঝাড়ু শিল্প আরও বিস্তৃত হবে। এতে কর্মসংস্থান যেমন বাড়বে, তেমনি আরও অনেক পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হবে।
প্রতিনিধি/এসএস




